বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রত্যাঘাতের আগে যেভাবে কূটনৈতিক স্তরে আলচনার দরকার, তাও করে গিয়েছে মোদি সরকার। সন্ত্রাসদমনে ভারতের দৃঢ় অবস্থান, এবং তার সঙ্গে আন্তর্জাতিক রাজনীতির উত্থান-পতনের কূটনৈতিক সাযুজ্য রাখা জরুরি। সেই পর্ব সুচারুভাবে সম্পন্ন করার পরই, সন্ত্রাসে দেশের জিরো-টলারেন্সের পরিচয় আরও একবার দিয়েছে ভারত।
পহেলগাঁও হামলার জবাব কীভাবে দেবে ভারত? একটা দিন আগেও এ ছিল আলোচনার বিষয়। প্রাক্তন কূটনীতিবিদ বিবেক কাটজু অবশ্য বলেছিলেন, যদি ‘মোদি ডকট্রিন’ (Modi Doctrine) চালু থাকে, তাহলে পাকিস্তান তার সমুচিত জবাব পাবে। ফলশ্রুতি, ‘অপারেশন সিঁদুর’। পাক অধিকৃত কাশ্মীর এবং পাকিস্তানে একের পর এক জঙ্গিঘাঁটি গুঁড়িয়ে দিয়েছে ভারতীয় সেনবাহিনী।
বিশেষজ্ঞদের অনেকেই বলছেন, যে কায়দায় সন্ত্রাসদমনে পদক্ষেপ করা হয়েছে, তা আকস্মিক নয়। বরং ‘মোদি ডকট্রিন’ (Modi Doctrine) বলে কূটনীতিমহলে যে শব্দবন্ধ চালু আছে, সেই অনুযায়ী এই পদক্ষেপই কাম্য ছিল। অতীতের ঘটনা পরম্পরাও সেই সাক্ষ্য দিচ্ছে। ২০১৬-র সার্জিক্যাল স্ট্রাইক থেকে এর সূচনা ধরা যেতে পারে। আছে ২০১৯-এর বালাকোট এয়ারস্ট্রাইক। একই ভাবে এল অপারেশন সিঁদুর। প্রতিবারই পাক মদতপুষ্ট সন্ত্রাসের জবাব কঠোর হাতেই দিয়েছে ভারত। ২০১৬-র সার্জিক্যাল স্ট্রাইকের সময় একটি প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা হয়েছিল যে, সন্ত্রাসের জবাব দেওয়ার ক্ষেত্রে এই ধরনের পদক্ষেপ অস্বাভাবিক নয়। তবে, আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে তা কতটা সঙ্গতিপূর্ণ তা নিয়ে বিশদে আলোচনার দরকার। অর্থাৎ একটা লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্কের দরকার ছিল। ২০১৯-এ এনআইএ অ্যাক্টের অ্যামেডমেন্ট এক্ষেত্রে তাই হয়ে ওঠে টার্নিং পয়েন্ট। জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা যাতে বিনা বাধায় কাজ করতে পারে, এবং সীমান্তের ওপার থেকে কীভাবে সন্ত্রাস-চক্র চালানো হছে তা তদন্ত করতে পারে, সেই পরিসর তৈরি করে দেওয়া হয়। এর সুফল পায় দেশ। মোদি সরকারের আমলে (Modi Doctrine) একাধিকবার সন্ত্রাসী কাজকর্মের নেটওয়ার্ক চিহ্নিত করে ধ্বংস করা হয়েছে। এক সময়ে কাশ্মীরে প্রবল প্রতাপ ছিল যে হুরিয়াতের, সেই সংগঠন ধীরে ধীরে নিষ্ক্রিয় করে দেওয়া হয়েছে। তৈরি করা হয় ‘ডিজিটাল ফেন্সিং’। হাওয়ালা নেটওয়ার্ক, ডার্কনেটের মাধ্যমে সন্ত্রাসে অর্থ জোগানো, এমনকী ক্রিপ্টো কারেন্সিতে নজর রাখাও সম্ভব হয়। ফলে আধুনিক প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে দেশের বিরুদ্ধে নাশকতামূলক কাজকর্মের পরিকল্পনা করা হচ্ছে কিনা, আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্য নিয়েই তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা হয়। সাইবার ইন্টিলিজেন্সি, অত্যাধুনিক সারভেলেন্স সিস্টেম এবং এআই চালিত নাশকতা চিহ্নিত করার প্রক্রিয়া ব্যবহার করে এমন এক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হয়, যা দুর্ভেদ্য প্রাচীরের মতোই(Modi Doctrine)। একাধিক সন্ত্রাসী কার্যকলাপ এর দরুণ প্রতিহত করা সম্ভব হয়েছে। তবে তারপরেও পহেলগাঁওয়ের মতো ঘটনা ঘটে গিয়েছে। নিরীহ নাগরিকদের ধর্ম চিহ্নিত করে হত্যা করা হয়েছে। তাঁদের পরিজনদের বলা হয়েছে, সেই খবর যেন মোদিকে গিয়ে বলা হয়।
আরও শুনুন: ‘অপারেশন সিঁদুর’ বোঝাল নেটদুনিয়ার দ্বেষ বদলাতে পারে না দেশ
ঘটনার প্রায় চোদ্দ দিনের মাথায় প্রত্যাঘাত করেছে ভারত। অনেকে তা ‘নীরবতা’বলে আক্ষেপ করেছিলেন। তবে, বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রত্যাঘাতের আগে যেভাবে কূটনৈতিক স্তরে আলোচনার দরকার, তাও করে গিয়েছে মোদি সরকার(Modi Doctrine)। সন্ত্রাসদমনে ভারতের দৃঢ় অবস্থান, এবং তার সঙ্গে আন্তর্জাতিক রাজনীতির উত্থান-পতনের কূটনৈতিক সাযুজ্য রাখা জরুরি। সেই পর্ব সুচারুভাবে সম্পন্ন করার পরই, সন্ত্রাসে দেশের জিরো-টলারেন্সের পরিচয় আরও একবার দিয়েছে ভারত। মোদি ডকট্রিনের এ-ও এক গুরুত্বপূর্ণ জায়গা বলে অনেকে মনে করছেন। মনে করা হচ্ছে যে, এই ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার সুদূরপ্রসারী প্রভাব আছে। সংসদে সন্ত্রাস হামলার পর যেভাবে ‘অপারেশন পরাক্রম’ চালু করা হয়েছিল। দেশের সন্ত্রাস দমনের মনোভাব তাতে বহির্বিশ্বে স্পষ্ট হয়েছিল। সেই পথ ধরেই পরবর্তীকালে দেশের সরকার একাধিক কড়া পদক্ষেপ করে। ঠিক তেমনই অপারেশন সিঁদুর এবং তার আগে বহুস্তরীয় কূটনৈতিক পদক্ষেপেরও অন্য মাত্রার গুরুত্ব আছে। ভবিষ্যতে ভারতের সন্ত্রাসবিরোধিতা এবং কাশ্মীরে শান্তি ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে যথোপযুক্ত এই কাজ বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
অর্থাৎ মোদি ডকট্রিন (Modi Doctrine)আসলে সন্ত্রাসদমনে দেশের সুদূরপ্রসারী ভাবনা। এবং তা এনআইএ ও সেনাকে পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়ারি পক্ষপাতী। নিরীহ নাগরিককে হত্যা করলে, দেশের ধর্মনিরপেক্ষতায় জবাব দিলে ভারত যে কঠোর জবাব দেবে, তা আরও একবার হাতে-কলমে করেই দেখিয়ে দিয়েছে সেনা। ‘অপারেশন সিঁদুর’ তাই শুধু সন্ত্রাসের জবাব নয়, সন্ত্রাসদমনে ভারতের এই অনড় মানসিকতারই জোরাল চিহ্ন। পাকিস্তান তো বটেই, গোটা বিশ্বই আরও একবার তার সাক্ষী থাকল।