‘অপারেশন সিঁদুর’ যেন দুর্ভাগা ‘পেহেলগাঁও ভিক্টিম’-দের ক্ষতের উপর একচিলতে মলম। দুই সপ্তাহের অমানুষিক যন্ত্রণার পর যেন খানিক উপশম মিলেছে তাঁদের পরিবারের সদস্যদেরও। সংবাদমাধ্যমে তাঁরা জানিয়েছেন সে-কথা। ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে উঠেছেন। কাশ্মীর জুড়েও শোনা যায় ‘জয় হিন্দ’ ধ্বনি। সোশ্যাল মিডিয়ায় তাকালেও এখন চোখে পড়বে, কীভাবে সমগ্র ভারতবাসী একত্রিত হয়ে উদযাপন করেছেন দেশের এই জয়।
‘অপারেশন সিঁদুর’ (Operation Sindoor)। নৈসর্গিক বৈসরন ভ্যালিতে আচমকা সন্ত্রাসবাদী হামলায় পরিজন হারিয়েছিলেন দেশের মা-বোনেরা। মৃত্যু নয়, বরং আজীবন যন্ত্রণার বাণ বুকে নিয়েই বেঁচে থাকার নিদান দিয়েছিল এই সন্ত্রাসহামলা। ভারতের ‘অপারেশন সিঁদুর’ তারই ‘প্রতিশোধ’। একদিকে খানিক শঙ্কা-দ্বিধা বুকে নিয়ে বুধবার (৭ই এপ্রিল) ‘মক ড্রিল’-এর প্রস্তুতি নিচ্ছিল সাধারণ ভারতবাসীরা। অন্যদিকে ৬ তারিখ মধ্যরাত ঘনাতেই, ভারতীয় সামরিক বাহিনী পাকিস্তান ও পাক-অধিকৃত কাশ্মীরের নয়টি জায়গায় প্রত্যাঘাত করে। গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় নয়টি জঙ্গি-ঘাঁটি। পহেলগাঁওয়ে নিরীহ নাগরিকদের হত্যা যেভাবে দেশবাসীকে যন্ত্রণায় বিদ্ধ করেছিল, দেশের সেই ক্ষতে প্রলেপ দিয়েছে ‘অপারেশন সিঁদুর'(Operation Sindoor)। একই সঙ্গে বুঝিয়েছে, দ্বেষের চর্চা যতই করুক একাংশ, এই দেশ আজও বদলায়নি।
ঘটনাশেষে সাংবাদিক সম্মেলনে দেশবাসীর সামনে ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর যাবতীয় খুঁটিনাটি তুলে ধরেন ভারতের বর্তমান বিদেশ-সচিব বিক্রম মিশ্রী। তাঁর সঙ্গে ছিলেন ভারতীয় বিমান বাহিনীর উইং কম্যান্ডার ব্যোমিকা সিং এবং ভারতীয় সেনাবাহিনীর কর্নেল সোফিয়া কুরেশি। এর আগে পর্যন্ত রাষ্ট্রপুঞ্জের শান্তিরক্ষা বাহিনীর হয়ে বহু কাজে অংশ নিয়েছেন সোফিয়া কুরেশি; অন্যদিকে ২৫০০ ঘণ্টা একটানা উড়ানের অভিজ্ঞতা রয়েছে কম্যান্ডার ব্যোমিকা সিং-এর। ‘অপারেশন সিঁদুর’ (Operation Sindoor) পরিচালনার ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন এই দুই বীরাঙ্গনা। বিদেশসচিব তাঁর বক্তব্যে জানান যে, ২২ এপ্রিল পহেলগাঁও-এ হওয়া হামলাটির পিছনে সন্ত্রাসবাদীদের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল দেশ জুড়ে সাম্প্রদায়িক দ্বন্দ্বকে উসকে দেওয়া। কেন্দ্রীয় সরকার ও দেশবাসী যে সে উদ্দেশ্যকে সফল হতে দেয়নি, সে জন্য ধন্যবাদ জানান তিনি। তাঁর কথাগুলো মুহূর্তের জন্য হলেও থমকে, ভাবতে বাধ্য করে আমাদের। কারণ বিগত পনেরো দিনে সোশ্যাল মিডিয়া জুড়ে যে ধর্ম বনাম ধর্মের যুদ্ধ শুরু হয়েছিল, তার সাক্ষী কমবেশি আমরা সকলেই। সেখানে নির্দ্বিধায় সংখ্যালঘুদের উপর চলছিল আক্রমণ। এমনকি যে মানুষেরা শান্তি রক্ষার ভিত্তি হিসেবে বেছে নিয়েছিল ধর্মনিরপেক্ষতাকে, তাঁরাও পড়েছিলেন আক্রমণের মুখে। বিক্রম মিশ্রীর বক্তব্যটি যেন সরাসরি প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায় নেটদুনিয়ার সেই সংকীর্ণ মানসিকতাকে।
আরও শুনুন: সার্জিক্যাল স্ট্রাইক, বালাকোট থেকে অপারেশন সিঁদুর: সন্ত্রাস দমনে মোক্ষম ‘মোদি-ডকট্রিন’
পহেলগাঁও হত্যাকাণ্ডের পরেই প্রচারের আলো এসে পড়েছিল হিমাংশী নারওয়াল (বিনয় নারওয়ালের স্ত্রী), আরতি মেনন (এন রামাচন্দ্রন-এর কন্যা), ঐশন্যা দ্বিবেদী (শুভম দ্বিবেদী-র স্ত্রী)-সহ আরও অনেকের উপর। এঁরা প্রত্যেকেই দুর্ভাগ্যক্রমে ঘটনার দিন উপস্থিত ছিলেন পাইন বনে ঘেরা বৈসরন ভ্যালিতে। চোখের সামনেই সন্ত্রাসীদের হাতে প্রিয়জনকে প্রাণ হারাতে দেখেছেন এঁরা, তাই ঘটনার পর থেকে বারবার সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে তাঁদের বক্তব্য। হত্যাকাণ্ডকে সামনে রেখে ধর্মীয় বিদ্বেষের চাষ যখন বেড়েছে, তখন সকলকে অবাক করে হিমাংশী কিংবা ঐশন্যা জানিয়েছিলেন যে, তাঁরা কেবল হত্যাকারীদের শাস্তি চান। কোনও বিশেষ ধর্মের মানুষদের প্রতি হিংসা-বিদ্বেষ ছড়িয়ে পড়ুক, তা তাঁরা চান না। আর এতেই সোশ্যাল মিডিয়া দাপিয়ে বেড়ানো ধর্মীয় উগ্রপন্থীদের রোষানলে পড়েন তাঁরা। যে সদ্য বিবাহিতা স্ত্রীকে স্বামীর মৃতদেহ আগলে বসে থাকতে হয়েছে কাশ্মীরের উপত্যকায়, তিনিই উগ্রপন্থী নেটনাগরিকদের কাছে হয়ে উঠেছেন ‘দেশদ্রোহী’। কেউ কেউ আবার পহেলগাঁও হত্যাকাণ্ডে বাবার মৃত্যুর পরেই কীকরে ‘সাজগোজ’ করেছেন মেয়ে, সে নিয়েও কটাক্ষ করতে ছাড়েননি।
‘অপারেশন সিঁদুর’ (Operation Sindoor) যেন দুর্ভাগা ‘পেহেলগাঁও ভিক্টিম’-দের ক্ষতের উপর একচিলতে মলম। দুই সপ্তাহের অমানুষিক যন্ত্রণার পর যেন খানিক উপশম মিলেছে তাঁদের পরিবারের সদস্যদেরও। সংবাদমাধ্যমে তাঁরা জানিয়েছেন সে-কথা। ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে উঠেছেন। কাশ্মীর জুড়েও শোনা যায় ‘জয় হিন্দ’ ধ্বনি। সোশ্যাল মিডিয়ায় তাকালেও এখন চোখে পড়বে, কীভাবে সমগ্র ভারতবাসী একত্রিত হয়ে উদযাপন করেছেন দেশের এই জয়। যেন কোথাও আর বিভাজন নেই কোনও। সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে রুখে দাঁড়ানোর ক্ষমতা রাখে গোটা ভারত।
তাই শেষমেশ সোশ্যাল মিডিয়ার ভূমিকায় কিছু প্রশ্নচিহ্ন থেকেই যায়। আপাত নিরাপদ সোশ্যাল মিডিয়া বুঝি সুযোগ পেলেই হয়ে উঠতে পারে এক ভয়াবহ বিদ্বেষ-বিষের কুণ্ড। বিগত এক পক্ষ তার সাক্ষী থেকেছে। ‘অপারেশন সিঁদুর’ (Operation Sindoor)যেন যাবতীয় সাম্প্রদায়িক হিংসার চোখে চোখ রেখে জানান দেয় যে, ভারতবর্ষের ঐক্য ও উদ্যম যেমন ছিল, তেমনটাই রয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচারিত মেকি দ্বেষ কখনও এ ‘দেশ’-এর সংজ্ঞা বদলে দিতে পারে না।