যুদ্ধ এসে সবকিছু কেড়ে নিয়েছে গাজার। ঘর, পরিবার, পরিজন। তবু এত কিছুর মধ্যেও হ্যাপিনেস ইনডেক্সে যুদ্ধে বিক্ষত দেশ গাজা জৌলুস-প্রাচুর্যে ঝলমলে অন্যান্য অনেক দেশের থেকে এগিয়েই রয়েছে। কিন্তু কীভাবে? আসুন শুনে নেওয়া যাক।
সুখী কে? প্রশ্ন করেছিলেন ধর্মরূপী বক। যুধিষ্ঠির উত্তর দিয়েছিলেন, ‘হে জলচর বক, যে লোক ঋণী ও প্রবাসী না হয়ে দিবসের অষ্টম ভাগে (সন্ধ্যাকালে) শাক রন্ধন করে সেই সুখী।’ ধর্মের তত্ত্ব গুহায় নিহিত থাকলেও, সুখের সন্ধান নয় ততখানি দুরূহ। আধুনিক সময়ের হাজারও জটিলতার মধ্যেও সেই সুখের সংজ্ঞায় বোধহয় তেমন হেরফের হয়নি। প্রাচুর্যে আজও নেই সুখের ঠিকানা। আর, আশ্চর্য কী? মৃত্যু পেরিয়ে মানুষের জীবনের আকাঙ্ক্ষাই ছিল পরম আশ্চর্য। তাই বোধহয় আশ্চর্য হলেও সত্যি যে, যুদ্ধবিদ্ধস্ত গাজা-প্যালেস্তাইন অসুখী নয় মোটেও। হ্যাপিনেস ইনডেক্সে যুদ্ধে বিক্ষত দেশগুলো তাই জৌলুস-প্রাচুর্যে ঝলমলে অন্যান্য অনেক দেশের থেকে এগিয়েই রয়েছে।
:আরও শুনুন:
ধ্বংসের আবহেও রমজান পালন, বিশ্বকে বেঁধে বেঁধে থাকা বার্তা দিচ্ছে গাজা
সদ্য প্রকাশিত হয়েছে চলতি বছরের ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস ইনডেক্স। এই সুখের সন্ধানের নানা ‘প্যারামিটার’ আছে। তার নিরিখে কোনও দেশ এগিয়েছে, কেউবা পিছিয়েছে। আবার দেখা গিয়েছে, বাইরে থেকে দেখতে যে দেশকে দারুণ উন্নত বা সুখী বলে মনে হয়, সে-দেশের মানুষ ততটাও সুখী নয়। আর এখানেই আশ্চর্য হতে হয় যুদ্ধবিদ্ধস্ত দেশগুলোর দিকে তাকিয়ে। যুদ্ধ বা রাজনৈতিক সংঘাতে যে দেশগুলো বিপর্যস্ত- সেই ইউক্রেন, প্যালেস্তাইনের মতো দেশগুলো সুখের নিরিখে অন্যান্য অনেক দেশকেই পিছনে ফেলে দিয়েছে। অথচ কী না ঘনিয়ে উঠেছে সেই সব দেশের নিয়তিতে! গাজা-র ছবি বহির্বিশ্ব যতবার দেখেছে, ততবার হতবাক হয়েছে। রাজনীতি পেরিয়ে কবে আর মানবিকতার কাছে ফিরতে পারবে মানুষ, এ প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। বিশ্ব দেখেছে ধ্বংসলীলা। দেখেছে, মৃত সন্তানকে বুকে জড়িয়ে ধরা অভিভাবকের দু-চোখে হা-হা মরুভূমি। মানবতার লাঞ্ছনার সেই সব মুহূর্ত লজ্জা দিয়েছে সভ্যতাকে। আর তাই সুখের প্রশ্নে সেই গাজা যদি অন্য তথাকথিত সুখী দেশকে পিছনে ফেলে দেয়, তবে আশ্চর্য হতে হয় বইকি!
:আরও শুনুন:
কিছুই আর নেই! তবু যা কিছু আছে তার জন্য ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানাচ্ছে ‘নিঃস্ব’ গাজা
তাহলে সুখের সংজ্ঞা কী? চলতি রিপোর্টে আফগানিস্তানের সবথেকে নিচে। ১৪৭টি দেশের মানুষ নিজেদের জীবনযাপনকে কীভাবে মূল্যায়ন করছেন, তার ভিত্তিতেই এই রিপোর্ট। সেই যাপনের পথ রুদ্ধ হওয়াতেই আফগানিস্তানের মানুষ নিজেদেরকে তেমন সুখী হিসাবে তুলে ধরতে পারেননি। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েলবিয়িং রিসার্চ সেন্টারের এই সমীক্ষায় সঙ্গী হয়েছিল ‘গ্যালপ’ (Gallup)। এই সংস্থার সিইও জন ক্লিফটন জানাচ্ছেন, ‘সুখ মানে তো কেবল সমৃদ্ধি আর সম্পদ নয়। সুখ হল পরস্পরের প্রতি বিশ্বাস, যোগাযোগ। আর এটুকু ভরসা যে, বিপদের দিনে পাশে আছেন সহ-নাগরিকরা।’ তিনি জোর দিয়েছেন ‘পারস্পরিক’ শব্দটির উপর। প্রত্যেকে যে প্রত্যেকের জন্য এই বিশ্বাসই মানুষকে সুখী করে তোলে। এই সুখের হদিশ অনেক অনেক ছোট ছোট বিষয়ের উপরই নির্ভর করে। হয়তো দুজন নাগরিক একে অন্যের সঙ্গে খাবার ভাগ করে খেয়েছেন। বা, কেউ কারও বিপদে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। অথবা ধরা যাক, কারও মানিব্যাগ হারিয়ে গিয়েছে; তিনি কি আশা করেন যে, তা ফিরে পাবেন? অর্থাৎ সহ-নাগরিকদের প্রতি কি তাঁর তেমন আস্থা আছে! এমন অনেক ছোটখাটো বিষয়ই আসলে বড় হয়ে ওঠে। তাই-ই জাগিয়ে তোলে কমিউনিটি বোধ। আর যেখানে এই কমিউনিটি বোধ প্রখর, সেখানে সুখের মাত্রাও অনেকখানি। সরকারি প্রকল্পও যদি জনকল্যাণে মনোযোগী হয়, তাহলেও মেলে সুখের সন্ধান। এ ছাড়া আরও বহু বিষয়ের নিরখেই এই সুখের সাপ-লুডো। তবে মোদ্দা কথাটি হল, মানুষ মানুষের পাশে আছে কি-না!
ঠিক এই জায়গাতেই এগিয়ে গাজা। যুদ্ধ এসে সবকিছু কেড়ে নিয়েছে। ঘর, পরিবার, পরিজন। তবু হাতের উপর হাত রাখার, হাতের উপর হাত থাকার এই ভরসাটুকু কেড়ে নিতে পারেনি। মৃত্যুর উন্মাদগ্রামেও যে চাঁদ ওঠে এই-ই বোধহয় সুখ। আশ্চর্যও বটে!