কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে যে আসন্ন আদমশুমারিতে যুক্ত করা হবে দেশবাসীর ‘জাত পরিচয়’-ও। এমন পরিস্থিতিতে সৃজনীর সিদ্ধান্ত দু’দণ্ড থমকে দাঁড়িয়ে ভাবতে বাধ্য করে আমাদের। সৃজনী মনে করেন, আর্থিক বৈষম্য হোক বা ধর্মীয় উগ্রতা, মানুষের পদবির বিচার করেই তা যেন আরও সংগঠিত হয়ে ওঠে। যদি সত্যিই ভিন্ন ভিন্ন মত ও ধর্মের মানুষকে একত্র করে রাষ্ট্র গড়তে চাওয়া হয়, তবে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সমানাধিকারের মধ্যে দিয়েই তার বাস্তবায়ন সম্ভব।
জাতের থাকে ভাগ ভাগ আমাদের সমাজ। সেই আদ্যিকাল থেকে আজ পর্যন্ত জাতের নামে বজ্জাতি চলছে তো চলছেই। সময় এগিয়েছে। এত বদল, এত প্রগতিশীলতা, তবু জাত-পাতের ভেদাভেদ যেন মুছেও মোছে না। সামাজিক বৈষম্য যত বাড়ে তত সাধারণ মানুষের যে সাধারণ অধিকার, অর্থাৎ শিক্ষা-স্বাস্থ্য ইত্যাদি ক্ষেত্রেও অসাম্যের দূরত্ব বাড়ে বই কমে না। আর এই বর্ণবৈষম্যের চিহ্নটি যেন আপনাআপনিই জুড়ে যায় আমাদের নামের সঙ্গে। পদবি-ই সেই সূচক। আর সেই পদবি প্রত্যাখ্যান করার ভাবনা জানিয়েই বর্ণবাদী সমাজের কাঠামো অস্বীকারের ভাবনাটি নতুন করে জাগিয়ে তুলল তরুণ প্রজন্ম। সদ্য আইএসসি-তে প্রথম হওয়া সৃজনীর (ISC Topper Srijani) ভাবনা তাই এই সময়ের নিরিখে যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই আশা-জাগানিয়া।
সম্প্রতি ফল প্রকাশ পেয়েছে আইএসসি পরীক্ষার। সেখানে ৪০০-তে ৪০০ পেয়ে প্রথম স্থান অধিকার করেছেন কলকাতার মেয়ে সৃজনী; তবে দারুণ রেজাল্টে সকলকে অবাক করা শুধু নয়, সৃজনী সকলকে চমকে দিয়েছেন তাঁর পরিণত ভাবনায়। মাত্র ১৭ বছর বয়সী সৃজনী জানিয়েছেন, নামের সঙ্গে কোনও পদবির ভার বহন করতে চান না তিনি। ক্লাস টুয়েলভের বোর্ড পরীক্ষার রেজিস্ট্রেশন যাতে শুধুমাত্র তাঁর নামের ভিত্তিতে করা হয়, এই মর্মে পরীক্ষার আগেই তিনি বোর্ড আধিকারিকদের উদ্দেশে একটি ফর্মাল লেটার-ও পাঠিয়েছিলেন। সৃজনীর (ISC Topper Srijani) মা গুরুদাস কলেজের ইতিহাসের অধ্যাপিকা, বাবা ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইন্সটিটিউট কলকাতা-র গণিতের অধ্যাপক। ছোট থেকেই কখনও জাত-বর্ণ-ধর্মের ধারণা সন্তানদের উপর চাপিয়ে দেওয়ায় পক্ষপাতী ছিলেন না তাঁরা। মেয়ের এই সিদ্ধান্তও তাই তাঁর উপরেই ছেড়েছেন বাবা-মা। নিজের সিদ্ধান্তেই সৃজনী জানিয়েছেন, তিনি মনে করেন, মানবতাই তাঁর কাছে ধর্ম। সবার উপরে যে মানুষ-ই সত্য এই শ্বাশ্বত বোধ তিনি আরও একবার মনে করিয়ে দিয়েছেন সকলকে।
আরও শুনুন: আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু… তবু দেশের মর্ম বোঝাচ্ছেন দুই নারী
অথচ এই সময়টাই যেন বিভাজনের। মানবতা লাঞ্ছনার ঘটনা চারিদিকে ঘটছে অহরহ। যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজার দৃশ্য প্রতিদিন বিপন্ন করে মানুষকে। অথচ রাজনৈতিক কিংবা কূটনৈতিক অসহায়তায় যেন হাত-পা বাঁধা সকলেরই। এই তো কিছুদিন আগে কাশ্মীরের পহেলগাঁওতে ধর্মের নামে হত্যা চালিয়েছে সন্ত্রাসবাদীরা। আর তার পর থেকেই সংখ্যালঘুদের প্রতি বিদ্বেষ যেন প্রকট হয়ে পড়েছে আমাদের সমাজে। তা যে ছিল না, তা নয়। তবে যে ধর্মনিরপেক্ষতার অনুশীলনে তা মুছে যাওয়ার কথা ছিল, তা তো হয়ইনি। উলটে কাঠগড়ায় উঠেছে সেই সেক্যুলারিজমই। আর ঠিক এখানেই এসে আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে মানবতা-ধর্ম। ইতিহাসের বাঁকে নানা উত্থান-পতন ঘটে। সে ইতিহাস রাজা-রাজড়াদের। অর্থাৎ শাসকের ইতিহাস। সে ইতিহাস এক এক সময় এক একরকম খাতে বইতে থাকে। কিন্তু তা পেরিয়ে যে বড় ইতিহাস, অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথ যাকে মানুষের ইতিহাস বলেন, সেই ইতিহাস তো মানুষে মানুষে সহাবস্থানের কথাই বলে। বলে সুখে-দুঃখে, ঝড়ে-ঝঞ্ঝায় বেঁধে বেঁধে থাকার কথা। এই মানুষের ইতিহাসের কাছে হেরে যায় শাসকের রচনা করা ঘৃণা-বিদ্বেষের ছোট ইতিহাস। তবে দুঃখের বিষয়, সেই মানুষের ইতিহাসকে অনুধাবন করতে যে মানবতার কাছে যেতে হয়, যে মানবধর্মকে লালন করতে হয় অন্তরে, তা আর আমরা পারছি কই! বরং সাম্প্রতিক বিদ্বেষদুষ্ট সময়কে দেখে যেন ভয়ই লাগে। আর সেখানেই আশার আলো হয়ে ওঠেন সৃজনী (ISC Topper Srijani)। তাঁর দৃপ্ত কণ্ঠ। তাঁর প্রত্যয়ী উচ্চারণ যে, মানবতাই ধর্ম।
এরই মধ্যে কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে যে আসন্ন আদমশুমারিতে যুক্ত করা হবে দেশবাসীর ‘জাত পরিচয়’-ও। এহেন সিদ্ধান্ত দলিত তথা নিম্নবর্ণভুক্ত মানুষদের সামাজিক অবস্থানের উন্নয়ন ঘটানোর দাবি করে থাকলেও, বর্তমান পরিস্থিতিতে তা কতটা কার্যকর হবে, সে প্রশ্ন থেকেই যায়। একদিকে ভারতের পাঠানো মহাকাশযান চাঁদ ছুঁয়ে ফিরছে; অন্যদিকে কেবল দলিত পরিচয়ে ঘোড়ার উপর থেকে টেনে নামানো হচ্ছে বিয়ে করতে আসা কমবয়সী যুবকটি। নিত্যদিন নতুন বিদ্বেষের খবরে মুখর হয়ে উঠছে সংবাদমাধ্যম। সেখানে জাতগণনা-র ধারণা জাতিভিত্তিক সাম্য প্রতিষ্ঠার বদলে ক্ষেত্রবিশেষে ভবিষ্যৎ হিংসার পথ সুগম করবে না কি? সে প্রশ্ন থেকেই যায়।
এমন পরিস্থিতিতে সৃজনীর সিদ্ধান্ত দু’দণ্ড থমকে দাঁড়িয়ে ভাবতে বাধ্য করে আমাদের। সৃজনী (ISC Topper Srijani)মনে করেন, আর্থিক বৈষম্য হোক বা ধর্মীয় উগ্রতা, মানুষের পদবির বিচার করেই তা যেন আরও সংগঠিত হয়ে ওঠে। যদি সত্যিই ভিন্ন ভিন্ন মত ও ধর্মের মানুষকে একত্র করে রাষ্ট্র গড়তে চাওয়া হয়, তবে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সমানাধিকারের মধ্যে দিয়েই তার বাস্তবায়ন সম্ভব।
এই যে চারপাশে কান পাতলেই শুনতে পাওয়া যায়, নতুন প্রজন্মের প্রতি কতশত অভিযোগ পুরনোদের। নতুনরা বুঝি আরও বেশি আত্মমগ্ন; অহং পেরিয়ে ‘গ্রেটার গুড’ নিয়ে নাকি তিলমাত্র মাথাব্যথা নেই তাদের! সৃজনী আমাদের ভাবতে বাধ্য করে, তবে কি সত্যিকারের সাম্য আসবে নতুন যৌবনের দূতদের হাত ধরেই? সমস্ত অভিমান-অভিযোগ খারিজ করে, উদারতার নতুন অর্থ শিখিয়ে দেবে সৃজনী কিংবা সৃজনীরাই?