একজন জঙ্গি হামলায় স্বামীকে হারিয়েছেন। অন্যজন সে দুঃখের ভাগীদার হয়েছেন বহু আগে। মিল অবশ্য স্রেফ এটুকুই নয়। দুজনের স্বামীই পেশায় সৈনিক ছিলেন। সেই হিসেবে দুজনেরই সামাজিক পরিচয়টাও খানিক একরকম। তবে বর্তমান পরিস্থিতি এঁদের মিলিয়েছে। কীভাবে? আসুন শুনে নেওয়া যাক।
কাছের মানুষ চলে যাওয়ার দুঃখ ভোলার নয়। কিন্তু দুঃখের যাপন কী সবার ক্ষেত্রে এক হতে পারে? বোধহয় না। এই সাধারণ বিষয়টাই বুঝতে নারাজ নেটদুনিয়া। তাই বাবার মৃত্যুতে মেয়ে কেন কাঁদল না, কিংবা স্বামীকে হারিয়েও কেন প্রতিবাদের আগুন জ্বলছে না স্ত্রীর চোখে, সেই প্রশ্ন উঠছে বারবার। আর সেই প্রসঙ্গেই জুড়েছেন দুই নারী (Pahalgam)।
এঁরা দুজনেই সেনার স্ত্রী। দুজনের স্বামী নৌবাহিনীর অংশ ছিলেন। দুজনেই স্বামীকে হারিয়েছেন। একজন আগে, অন্যজন সদ্য। দুজনের বয়সের পার্থক্যও অনেক। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে এঁরাই যেন দেশের মর্ম বোঝাচ্ছেন। বিষয়টা পরিষ্কার হচ্ছে না? তাহলে খুলেই বলা যাক।
আরও শুনুন: জঙ্গিদের হাতে বাবার মৃত্যু, তবু মেয়ে কাঁদে না কেন! শোকেও ‘মরাল’ শিখিয়ে ‘মোড়ল’ সেই নেটদুনিয়া
ঘটনার কেন্দ্রে হিমাংশী নারোয়াল। বিয়ের মাত্র ৬ দিনের মাথায় স্বামীকে নিয়ে কাশ্মীর গিয়েছিলেন (Pahalgam)। সম্ভবত মধুচন্দ্রিমায়। স্বামী বিনয় নারোয়াল নৈবাহিনির অংশ। জুটিতে মিলে ভালোই উপভোগ করছিলেন দাম্পত্য জীবনের মধুময় অধ্যায়। হঠাৎ অন্ধকার ঘনিয়ে এল জীবনে। জঙ্গি হানায় প্রাণ হারালেন বিনয়। ব্যাপারটা এতটাই আচম্বিতে হয়েছিল, কিছুই বুঝে উঠতে পারেননি স্ত্রী হিমাংশী। যন্ত্রচালিতের মতো পরের কয়েকটা দিন কেটেছে তাঁর। কখনও স্বামীর কফিনবন্দী দেহ আঁকড়ে, কখনও পাথর হয়ে বসে থেকেছেন। এসবের মাঝে ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার কথাও বলতে হয়েছে বহুবার। এমনই কোনও সাক্ষাৎকারে কথা প্রসঙ্গে তিনি শান্তির বার্তা শুনিয়েছেন। স্পষ্ট জানিয়েছেন, এই সময়টা ধর্মের ভেদ করার নয়। এক হয়ে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়তে হবে। দোষীদের শাস্তি হোক, এমনটা তিনিও চান, কিন্তু এই ঘটনার জন্য মুসলিম বা কাশ্মীরিদের অপদস্ত করা বন্ধ হোক। এমনটাই চেয়েছিলেন হিমাংশী। আপাততভাবে শুনে মনে হতেই পারে এতে সমস্যা কোথায়? কিন্তু যা আপাতভাবে মনে হবে না, সেটিই বর্তমানে ব্যতিক্রম। অর্থাৎ এই স্বামীহারা তরুণীর বক্তব্য নিয়েও বেজায় জটিলতা তৈরি হয়েছে। কেন ধর্ম নিয়ে ভাবতে মানা করছেন তিনি, বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে আসছে স্রেফ এটুকুই।
আরও শুনুন: নীরজের মাকে আক্রমণ থেকে কাশ্মীরি পড়ুয়াদের হেনস্তা: অন্তরের শত্রু ঘায়েল কোন অস্ত্রে?
এই পরিস্থিতিতে হিমাংশীর পাশে দাঁড়িয়েছেন ললিতা রামদাস। খোলা চিঠিতে হিমাংশীর ভূয়সী প্রশংসা করেছেন প্রাক্তন নৌসেনা আধিকারিকের স্ত্রী। নিজের পরিচয় দিতে গিয়ে ললিতা জানিয়েছেন, তিনিই সম্ভবত দেশের সবথেকে প্রবীন নৌসেনা আধিকারিকের স্ত্রী। সেই হিসাবে দুজনের বয়সের ফারাক অনেক। অথচ হিমাংশীর কথায় এতটুকু ভুল খুঁজে পাননি তিনি। বরং তাঁকে ‘পারফেক্ট ফৌজি ওয়াইফ’ এই সম্বোধন করেছেন। দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে (Pahalgam) শান্তিই যে একমাত্র কাম্য হওয়া উচিত তা বুঝিয়েছেন ইনিও। তবে হ্যাঁ, দোষীদের উপযুক্ত শাস্তি দিতে হবে, এতে কোনও দ্বিমত নেই। তবে এই প্রশংসা আলাদাভাবে বলতে হচ্ছে কেন? প্রাক্তন সেনা আধিকারিকের স্ত্রীকে কেনই বা খোলা চিঠি পাঠাতে হল সদ্য স্বামীহারা এক তরুণীকে। উত্তরটা সহজেই অনুমেয়। কয়েকদিনের ঘটনা ফিরে দেখলেই আরও স্পষ্ট হবে বিষয়টা।
এপ্রিলের ২২ তারিখ কাশ্মীরের জঙ্গি হামলায় প্রাণ হারালেন সাধারণ পর্যটকরা। চোখের সামনে স্বামীকে, প্রিয় মানুষকে খুন হতে দেখলেন অনেকে। কান্না ভুলে তাঁদের কেউ কেউ শেষ চেষ্টা করলেন বাঁচানোর! তাতে লাভ খুব একটা হল না। মৃত্যু উপত্যকার (Pahalgam) কালো অন্ধকার এক লহমায় ঢেকে ফেলেছে ভূস্বর্গের নৈস্বর্গিক সৌন্দর্যকে। প্রিয় কাশ্মীর ততক্ষণে বিভীষিকা। খবর ছড়াল চারদিকে। কান্নার রেশ আরও বাড়ল। জন্ম নিল কিছু দৃশ্য। স্বামীর মৃত শরীরের পাশে অসহায় স্ত্রীর ছবি বেশ ভাইরাল হল নেটদুনিয়ায়। সবাই দেখলেন, কষ্ট পেলেন, ক্ষুব্ধ হলেন। যারা হলেন না তাঁদের জন্য এল আরও আরও ছবি, লেখা, মন্তব্য…। অস্থির হয়ে উঠল গোটা সমাজ। প্রতিশোধ নিতেই হবে, এই স্পৃহা অচিরে জন্মাল অনেকের মনে। সামনে এল ধর্মের বিভাজন। বলা ভালো, মুখ্য হয়ে উঠল সেটাই। যারা মারা গেলেন তাঁদের চেয়েও বেশি আলোচনা শুরু হল সন্ত্রাসের ধর্ম নিয়ে। বিষয়টা এমনভাবে দেখানো হল, যেন এ হামলা ধর্মযুদ্ধের ইঙ্গিত। তাতে ইন্ধন জোগালেন অনেকে। বিরোধিতা করতে গেলেই শুনতে হল দেশদ্রোহের তত্ত্ব। বিধর্মীর তকমা চাপল কারও কারও গায়ে। শুধু তাই নয়, সংবিধান যে ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলে, তাকেও প্রশ্নের সামনে ফেলা হল! কত তর্ক, কত বিতর্ক। একটা বিষয় স্পষ্ট করা হল, প্রতিবাদের ভাষায় ধর্মকে জুড়তেই হবে। উলটোসুরে কেউ কিছু বললেই, বিতর্ক। আর সেই কারণেই আঙুল উঠল স্বামীহারা হিমাংশীর দিকেও। বিষয়টা এতটাই গুরুতর পর্যায় পৌঁছল যে ললিতা রামদাস বাধ্য হলেন, খোলা চিঠিতে নিজের মতামত জানাতে। তাতে আর কারও উপর প্রভাব না পড়ুক, হিমাংশী অন্তত আশ্বস্ত হবেন, তিনি ভুল নন!