২ মে এলে বাঙালির মনে পড়ে তার একজন সত্যজিৎ রায় আছেন। কিন্তু সত্যজিতের যে নিজস্ব একটা বাঙালিয়ানা ছিল, ছবিতে লেখায় তিনি নিজের বোধ-দর্শন-চেতনা দিয়ে বাঙালিকে একভাবে নির্মাণ করে চলেছিলেন, সে-কথা কি মনে থাকে? নাকি ভিন্নমত নাকচের উগ্র বাসনায় যুক্তিবোধ জলাঞ্জলি দেওয়া বাঙালিই আসলে সহমরণে পাঠিয়েছে সত্যিজিতের বাঙালিকে?
লিখলেন, রণিতা চট্টোপাধ্যায়।
পাঠ: চৈতালী বক্সী।
দেশজোড়া অনাহারের মধ্যে সমস্ত সুখাদ্য গোগ্রাসে গিলে নিচ্ছেন রাজামশাই। এমনকি রাজার কর্মীরও সে সম্ভারে অধিকার নেই, কেন-না সমস্ত খিদের উলটোদিকে রাজামশাইয়ের উত্তর, আজ বাদে কাল যুদ্ধু হবে। এদিকে সেনাবাহিনী, যারা সত্যি সত্যিই সশরীরে যুদ্ধে চলেছে, তাদের হাল দেখে দর্শকের সন্দেহ হয়, ‘আধপেটা খেয়ে বুঝি মরে!’ রাজার সেনারও যেখানে এহেন দশা, সেখানে আম প্রজার কপালে যে অষ্টরম্ভাই জুটবে তাতে আর সন্দেহ কী! সুতরাং যুদ্ধ নিয়ে সাধারণ মানুষ যতই মেতে উঠুক, আদতে তার ভাগ্যে সে যুদ্ধের ফল কী হবে, তা ভারি সহজ করে বুঝিয়ে সত্যজিৎ রায় (Satyajit Ray) আমাদের বলেছিলেন,
“মিথ্যে অস্ত্রশস্ত্র ধরে
প্রাণটা কেন যায় বেঘোরে
রাজ্যে রাজ্যে পরস্পরে
দ্বন্দ্বে অমঙ্গল।”
আজকের পালটে-যাওয়া পরিস্থিতিতে যখন প্রতিবেশী দেশকে শিক্ষা দিতে দেশজুড়ে যুদ্ধ যুদ্ধ রব উঠেছে, তখন বাঙালির বোধহয় সে কথা মনে পড়া উচিত ছিল। বাঙালির কথাই বিশেষ করে বলছি, কেন-না আলাদা কোনও শ্রম ছাড়াই, কেবল জন্মসূত্রের প্রিভিলেজেই বাঙালির একজন সত্যজিৎ রায় আছেন। যাবতীয় আকালের মাঝেও বাঙালি যা কিছু নিয়ে গর্বে বুক ফুলিয়ে রাখে, সে সবকিছুর মধ্যে সত্যজিৎ রায় (Satyajit Ray) অন্যতম। কিন্তু পূজার ছলে ভুলে থাকার অভ্যাসও তার একান্ত আপন। সত্যজিৎ বাঙালি আর আমিও বাঙালি, লজিকের এই সহজ সমীকরণ নিয়ে তার প্রবল দরদ। কিন্তু সত্যজিতের যে নিজস্ব একটা বাঙালিয়ানা ছিল, ছবিতে লেখায় তিনি নিজের বোধ-দর্শন-চেতনা দিয়ে বাঙালিকে একভাবে নির্মাণ করে চলেছিলেন, সে কথা আমরা আদৌ মনে রেখেছি কি?

তা হলে তো সেই সত্যজিৎকে বাঙালির চেনারই কথা ছিল, যিনি অদলীয় হয়েও প্রবলভাবে রাজনৈতিক। যিনি ছোটদের ছবিতেও ভালো রাজা আর দুষ্টু রাজার গল্পের আদলে ফ্যাসিবাদের মুখোশ খুলে দেন। সত্যজিতের ছবিতে তাঁর সমকালের ঋত্বিক-মৃণালের মতো স্পষ্ট রাজনীতির ভাষ্য খুঁজে না পেয়ে সেই বাঙালি হতাশ হয়েছে, যে জানে পলিটিক্স মানেই পার্টিজান। অথচ সত্যজিৎ (Satyajit Ray) তাঁর চেতনায় রেখেছিলেন এমন বাঙালি যুবককে, মানুষের শতাব্দীজোড়া যাত্রার সালতামামি করলে যে চন্দ্রাভিযানের চেয়ে এগিয়ে রাখে ভিয়েতনাম যুদ্ধকে। আজকের যে-বাঙালি গাজার গণহত্যার প্রতিবাদ দেখলে উলটো আক্রমণ শানায়, তার চেতনায় সত্যজিতের সেই বাঙালি যুবকের ঠাঁই আর হল কই! ধর্মের দাঁড়িপাল্লায় মানুষকে বিচার করার অভ্যাসেই তারা কখনও শিশুহত্যার পক্ষে যুক্তি সাজায়, কখনও যুদ্ধহুংকার দেয় গলা ছেড়ে।
সেখানে সত্যজিতের গড়ে-তোলা বাঙালিমানসের অবস্থান কীরকম?
তাঁর ‘আগন্তুক’-এর মনোমোহন দত্ত সপাটে বলছেন, “কাস্ট রিলিজিয়ন ঘোর গোলমেলে… যে জিনিস মানুষে মানুষে বিভেদ সৃষ্টি করে, সেটা আমি মানি না।” অসহায় মানুষকে আলো, প্রাণ দেবে কোন ঈশ্বর— আগন্তুকের এই প্রশ্নের পাশাপাশি ‘গণশত্রু’-র বাঙালি ডাক্তার বুঝিয়ে দিচ্ছেন, রাজনীতির সঙ্গে ধর্মব্যবসার আঁতাঁত হলে সেই সংগঠিত শক্তি ঠিক কতখানি বিপজ্জনক।

সত্যজিৎ নতুন দিনের বাঙালির মধ্যে সেই বোধ দেখতে চেয়েছিলেন, যা রাজনীতি থেকে ধর্ম থেকে সংস্কারের যে কোনোরকম গোঁড়ামির বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারে। আর সেই প্রতিরোধ যে দলীয় স্লোগান ছাড়াও ব্যক্তিগত বিশ্বাসের ভূমি থেকে উঠে আসতে পারে, ছবিতে লেখায় তিনি সে কথা বারেবারে বুঝিয়েছেন। তাই তাঁর ফেলুদা এককভাবে মছলিবাবার ভণ্ডামি ফাঁস করেছে, ধরে ফেলেছে কুসংস্কারের ব্যবসা করা ভবানন্দের কীর্তি। ‘দেবী’ কিংবা ‘গণশত্রু’-তে গোটা পরিবার বা সমাজের অন্ধ ধর্মবিশ্বাসের বিপরীতে একক প্রতিবাদে থিতু হয়েছে সত্যজিতের (Satyajit Ray) নায়কেরা।
তা বলে কি তারা জিতেও গেছে সবসময়? উঁহুঁ। সত্যজিৎ তাঁর নিজস্ব চিন্তায় যে বাঙালির ধারণা তৈরি করছিলেন, সে আর যাই হোক, ব্যাটম্যান নয়। সে দ্বিধায় পড়ে, ভুল করে, আপস করে, অন্যায়ও করে, এমনকি লড়াইয়ের ভূমি ছেড়ে পালিয়েও যায়। ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’-তে অকালে বিধবা বান্ধবীর দিকে সহানুভূতি আর আকর্ষণের হাত বাড়িয়েও সঞ্জয় নিজের ছুঁতমার্গের কাছেই অসহায়। বারেবারে কপালের ঘাম মোছা, গাড়ির শব্দে কেউ এল ভেবে চমকে ওঠা— বাঙালির ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’-র পিঠ-বাঁচানোকে এখানে চমৎকার চিনিয়েছেন সত্যজিৎ। আবার একই সিনেমায় জ্বলজ্বল করে ওঠে শহুরে বাঙালির আদিবাসী যুবতি বিলাসের শখ। চাকরি দুর্নীতির সাম্প্রতিক ঢেউয়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে আমাদের মনে পড়ে ‘জন-অরণ্য’-এর সোমনাথকে, যে নিজের চাকরি পাকা করতে বন্ধুর বোনকে দেহব্যবসার পথে এক ধাপ এগিয়ে দেয়। মনে পড়ে ‘সীমাবদ্ধ’-র শ্যামলেন্দুকে, যে চাকরিতে প্রোমোশনের দরজা খুলতে কারখানার লকআউটের নেপথ্যে কলকাঠি নাড়ে। শ্যামলেন্দুর অন্তর্নিহিত টানাপড়েনের পাশেই দাঁড়িয়ে থাকে ‘নায়ক’-এর অরিন্দম, ওপরে ওঠার জন্য নিজের যাবতীয় আপস আর অন্যায় নিয়ে যে স্পষ্ট, দ্বিধাহীন। মনে থেকে যায় ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’-র সেই প্রতিবাদী যুবক সিদ্ধার্থকেও, শেষ পর্যন্ত ওলটপালট রাগ আর হতাশা নিয়ে যাকে শিকড় থেকে সরে যেতে হয়, পালিয়ে যাওয়ার মতো করেই। আর সিদ্ধার্থর সেই একলা পালিয়ে যাওয়ার মধ্যে, ফ্যানের নিচে একলা শ্যামলেন্দুর বসে থাকার মধ্যে জেগে ওঠে ‘ময়ূরকণ্ঠী জেলি’-র অমোঘ শেষবাক্য, বিবেকের নিজস্ব বয়ান। আসলে, সমস্ত পারা এবং না-পারার মধ্যে দিয়েই সত্যজিতের গড়ে-তোলা বাঙালির পিছুটান হয়ে থেকে গিয়েছে সেই বিবেক।

সত্যজিতের নায়কেরাই নয় কেবল, তাঁর নিপাট সাধারণ জনতারও আর কিছু না থাক, সেই বোধের অঙ্গীকার ছিল কোনও না কোনও ভাবে। বাজার-গরম-করা পাল্প ফিকশন লেখা, বিদেশি সাহিত্য থেকে এদিকে-ওদিকে অনুপ্রেরণা তুলে আনা জটায়ুকে দেখেই সে কথা বুঝে নেওয়া যায়। সত্যজিতের (Satyajit Ray) সেই আম বাঙালি ছাপোষা, তবু সে টেনেটুনে জিইয়ে রাখে মূল্যবোধ। সে আবেগে বাঁচে, আর আবেগের সামনে যুক্তি প্রশ্ন তুললে আচমকাই খেই হারিয়ে ফেলে। যেমন আগন্তুকে উৎপল দত্তকে বাঙালির আড্ডার মাহাত্ম্য বোঝাতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথের প্রসঙ্গ টেনে আনেন রবি ঘোষ, আর তারপরেই থমকে গিয়ে যাচাই করতে চান— রবি ঠাকুর আড্ডা দেননি, না? ভিন্ন যুক্তি, ভিন্ন মতকেও এককথায় নাকচ না করে যে তাকে যাচাই করতে হয়, এ ছবিতেই তা দেখান ধৃতিমান। আর আমরা বুঝি, বিবেক-মূল্যবোধের বয়ানের পাশাপাশি সত্যজিতের বাঙালি আসলে এইরকমও, যে বিশ্বাস না করলে পালটা প্রশ্নে ভিন্নমতকে যাচিয়ে নিতে চায়। আজকের যে সোশ্যাল মিডিয়া নিবাসী বাঙালি ধর্ম-মত-বিশ্বাস-রাজনীতির প্রশ্নে প্রতিদিন ‘অপর’-এর প্রতি ঘৃণা উগরে দেয়, প্রতি বছর দোসরা মে এলে তার মনে পড়ে বটে যে তার একজন সত্যজিৎ ছিলেন, কিন্তু সত্যজিতের বাঙালিকে যে সে নিজে হাতেই সহমরণে পাঠিয়েছে সে কথা সে তলিয়ে ভাবে না।
সে মৃত্যুসংবাদ মনে রাখলে স্বর্গ থেকে ‘মানিকদা’-র (Satyajit Ray) স্বাগতভাষণের আরেকটা মিম কি সে তৈরি করে ফেলত না এতদিনে?
