সেই পাঁচ বছরের জন্মদিনে দেখতে গিয়েছিলেন ‘সোনার কেল্লা’। সেখান থেকে ফেলুদা সিরিজের থিম সং গাওয়া। পাশ্চাত্য ধ্রূপদীয়ানা আর বাংলার নিজস্ব রীতি মিলিয়ে সত্যজিতের সুরের যে নিজের ধারা তা বারেবারেই হাতছানি দিয়েছে তাঁকে। তাঁর সঙ্গীতে হয়তো প্রভাব নেই, তবে কথা-সুরে সত্যজিতের আধুনিকতার সঙ্গে লগ্ন হয়েই থেকেছেন। ২ মে তাঁর সত্যজিৎ যাপনের কথা শোনালেন ক্যাকটাস-এর গায়ক সিধু।
তখন আর কে জানত যে ক্ল্যাসিক দেখছি! বোঝার বয়সও হয়নি। সেটা আমার পঞ্চম জন্মদিনের ঠিক আগেরদিন। আমার জন্মদিন ২৮ ডিসেম্বর, ২৭ ডিসেম্বর রিলিজ করেছিল ‘সোনার কেল্লা’। আমার জন্মদিন সেলিব্রেট করতেই বাড়ির সকলে মিলে দেখতে গিয়েছিলাম ছবিটা। কিন্তু ওই পর্যন্তই। এর বেশি কিছু মনে নেই। তবে সত্যজিতে (Satyajit Ray) হাতেখড়ি যদি বলা যায়, তাহলে সেই ছোট্টবেলাতেই।
এরপর আর একটু বড় হলাম। ক্লাস সেভেন-এইটে যখন পড়ি, তখন হাতে এল সত্যজিতের বই- ‘যত কাণ্ড কাঠমান্ডুতে’, ‘হত্যাপুরী’, ‘টিনটোরেটোর যিশু’। তখন তো যাকে বলে বইগুলো হাতে পাচ্ছি আর গোগ্রাসে পড়ছি। পড়তে পড়তে শিহরিত হতাম। মনে হত, মনে মনে গোটা একটা সিনেমাই যেন দেখে ফেলছি। এমনই সে লেখার গুণ। সেগুলো যে পরবর্তীকালে বাংলা সিনেমার প্রধান উপজীব্য হয়ে উঠবে, সেই বয়সে এমন ধারণা ছিল না। তবে, বড় হয়ে ওঠা বলতে যা বোঝায়, সেই পর্বে বাঙালি সত্যজিৎ (Satyajit Ray) ছায়াতেই বেড়ে ওঠে। আমার ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। ক্রমে তাঁকে বুঝতে শিখেছি। তাঁর সাহিত্য, সংগীতের ভিতর ডুব দিতে শিখেছি। সংগীতের কথাতেই আসি। সত্যজিতের সংগীত আমার খুবই ভালো লাগে। কেননা, খেয়াল করলে দেখা যাবে, তাঁর সংগীত ওয়েস্টার্ন ক্ল্যাসিক্যালের চলনটা গ্রহণ করছে। আবার তার সঙ্গে বাংলার লোকসুর বা রিদম প্যাটার্ন- ধরা যাক বাংলা ঢোল, সেগুলোও ব্যবহৃত হচ্ছে। এই যে ওয়েস্টার্ন ক্ল্যাসিক্যালের সঙ্গে বাংলার লোকসুরের মেলবন্ধন ঘটানো যায়, তা সত্যজিৎই ভাবতে পেরেছিলেন। শোনার রেঞ্জ ব্যাপ্ত ছিল বলেই এই রসায়ন উনি ভাবতে পেরেছিলেন।
আরও শুনুন: বাঙালির নাহয় সত্যজিৎ আছেন, কিন্তু সত্যজিতের বাঙালি গেল কোথায়?
ক্যাকটাস-এর ‘নীল নির্জনে’ অ্যালবাম যখন রিলিজ হয় – তখন ক্যাসেটের চল ছিল, ক্যাসেটে মোট আটটা গান থাকত – আমাদের বলা হয়েছিল, আমরা চাইলে ওই ফিল্মে ব্যবহৃত গান ছাড়াও যে কোনও অন্য গানের ‘কভার’ করতে পারি। তাতে আমরা করেছিলাম ‘দুঃখ কীসে হয়’। ব্যবহার করেছিলাম একদম মডার্ন ইলেকট্রনিক ও পপ-রক মিউজিকের উপাদান। লাইভ শো করার সময় তো বহুবার গেয়েছি- ‘মহারাজা তোমারে সেলাম, মোরা বাংলাদেশের থেকে এলাম’। এ ছাড়া ‘বুদ্ধ হেসেছে, যুদ্ধ এসেছে’- আমাদের এই গানটিও অনেকের ভালো লাগে, বেশ জনপ্রিয়, তো তিন-চার বছরের একটা ফেজ ছিল, যখন ‘ও রে হাল্লা রাজার সেনা, তোরা যুদ্ধ করে করবি কী তা বল’ দিয়ে গাওয়া শুরু করে তারপর ‘বুদ্ধ হেসেছে, যুদ্ধ এসেছে’ মূল গানটি গাইতাম। প্রভাব হয়তো নয়, তবে সত্যজিতের সংগীত এভাবেই আমার সঙ্গে থেকে গিয়েছে। সত্যজিতের (Satyajit Ray) গানের কথা, সুর এতটাই আধুনিক, ২০২৫-এ দাঁড়িয়েও এতখানি প্রাসঙ্গিক, যে, আমরা দূরে সরে থাকতে পারি না। বারেবারে সেখানেই ফিরতে হয়।
একেবারে সাম্প্রতিক সময়ের কথা যদি বলি, গত বছর ক্যাকটাস আমেরিকা ট্যুর করেছে। সেই ট্যুরেও অন্যতম চমক ছিল ‘রে মেডলে’ (Ray Medley)। সেখানে আমি আর পটা মিলে গাইলাম ‘মোরা দুজনায় রাজার জামাই’। এ গানটা ছাড়াও, ‘এসে হীরক দেশে’, ‘মহারাজা তোমারে সেলাম’, ‘আহা কি আনন্দ’ গানগুলো। সঙ্গে ‘ফেলুদা’ আর ‘পথের পাঁচালী’-র থিম মিউজিক মিলিয়ে-মিশিয়ে তৈরি হয়েছিল মেডলে-টি। আমেরিকার প্রবাসী বাঙালিরা ভীষণ পছন্দ করেছিলেন এই উপস্থাপনা। সত্যজিতের (Satyajit Ray) সুর সরাসরি আমার অরিজিনাল মিউজিক-কে বা ক্যাকটাসের মিউজিক-কে প্রভাবিত করেছে, এমন দাবি করব না। তবে সমগ্র কেরিয়ারে ওঁর মিউজিক থেকে কখনও দূরেও যেতে পারিনি।
আরও শুনুন: বড়পর্দায় ‘সোনার কেল্লা’ ফিরে দেখা আসলে হারানো যৌথতারই খোঁজ
তো এই আমি যে কখনও ফেলুদা-সিরিজের থিম সং গাইব, এমনটা ভাবিনি। সত্যি বলতে সেই ছোটবেলায় তো থিম সং ব্যাপারটাই বুঝতাম না সেভাবে। আর ফেলুদার থিম মিউজিক যে বাঙালি সংস্কৃতির চিহ্ন হয়ে উঠবে, এ বিষয়েও ধারণা ছিল না। তা সেই সুযোগ এসে গেল, গেয়েও ফেললাম। বলা যায়, এই সুর বঙ্গজীবনের অঙ্গই হয়ে গিয়েছে। সেই ১৯৭৪ সালে যখন ‘সোনার কেল্লা’ রিলিজ হয়, তখন প্রথমবার ব্যবহৃত হয়ে ছিল। এরপর ৫১ বছর পেরিয়ে গিয়েছে। এই ৫১ বছরে যদি ফেলুদাকে নিয়ে কমপক্ষে ১৫টি সিনেমাও হয়ে থাকে, আর তাতে যদি একই মিউজিকের ধারা অক্ষুণ্ণ থেকে থাকে, তবে বলতেই হয় যে সেটি বাঙালির সাংস্কৃতিক চিহ্নই হয়ে উঠেছে। ‘ফেলুদা’-র থিম মিউজিক কখনও বদলে যায় না। এক সিনেমা থেকে অন্য সিনেমায় প্রয়োগ বদলালেও মূল সুর একই থেকে যায়। আমরা যদি জেমস বন্ড-এর সিনেমাগুলো খেয়াল করি, তাহলেও দেখব যে, সাউন্ড বা তার প্রয়োগে সামান্য পরিবর্তন আনা হলেও মূল সুর থেকে কখনও সরে যাওয়া হয়নি। ‘ফেলুদা’-র ক্ষেত্রেও তাই-ই। বর্তমান সময়ের ডিরেক্টর-প্রোডিউসার যাঁরাই কাজ করেছেন ‘ফেলুদা’ নিয়ে, কেউ কখনওই সেই সুর আমূল পালটানো বা বিকৃত করবার চেষ্টা করেননি।
একেবারে সাম্প্রতিক সময়ে যে কাজ করা হয়েছে – সুরে শব্দ বসিয়ে গান তৈরি – তা একরকম ঝুঁকি নেওয়াই বলা চলে। সঙ্গীত পরিচালক জয় সরকার এবং গীতিকার শ্রীজাত সেই ঝুঁকিটাও অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে নিয়েছেন বলেই আমি মনে করি। আর সে গান গাওয়ার জন্য তাঁরা যে আমাকে বিবেচনা করেছেন, সে কারণে তাঁদের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। সেই যে ছোটবেলাতে সোনার কেল্লা দেখতে গিয়েছিলাম, আর এই যে ফেলুদা থিমসং গাইতে পারলাম- বলতে পারি, আমি আছি এই সত্যজিত-বৃত্তের ভিতরই।
(সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে অনুলিখন: উৎসা তরফদার)