বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পর্নোগ্রাফির সঙ্গে মানুষের পরিচয় নাবালক বয়সেই হয়ে থাকে। পৃথিবীতে জীবের জন্মরহস্যের যতটুকু তার জানার বাইরে থেকেছে এতকাল, তা হুট করেই পর্ন-এর সুবাদে জানা হয়ে যায় এক ধাক্কায়। অজ্ঞানতা থেকে জ্ঞানের পথে এগিয়ে চলা নাবালকটি ভিডিওতে উদ্দাম যৌনতা দেখে সহজেই আকর্ষণ অনুভব করে। আর ভাবতে শুরু করে যে, সেখানে দেখানো যাবতীয় সম্ভব বা প্রায়-অসম্ভব অঙ্গভঙ্গী নিতান্তই স্বাভাবিক।
অল্পবয়সে সিনেমা দেখতে বসে অনেক সময়েই আমরা ভেবে ফেলি যে নায়ক বুঝি সত্যি সত্যি দশটা বুলেট হজম করেও বেঁচে থাকে। কিংবা সবার চোখে ধুলো দিয়ে নায়িকা-সমেত পালিয়ে যাওয়া, এমনও কিছু শক্ত নয় বোধহয়। এক্ষেত্রেও ঠিক তেমনটাই। পর্নোগ্রাফিক ভিডিও দেখতে দেখতে মানুষ ভাবতে শুরু করে, বাস্তবের যৌনজীবনের সঙ্গে তার এমন কিছু তফাত নেই। এ পর্যন্ত তেমন সমস্যাও ছিল না। বয়স বাড়ার সঙ্গেই তো অভিজ্ঞ হয় মানুষ। কিন্তু সমস্যা দেখা দেয় তখন, যখন অতিরিক্ত পর্ন-অ্যাডিকশনের প্রভাব প্রকাশ পায় বিকৃতরূপে। সমীক্ষা বলে, যে সব পুরুষেরা নিয়মিত নীল-ছবি দেখেন, তাঁরা সহজেই নারীশরীরকে যৌন সম্ভোগের বস্তু বলে মনে করেন। পথে-ঘাটে মেয়েদের দেখলেও তাঁদের শরীরটিই চোখে পড়ে আগে।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পর্নোগ্রাফির সঙ্গে মানুষের পরিচয় নাবালক বয়সেই হয়ে থাকে। পৃথিবীতে জীবের জন্মরহস্যের যতটুকু তার জানার বাইরে থেকেছে এতকাল, তা হুট করেই পর্ন-এর সুবাদে জানা হয়ে যায় এক ধাক্কায়। সঙ্গে জানা হয় আরও নানান অভিনব বিষয়। যেমন, মানুষভেদে যৌন চাহিদা, অভ্যেস বা পছন্দের সঙ্গীর শারীরিক বৈশিষ্ট্য বদলে বদলে যায়। অজ্ঞানতা থেকে জ্ঞানের পথে এগিয়ে চলা নাবালকটি ভিডিওতে উদ্দাম যৌনতা দেখে সহজেই আকর্ষণ অনুভব করে। আর ভাবতে শুরু করে যে, সেখানে দেখানো যাবতীয় সম্ভব বা প্রায়-অসম্ভব অঙ্গভঙ্গী নিতান্তই স্বাভাবিক। আর এখানেই জন্ম নেয় এক সমস্যাজনক জটিল মনস্তত্ব।
:আরও শুনুন:
পর্ন দেখলেই জরিমানা নয় হাজতবাস! ফোনে আপনার কাছেও কি এসেছে হুমকি?
পর্ন শেখায় যে, নারী সঙ্গীটিকে বলপূর্বক যৌন সম্পর্কে বাধ্য করাই যায়। পর্ন-এর বিবিধ জঁর আলো করে থাকে অসহায় নারীদের উপর যৌন অধিগ্রহণ। ভিডিও-তে দেখা যায়, যাত্রাভাড়া বা প্রাপ্য টাকা দিতে ব্যর্থ হলে পুরুষ কলাকুশলীটি নারীর উপর বলপ্রয়োগ করে। যৌনতাকে ‘কারেন্সি’ করে উদ্ধার পায় নারীটি। এ অবস্থায় পুরুষ দর্শক সহজেই বুঝে যান, তাঁর নাগালে থাকা পছন্দ না অপছন্দের নারীটিকে ধরাশায়ী করবার সহজ উপায়। শুধু তাই নয়, বর্তমানের সহজলভ্য সোশ্যাল মিডিয়াময় দুনিয়ায়, জনসাধারণের সাধারণ জ্ঞানের মধ্যেই জায়গা করে নেয় ‘বিডিএসএম’ বা ‘হার্ডকোর পর্ন’, যার মূল পরিভাষাই এক লিঙ্গের উপর অপর লিঙ্গের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা। এ ধরণের পর্নোগ্রাফিক ভিডিওতে দেখা যায়, একজনকে নানাভাবে শারীরিক যন্ত্রণা দিয়ে কীভাবে সুখলাভ করেন অন্য সঙ্গী। যা-কিছু দেখে রীতিমত গা শিউরে ওঠে সাধারণ মানুষের, ‘হার্ডকোর’ তাকেই অত্যন্ত স্বাভাবিক চাহিদা হিসেবে ব্যক্ত করে।
আর তাই কানাঘুষো চলছে, ইউনাইটেড কিংডমে মুক্তি পাওয়া সমস্ত পর্ন ভিডিও ও ফিল্ম থেকে নাকি বাদ দেওয়া হবে ‘চোকিং’-এর দৃশ্য। ‘চোকিং’, যার আক্ষরিক বঙ্গানুবাদ করলে দাঁড়ায়, বলপূর্বক কণ্ঠরোধ। দেখা যাচ্ছে, এ জাতীয় যৌন আচারকে স্বাভাবিক মনে করে, বিপুল সংখ্যক পুরুষই তা অনুকরণ করতে চাইছে। অথচ নাম গোপন রেখে নারী সঙ্গীরা জানাচ্ছেন, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এমনধারা হিংসাত্মক ব্যবহারে অস্বস্তি বোধ করেন তাঁরা। ‘ইউ কে শ্যাডো ভিক্টিমস্ মিনিস্টার’ অ্যালিসিয়া কার্ন্স তাঁর সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘বাস্তব জীবনে নারীদের যৌন হেনস্থা বন্ধ করতে হলে, সবার আগে বন্ধ করতে হবে ‘ভায়োলেন্ট’ পর্নোগ্রাফি।’
:আরও শুনুন:
কীভাবে রুখবেন Domestic Violence? জেনে নিন কী সুরক্ষা দিতে পারে ভারতীয় আইন
তাই ভাবতে বসলে অবাক হতে হয় এই ভেবে যে, পুরুষতান্ত্রিকতা কেবল রান্নাঘর কিংবা বেডরুমে মেয়েদের আবদ্ধ রেখেই শেষ হয়ে যায়নি। সাধারণ মানুষের কাছে যা কিছু বিনোদন, তা সিনেমার মতো সর্বজনগ্রাহ্য হোক, বা নিষিদ্ধ ছবির মতো একান্তে উপভোগ্য, সেখানেও জাঁকিয়ে বসেছে পিতৃতন্ত্র। ঢাক-ঢোল পিটিয়ে নয়, বরং সবার অলক্ষ্যেই অধিগ্রহণ করে নিয়েছে যা কিছু আমাদের কাছে ‘এন্টারটেইনমেন্ট’। ভাবতে অদ্ভুত লাগলেও, সিনেমায় ভিলেনদের হটিয়ে নায়িকাকে উদ্ধার করে থাকা নায়কের সঙ্গে ‘হার্ডকোর পর্ন’-এর বলপ্রয়োগকারী পুরুষ চরিত্রটি কোথাও গিয়ে মিলে যায়। যৌন অভ্যেসের মধ্যে থেকে যন্ত্রণাদায়ী আচারগুলিকে যতক্ষণ না ‘অস্বাভাবিক’ তকমা দিয়ে ‘ব্যান’ করা থাকে, ততক্ষণ পর্যন্ত দৈনন্দিন চলার পথে নারী হেনস্থা রোধ করা বোধহয় একপ্রকার অসম্ভবই।