ন্যাশনাল ক্রাইম ব্যুরোর রিপোর্ট জানিয়েছিল, ২০২২ সালে প্রতি ঘণ্টায় অন্তত ৫১টি নারীনিগ্রহের ঘটনা ঘটে। তাও লিখিত ভাবে, অলিখিত সংখ্যা আমাদের অজানা। ধর্ষণের ঘটনা প্রতি ১৬ মিনিটে ১টি। এই যখন তথ্য, তখন সেখানে ‘বুরা না মানো হোলি হ্যায়’ কুসংস্কার শুধু নয়, অপসংস্কৃতিই।
হোলির দিনে গানের যদি প্লে-লিস্ট বানিয়ে ফেলা যায়, তাহলে সকলের লিস্টেই মোটামুটি কমন কয়েকটি গান থাকবে। আসুন, একবার সেই গানের কথার দিকে নজর দেওয়া যাক। ধরা যাক, ‘রং বরষে ভিগে…’ গানটির কথা। হোলির দিনে এ-গান বাজবে না, এমনটা প্রায় হয় না। সেই ১৯৮১ সালের ছবি ‘সিলসিলা’। সেই থেকে আজ পর্যন্ত এই গানের আবেদন অটুট। সে গানের দ্বিতীয় পঙক্তিই বলছে, নায়কের ছুড়ে দেওয়া রঙে ভিজে উঠেছে নায়িকার অন্তর্বাস।
১৯৯৩ সালের ‘ডর’ ছবির গান ‘অঙ্গ সে অঙ্গ লাগানা’ হোলির দিনে বেজে ওঠা অন্যতম একটি গান। সে গানেও যেভাবে রং দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে, আর যা যা করতে বারণ করা হচ্ছে, তা ইঙ্গিত দেয় যে, রঙের খেলার মধ্যে এক ধরনের বাধা-না-মানা উচ্ছ্বাস, উল্লাস আছে। আর একটু এগিয়ে এসে ২০১৩ সালের ‘ইয়ে জওয়ানি হ্যায় দিওয়ানি’ ছবির ‘বলম পিচকারি’ হয়ে উঠল হোলির জনপ্রিয় গান। সেখানেও নায়িকার হাত ধরার কথা আর তার প্রত্যুত্তরে নায়িকার সাবধানবাণী। দ্বিতীয় অন্তরায় স্পষ্ট হয়ে যায় নায়ক মুখে এক কথা বলছে আর আদতে যে অন্য কিছু যে চাইছে, সে চালাকি ধরে ফেলেছে নায়িকা। সন্দেহ নেই যে, গানের কথা হোলি বা রং খেলার ঐতিহ্যকে মাথায় রেখেই তৈরি। রাধা-কৃষ্ণের প্রণয়ে যে ডাকাতিয়া ভাব, তাই-ই এই ধরনের কথারচনার কেন্দ্রে আছে। আর সন্দেহাতীত ভাবেই সে কথার উৎস ভারতীয় পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতা। যেন, পুরুষের কাছে শুধু দস্যুতাই প্রত্যাশা করেছেন নারীরা। সত্যিই কি তাই! জানার চেষ্টাই করা হয়নি, কেননা ‘বুরা না মানো হোলি হ্যায়!’।
এখন এই, ‘বুরা না মানো হোলি হ্যায়’ তো কোনও শাস্ত্রবাক্য নয়। কোথা থেকে এর উৎপত্তি তাও নিশ্চিত জানা যায় না। তবু প্রায় শাস্ত্রের মতোই দোলের দিন তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করা হয়। রং খেলার অছিলায় যাবতীয় দৃষ্টি ও আক্রমণ, মধুরের ছদ্মবেশে আদতে নারীশরীরেই উদ্দেশেই। সেখানে আদৌ নারীর সম্মতি আছে কি-না, তা এই আপ্তবাক্য খেয়াল করে না। বস্তুত মনে রাখতে চায় না বলেই এই ধরনের বাক্যের জন্ম। এটা ঠিক যে, হোলির যে প্রাচীন রীতি, সেখানে উদ্দামতা আছে। এক রকমের বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস আছে। এবং অনেক সময়ই তা সীমারেখা মানে না। বা, আধুনিক সফিস্টিকেশনের ধার ধারে না। কথা হল, সেই ‘সনাতন’ এখনও আঁকড়ে থাকা কি আদৌ আধুনিকতা? যে সময়ে দেশে অহরহ নারী নির্যাতনের ঘটনা, লাঞ্ছনার ঘটনা, সে সময়ে এই প্রাচীন বক্তব্যের সংস্কার হবে না-ই বা কেন! ন্যাশনাল ক্রাইম ব্যুরোর রিপোর্ট জানিয়েছিল, ২০২২ সালে প্রতি ঘণ্টায় অন্তত ৫১টি নারীনিগ্রহের ঘটনা ঘটে। তাও লিখিত ভাবে, অলিখিত সংখ্যা আমাদের অজানা। ধর্ষণের ঘটনা প্রতি ১৬ মিনিটে ১টি। এই যখন তথ্য, তখন সেখানে বুরা না মানো হোলি হ্যায় এক কুসংস্কার শুধু নয়, অপসংস্কৃতিই।
খেয়াল করলে দেখা যাবে, হোলির সূত্রপাত যে হোলিকা দহনের মাধ্যমে, সেখানেও লিখিত হচ্ছে একজন নারীর মৃত্যু। হিরণ্যকশিপুর নির্দেশে বোন হোলিকা বিষ্ণুভক্ত প্রহ্লাদকে নিয়ে ঢুকলেন অগ্নিকুণ্ডে। বিষ্ণুর কৃপায়, প্রহ্লাদ বাঁচল, আগুনের গ্রাসে গেলেন হোলিকা। রূপকার্থে বলা হয়, হোলিকাদহন আসলে সকল কুকাজ, অসততার সমাপ্তি। বাস্তবিক, একজন নারীর মৃত্যুই তো! সেই মৃত্যুর উপরই হোলির আনন্দের সূত্রপাত। এ-দেশে প্রতিবার হোলির পরেই বহু নারীনিগ্রহের খবর আসে। খবর আসে না এমন ঘটনাও বহু। সময় এগিয়েছে। নারীশরীরের অধিকার, তার পোশাক পরার অধিকার যে তার নিজস্ব, তা যে পিতৃতান্ত্রিক দৃষ্টিতে নিয়ন্ত্রিত হতে পারে না, সে কথা জোর দিয়ে বলছেন নারীরা। এই ভিত্তিতে গড়ে উঠছে নারীসাম্যের নানা আন্দোলন। এবং ধীরে হলেও বেড়া ভাঙার কাজটি কিন্তু হচ্ছে। স্পর্শে, সঙ্গমে অনুমতি যে জরুরি তা বুঝতে শিখছে এই সমাজ, পুরুষরা। এমনকী বৈবাহিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও। এ যদি এগোনোর একটা দিক হয়, তাহলে পিছুটান বোধহয় বুরা না মানো হোলির মত প্রাচীন মানসিকতার ঊর্ণাজাল।
আমরা কি এখনও তাতেই আটকে থাকব? ভাবার সময় বোধহয় এখনই।