কেন সারাজীবন ড্রাগ আর নেশার বোঝা বয়ে বেড়াতে রাজি ছিলেন মারাদোনা?

Published by: Sankha Biswas |    Posted: November 26, 2020 9:45 pm|    Updated: November 27, 2020 5:15 pm

Published by: Sankha Biswas Posted: November 26, 2020 9:45 pm Updated: November 27, 2020 5:15 pm

‘আমি মাদকাসক্ত ছিলাম। আছি। এবং থাকবও।’

এমনই বিস্ফোরক মন্তব্য করে বসলেন দিয়েগো আর্মান্দো মারাদোনা। আর্জেন্তিনার অন্যতম প্রথম সারির পত্রিকা ‘হ্যেন্তে’–তে।

সালটা উনিশশো ছিয়ানব্বই। আর্জেন্তিনাকে বিশ্বকাপ তুলে দেওয়ার দশম বর্ষপূর্তি দেশজুড়ে পালিত হয়েছে সাড়ম্বরে। বছর পাঁচ–ছয়েক হয়ে গিয়েছে ফিফা–র সাসপেনশনেরও। একানব্বই–এ সাসপেন্ড হয়েছিলেন নাপোলির হয়ে খেলার সময়। শরীরে কোকেইনের নমুনা মেলায়। চুরানব্বইয়ে নিষিদ্ধ মাদক এফিড্রিন নিয়ে মাঠে নামায় নির্বাসিত হন বিশ্ব ফুটবল থেকে। এত সাসপেনশনের পরও মাদক নেওয়া নিয়ে লজ্জিত তো ননই, উলটে স্ট্রেট–কাট কনফেস করে দিচ্ছেন মাদকপ্রেমের কথা। দুর্দম, দামাল সেই প্রেমকে যে কাছছাড়া করতে চান না আমৃত্যু, জানিয়ে দিচ্ছেন অকপটেই। প্রথমবার ড্রাগ নেন উনিশশো বিরাশি–তে, বাইশ বছর বয়সে, যখন প্রথম বার্সেলোনা আসেন ফুটবল খেলতে। এ প্রসঙ্গেও কোনও লুকোছাপা নেই। ক্লিয়ারকাট কনফেশন: ড্রাগ নেওয়াটা স্মার্ট মনে হয়েছিল বেশ। তাই নিয়েছিলাম। দেখুন মশাই, ফুটবল মাঠে ড্রাগ নেওয়া আলাদা কিছু নয়, অন্যান্য ক্ষেত্রর মতোই জলভাত। ফুটবলাররা ড্রাগ নিয়ে কুখ্যাত হচ্ছেন, এ ঘটনা তো নতুন কিছু নয়, বরাবরই ছিল। এবং অবশ্যই আমিই প্রথম নই। অসংখ্য ফুটবলার এর আগেও নিয়েছেন।

এই হচ্ছেন গিয়ে মারাদোনা। ভনিতার ধার ধারেন না। বক্তব্যে বেপরোয়া। ঘোষণায় সাহসী। আচরণে নির্ভীক। খেসারতে নিডর। জীবন যাপন করেছেন স্রেফ এবং স্রেফ নিজের ঢঙে, নিজের আইনে, নিজের শাসনে। এক চোখ মেরে স্পর্ধাভরে মস্তানি করেছেন জীবনের সঙ্গে। মারাদোনা ঈশ্বরের সেই বরপুত্র, প্রয়োজনে যিনি স্বয়ং ঈশ্বর বা ঈশ্বরের ‘সিভিক ভলান্টিয়্যর’রূপী সমাজকে একহাত নিতে পারেন। সমাজের সমালোচনাকে, তার যাবতীয় মরাল পোলিসিং–কে বুড়ো আঙুল দেখাতে পারেন। দেখিয়ে সোচ্চারে বলতে পারেন, মাঠের শিল্পই শেষ কথা বলে ভায়া, তোমরা নও।

জীবনযাপনে তিনি যতটা লাগামছাড়া, ছাঁটা সবুজ ঘাসের উপর ড্রিবলে ততটাই শৃঙখলাবদ্ধ। সম্পর্ক তৈরিতে যতটা বেপরোয়া, বহুমুখীন; ততটাই একমুখীন অফ দ্য বল সোলো রানে। তিনি বল নিয়ে একটার পর একটা প্লেয়ারের পাশ কাটিয়ে দৌড়ন, বিতর্কও দৌড়য় তাঁর পাশে পাশে। মাঝে মাঝে মনে হয়, বির্তকে তিনি ‘জড়ান’ না, বরং বিতর্কটাকে জড়িয়ে নেন বুকে, ইয়ার–দোস্তের মতো। স্ব–ইচ্ছায়, সচেতনে, হাসিমুখে। মনে হয়, কলঙ্কহীন নোয়াপাতি জীবনে তাঁর অরুচি। সেই বৈচিত্রহীন জীবনকে কটাক্ষ করে এই বুঝি গান ধরবেন, ‘দেশে দেশে নিন্দে রটে, পদে পদে বিপদ ঘটে…পুঁথির কথা কইনে মোরা অন্য কথা কই… ভালোমানুষ নই রে মোরা ভালোমানুষ নই…’।

২৫ নভেম্বর পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে ঈশ্বরভূমে পাড়ি দিয়েছেন ফুটবলের রাজপুত্তুর। মদ, মাদক, নারীসঙ্গ, মাফিয়াসঙ্গ। এইসবের হাতে সঁপে দেওয়া জীবনেও কিন্তু চলকে পড়েছিল আপসোসের কয়েক ফোঁটা। বলছেন সংবাদমাধ্যমকে, দু’হাজার চোদ্দোয়, ‘শরীরখারাপ বাঁধিয়ে আমি আমার প্রতিপক্ষের বিশাল সুবিধা করে দিয়েছি। যদি ড্রাগ না নিতাম, কোন স্তরের খেলোযাড় হতে পারতাম আপনাদের স্রেফ কোনও ধারণা নেই!’ অর্থাৎ, নিজেও বিশ্বাস করেছেন, এতটা না করলেও চলত। আরেকটু রাশ টানতে পারলে আরও আরও আরও বড় মাপের কোনও দিয়েগো আর্মান্দো মারাদোনাকে পেত ইতিহাসের পাতা। সামাজিক ট্যাবুকে প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জ ছুড়ে সেই তো সমাজ–নির্ধারিত ষাটে পৌঁছেই চির অবসর নিলেন পৃথিবী থেকে। কেন করলেন এরকম? জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করে।

লেখা: সোহিনী সেন
পাঠ: শ্যামশ্রী সাহা
আবহ: শঙ্খ বিশ্বাস

পোল