ভারতীয় ক্রিকেট এই মুহূর্তে দক্ষতার নিরিখে বিশ্বে দাপিয়ে বেড়ানোরই যোগ্য। তবু ক্রিকেট অনিশ্চিতের খেলা বলেই হার-জয় থাকে। সেই সাফল্য-ব্যর্থতা যদি ক্রমাগত রাজনীতির ব্যবহারযোগ্য হয়ে ওঠে, তাহলে অদূর ভবিষ্যতে রোহিতদের দক্ষতাই ক্রমশ খাটো হয়ে যাবে।
শামা মোহম্মদ, সম্বিত পাত্র ক্রিকেট খেলেন না। রোহিত শর্মা রাজনীতি করেন না। তাতে কী! গত কয়েকদিনে রাজনীতিবিদদের মুখে মুখে যেভাবে উঠে এসেছে রোহিত শর্মার নাম, তাতে বলাই যায়, যে, বর্তমান রাজনীতিতে মুখরোচক টপিক রোহিত। সেখানে ক্রিকেট থাকুক আর না-ই থাকুক!
ক্রিকেটের রাজনীতিকরণ সাম্প্রতিক অতীতে বারবার আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে উঠেছে। ভারতবর্ষের ক্রিকেট তো নেহাত খেলামাত্র নয়। তা যেভাবে জনমানসকে প্রভাবিত করে, তাতে রাজনীতির ‘টুল’ হিসাবে ক্রিকেটের ব্যবহার না হলেই বরং অবাক হতে হত। অতীতেও তা হয়েছে। ক্রিকেটের নিজস্ব রাজনীতিও আছে। ক্রিকেট-প্রশাসনে রাজনীতিবিদদের আসা-যাওয়া এদেশে নতুন কিছু নয়। তাহলে এখন এত প্রশ্ন উঠছে কেন? সম্ভবত এখনকার আলোচনার যা অভিমুখ তা কোনওভাবেই ক্রিকেট-অভিমুখী নয়। রোহিত শর্মার কথাই ধরা যাক। তাঁর অধিনায়কত্বে আসা নিয়ে অনেক তর্ক হয়েছে। ছিল অনেক রকম সংশয়। তবে, তাঁর অধিনায়কত্ব নিয়ে কোনও সংশয় নেই। আইসিসি টুর্নামেন্টে সাফল্যের নিরিখে মহেন্দ্র সিং ধোনির পরেই তাঁর জায়গা। ভরাডুবি অনেক ক্ষেত্রে হয়েছে বটে। তবে, ঠাসা শিডিউল এবং আলাদা ফর্ম্যাটেও যেভাবে রোহিত শর্মা তাঁর দলকে বিশ্বমঞ্চে সাফল্যে অথবা সাফল্যের দোরগোড়ায় তুলে এনেছেন, তা এক কথায় তুলনারহিত। সেই রোহিত শর্মা রাজনীতিবিদদের মুখে মুখে ফিরছেন একেবারেই অপ্রাসঙ্গিক কারণে। প্রশ্ন উঠেছিল তাঁর ফিটনেস নিয়ে। তা চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির ফাইনালে তাঁর ইনিংসই সব অভিযোগের জবাব হতে পারত। তবে, রাজনীতি সেটুকুতেই সন্তুষ্ট থাকল না। সম্প্রতি রাহুল গান্ধীর বিরুদ্ধে আক্রমণ শানাতে গিয়ে ফিরল সেই প্রসঙ্গ। আর তা নিয়ে থমকে গেল সংসদ।
করিৎকর্মা বলেই রোহিত শর্মা রাজনীতির এত পছন্দের। যতবার সমালোচিত রোহিত, ততবার সাফল্যেই দিয়েছেন জবাব। ক্রিকেটের এই ধর্মটিকেই রাজনীতি কাজে লাগাচ্ছে নিজস্ব প্রয়োজনে। তবে তা যে আদৌ ক্রিকেটের জন্য স্বাস্থ্যকর নয়, তা বারবার প্রমাণিত হচ্ছে। গত বিশ্বকাপ নিয়েও পরবর্তী সময়ে নানা অভিযোগ উঠেছে। অস্ট্রেলিয়ার কাছে হেরে গিয়েছিল রোহিতের দল। ক্রিকেটে যা স্বাভাবিক। পরে কংগ্রেসের তরফে অভিযোগ তুলে বলা হয়, যদি রোহিত জিততেন, তাহলে রাজস্থানের ভোটে বিশ্বকাপ হাতে প্রধানমন্ত্রীর ছবি ব্যবহারের পরিকল্পনা ছিল বিজেপির। ওই রাজস্থানের ভোটপ্রচার পর্বেই স্বয়ং রাহুল গান্ধী, প্রধানমন্ত্রীকে ভারতের হারের জন্য কাঠগড়ায় তোলেন, এবং এক হাত নেন। ক্রিকেটকে খানিক দূরে সরিয়ে রেখেই ক্রিকেট নিয়ে চলতে থাকে রাজনীতির নিজস্ব চাপানউতোর। চলতি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতেও একটি বিতর্ক বারবার উঠেছে। কেন ভারত শুধু দুবাইতেই খেলল? প্রাক্তনরা একযোগে টিম ইন্ডিয়ার পাশেই দাঁড়িয়েছেন। পাকিস্তানে যাওয়া বা না-যাওয়া কূটনোইতিক সিদ্ধান্ত। ক্রিকেট প্রশাসন সে ব্যাপারটি নিয়ে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সেখানে ক্রিকেটারদের করার কিছু নেই। খাঁটি কথা। তবে, তারপরেও ক্রিকেটের বিচারে এ-কথা অস্বীকার করা যায় না যে, এক ভেন্যুতে খেলার যে সুবিধা ভারত পেয়েছে, তা অন্য একটি দলও পায়নি। ক্রিকেট সমালোচকরাও এ নিয়ে আলোচনা করছেন। ক্রিকেটের যুক্তি-বুদ্ধি পারদর্শিতা অনুযায়ীই রোহিত-ব্রিগেড চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। তা সত্ত্বেও যেন তাঁদের সঙ্গে সঙ্গে থেকে যাচ্ছে ক্রিকেট-রাজনীতির যোগসাজশের ছায়া।
ভারতীয় ক্রিকেট এই মুহূর্তে দক্ষতার নিরিখে বিশ্বে দাপিয়ে বেড়ানোরই যোগ্য। তবু ক্রিকেট অনিশ্চিতের খেলা বলেই হার-জয় থাকে। সেই সাফল্য-ব্যর্থতা যদি ক্রমাগত রাজনীতির ব্যবহারযোগ্য হয়ে ওঠে, তাহলে অদূর ভবিষ্যতে রোহিতদের দক্ষতাই ক্রমশ খাটো হয়ে যাবে। পড়বে নানাবিধ প্রশ্নের মুখে। এমনকী এই প্রবণতার দরুন সোশ্যাল মিডিয়ার তর্ক আলোচনা যেভাবে চলছে, তাতে ক্রিকেট থেকে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রাধান্যই বেশি। ক্রিকেটকে ধর্মের নিরিখে, রাজনৈতিক সমীকরণের নিরিখে মাপা ক্রমশ স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। সে-বিপদ ভয়াবহ। ক্রিকেট-প্রশাসন যত শক্তিশালীই হোক না কেন, ভারতীয় ক্রিকেটের জন্য তা আদৌ সুখবর বয়ে আনবে না। রাজনীতিবিদদের জন্য রোহিত বা ভারতীয় ক্রিকেট টপিক হিসাবে যত মুখরোচকই হোক না কেন, তর্কে সতর্ক না হলে ভারতীয় ক্রিকেট হারাবে মাধুর্য। তলানিতে যা পড়ে থাকে সেখানে কেবলই আকথা-কুকথা। ক্রিকেট কোথায়!