জীবনের প্রথম ইনিংসে হাজারও ব্যর্থতার মোকাবিলা করে শেষমেশ সাফল্যের মুখ দেখেছেন, আশেপাশে তাকালে এমন কত উদাহরণ পেয়ে যাব আমরা। কেউ হয়তো সামান্য পুঁজি নিয়ে জীবনযুদ্ধে লড়তে নেমে সফল হয়েছেন। কেউ হয়তো একের পর এক পরীক্ষায় ফেল করে শেষ অবধি এমন কিছু আবিষ্কার করেছেন, যা দেখে অবাক হয়েছে গোটা বিশ্বসংসার। শুধু হার মেনে নিলে চলবে না। লড়াইয়ের ময়দান ছেড়ে সরে দাঁড়ালে চলবে না।
রবি ঠাকুর তো সেই কবেই বলে গিয়েছেন, ‘ভালো মন্দ যাহাই আসুক, সত্যেরে লও সহজে’। আবার দার্শনিক এপিক্টেটাস বলেছিলেন, ‘তোমার সঙ্গে কী ঘটছে, তা বড় কথা নয়। বড় কথা হল, সে ঘটনাকে তুমি নিজে কতখানি আমল দিচ্ছ।’ কতসব প্রেরণার বাণী ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে আমাদের আশেপাশে। তবুও আসল জায়গায় গিয়ে, ভালোটিকে যতখানি ভালোবেসে গ্রহণ করি, মন্দটির ক্ষেত্রে তার অর্ধেকও পারি না আমরা। মনোবল যতই জোরাল হোক না কেন, পরাজয় এক লহমায় ছুঁয়ে তাকে চুরমার করে দিতে পারে। জীবনের সিঁড়িভাঙা অঙ্ক এমনটাই। তবে, জীবনই শেখায় সেই সিঁড়িতে যেমন একশো-র আলো ঝলমলে দিন থাকে, তেমন শূন্যের শূন্যতাও থাকতে পারে। জীবনের ধর্মই এমনটা। আর সেই কথাটাই যেন আর একবার মনে করিয়ে দিল বৈভব সূর্যবংশীর (Vaibhav Suryavanshi) পরপর দুটো ইনিংস।
বছর চোদ্দর বৈভব সূর্যবংশী। বর্তমানে আইপিএল-এ ‘রাজস্থান রয়্যালস্’-এর ওপেনার হিসেবে খেলছিলেন। গত ৩০ এপ্রিল যখন জয়পুরের স্টেডিয়ামে ‘মুম্বাই ইন্ডিয়ান্স্’-এর বিপক্ষে খেলছিল ‘রাজস্থান রয়্যালস্’, বলা বাহুল্য, তখন দর্শকের নজর ছিল তাঁর উপরই। কারণটাও স্পষ্ট, মাত্র কয়েকদিন আগেই ‘গুজরাট টাইটান্স’-এর বিপক্ষে মাত্র ৩৫ বল-এ সেঞ্চুরি করেছিলেন তিনি। কিন্তু এ’দিন ভাগ্য বুঝি একেবারেই সহায় হল না বৈভবের (Vaibhav Suryavanshi)। হাত খুলতে না খুলতেই ক্যাচ, আউট হয়ে গেলেন তিনি। দেখা গেল, হতাশার আচমকা আঘাত সামলাতে না পেরে স্তম্ভিত হয়ে বেশ কিছুক্ষণ ক্রিজেই দাঁড়িয়ে রইলেন এই তরুণ ব্যাটার। বিগত কয়েকদিনের সাফল্যের পর ‘সিলভার’ ডাক যে তাঁকে একেবারে ভিতর থেকে নাড়িয়ে দিয়েছে, তা দর্শকও দিব্যি বুঝতে পারলেন।
ক্রিকেট যে এমনই অনিশ্চয়তায় ভরা, এমনই নিষ্ঠুর, তা ক্রিকেটপ্রেমীরা একবাক্যে মানেন। আজ যে প্রশংসার শীর্ষে, কাল একচুল ভুলেই তাঁকেই টেনে নামানো হবে সমালোচনার মাটিতে। আর বড়-ছোট কোনও খেলোয়াড়ের ক্ষেত্রেই এর ব্যতিক্রম হয় না। তবে শুধুই কি ক্রিকেট? ছাপোষা জীবনেও কি একই দৃষ্টান্ত চোখে পড়ে না! প্রসঙ্গত চলে আসে পরীক্ষায় সাফল্য-ব্যর্থতার প্রসঙ্গও। চলতি বছর মাধ্যমিকের ফল প্রকাশিত হল ২ মে। স্বাভাবিক ভাবেই, ফলাফল প্রকাশের কিছুক্ষণের মধ্যেই টিভিতে, সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে সাফল্যের তালিকায় একেবারে শীর্ষে থাকা পড়ুয়াদের পরিশ্রম, সাফল্য, কীর্তিগাথা। সংবাদের শিরোনামে সর্বত্র দেখতে পাওয়া যাবে তাঁদের। সারা বছরের অক্লান্ত পরিশ্রম ও মেধার জোরে যাঁরা এই জায়গা দখল করেছেন, তাঁরা নিঃসন্দেহে এই তারিফের যোগ্য। কিন্তু এতকিছুর ভিড়ে পিছিয়ে পড়ল যে ছেলেমেয়েগুলো, তাদের কথাও শোনা জরুরি। যদিও সে পরিসর কমই।
খেয়াল করলে দেখা যাবে, হয়তো পরিশ্রম তারাও কিছু কম করেনি। কেবল প্রশ্ন কিছু অচেনা এসে গিয়েছিল। কিংবা উত্তর লিখে এসেও মনমতো ফল হয়নি। কিংবা যে ফল সে নিজে আশা করেছিল, বাড়ির লোক আশা করেছিল তার চাইতে অনেক, অনেক বেশি। সফল বন্ধুর যাবতীয় সাফল্যের রোশনাইয়ের পাশে তাই হয়তো একা ঘরে আরও একরাশ অন্ধকার চেপে ধরেছে তাকে; কিংবা তাদের। এমন অবস্থায় কোনও সান্ত্বনাই যে যথেষ্ট নয়, তা তো সকলেই জানি। কিন্তু চেষ্টা করলে তবুও হয়তো সাহস জোগানো যায় অন্যকে। বাড়ির পরীক্ষার্থী ছেলেটি বা মেয়েটির পাশে বসে বলা যায় যে, ভেঙে পড়ার কিচ্ছু নেই! আরও অনেকবার সুযোগ আসবে জীবনে। এইবারের ভুলগুলো চাইলেই অন্য কোনও ক্ষেত্রে শুধরে নেওয়া যাবে, শুধু শুধরে নেওয়ার ইচ্ছে থাকা চাই।
জীবনের প্রথম ইনিংসে হাজারও ব্যর্থতার মোকাবিলা করে শেষমেশ সাফল্যের মুখ দেখেছেন, আশেপাশে তাকালে এমন কত উদাহরণ পেয়ে যাব আমরা। কেউ হয়তো সামান্য পুঁজি নিয়ে জীবনযুদ্ধে লড়তে নেমে সফল হয়েছেন। কেউ হয়তো একের পর এক পরীক্ষায় ফেল করে শেষ অবধি এমন কিছু আবিষ্কার করেছেন, যা দেখে অবাক হয়েছে গোটা বিশ্বসংসার। শুধু হার মেনে নিলে চলবে না। লড়াইয়ের ময়দান ছেড়ে সরে দাঁড়ালে চলবে না। ‘জিরো’ আসুক, ক্ষতি নেই। শুধু তারপরের ‘সেঞ্চুরি’-টাকে বাস্তব করবার মতো ধৈর্য যেন থাকে। বাবা-মা-আত্মীয়-পরিজন – কাউকে খুশি করবার জন্য নয়। এ সেঞ্চুরি জয়ের ইচ্ছে তোলা থাক কেবল নিজের একার জন্য।
আর তাই সাফল্য-ব্যর্থতার সহাবস্থানের এই গল্পে উঠে আসে বৈভবের (Vaibhav Suryavanshi) কথা। হঠাৎ সাফল্য যেমন চর্চার তুঙ্গে এনে দিয়েছিল তাঁকে, চূড়ান্ত ব্যর্থতার পর যাতে তেমন আচমকাই ঠেলে সরিয়ে দিতে না পারে, তা এখন কেবলমাত্র বৈভবের হাতেই। কেবল তিনিই পারেন অধ্যাবসায় বাড়িয়ে ভবিষ্যতে নিজেকে আরও অনেকখানি ঋজু করে তুলতে। একই কথা পরীক্ষার জন্যও প্রযোজ্য। একটি পরীক্ষায় সাফল্য-ব্যর্থতা দিয়ে জীবনের পরিমাপ হয় না। কেননা জীবন আসলে লম্বা ইনিংস। সেখানে যে টিকে থাকে, শেষ সাফল্যের হাসি হাসে সেই-ই। সেঞ্চুরি কিংবা জিরো, দুটোই সংখ্যা মাত্র।
জীবন যে সংখ্যা নয়, জীবনের গল্পই তা আমাদের শিখিয়ে দিয়ে যায় চিরকাল।