যোগবলে মৃত মানুষকেও বাঁচিয়ে তুলতেন লাহিড়ীমশাই

Published by: Sankha Biswas |    Posted: February 13, 2021 1:12 pm|    Updated: February 13, 2021 5:22 pm

Published by: Sankha Biswas Posted: February 13, 2021 1:12 pm Updated: February 13, 2021 5:22 pm

যোগী-সান্নিধ্যের প্রভাব! দানাপুরে ফেরার পর বিলকুল বদলে গেলেন শ্যামাচরণ লাহিড়ী।   কাজকর্ম সবই করেন, কিন্তু মন যেন অনন্তের কোনও ভাবরাজ্যে সাঁতরে বেড়াচ্ছে। ভাবালু কর্মচারীকে উপরওয়ালা স্নেহ ভরে ‘পাগলাবাবু’ বলে ডাকতেন। কাজের বাইরে যতটুকু সময়, সবটুকুই খরচ যোগসাধনায়। গুরু মহারাজের দেখানো পথে যোগসাধনার একের পর এক কঠিন সোপান পেরিয়ে যেতে থাকেন লাহিড়ীমশাই। করায়ত্ত হতে থাকে অষ্টসিদ্ধি।

গুরুর নির্দেশে নিজেকে যথাসাধ্য প্রচ্ছন্নই রাখতেন যোগীরাজ। কিন্তু একদিন এক কাণ্ড ঘটল। উপরওয়ালা সাহেবের বেজায় মনখারাপ। খবর এসেছে, ব্রিটেনে মৃতু্যশয্যায় তাঁর স্ত্রী। আরোগ্যলাভের সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। সাহেবের মুখে বৃত্তান্ত শুনে লাহিড়ী মশাই একান্তে ধ্যানে বসলেন। তারপর সাহেবকে আশ্বস্ত করে জানালেন, কোনও চিন্তা নেই, স্ত্রী সুস্থ হয়ে গিয়েছেন। সাহেবকে তিনি নিজে হাতে চিঠি লিখবেন। চিঠির বয়ান কী হবে, সাহেবকে তা-ও বলে রেখেছিলেন যোগীরাজ।

সেই মুহূর্তে বিশ্বাস না করলেও শ্যামাচরণের সান্ত্বনাবাক্যে কেন জানি না সাহেব শান্তি পেয়েছিলেন। কয়েক দিন বাদে সাগরপাড় থেকে স্ত্রীর চিঠি। অবাক হয়ে দেখলেন, ‘পাগলাবাবু’র বয়ানের সঙ্গে চিঠির হুবহু মিল!  অধঃস্তন কর্মীর সামনে শ্রদ্ধায় মাথা নিচু হয়ে যায় দোর্দণ্ডপ্রতাপ শ্বেতাঙ্গ অফিসারের। চমকের আরও বাকি ছিল। ক’দিন পর সাহেবের স্ত্রী দানাপুরে আসেন। শ্যামাচরণকে দেখে চমকে ওঠেন। সাহেবকে ডেকে জানান, রোগে মরোমরো অবস্থায় এঁকেই তো তিনি নিজের শিয়রে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছিলেন! তারপরই সুস্থ হয়ে ওঠেন।

ইচ্ছা না থাকলেও এ ভাবেই মাঝে-মধ্যে লাহিড়ী মশাইয়ের সিদ্ধাই প্রকাশিত হয়ে পড়ত। যোগসিদ্ধ শিষ্যের প্রতি গুরুর ছিল সজাগ দৃষ্টি। একবার শ্যামাচরণের বাড়ির সামনে একটি গাছের বেদিমূলে এক সাধু গঞ্জিকা সেবন করছিলেন। বেশভূষা অত্যন্ত নোংরা। অন্তরে অবজ্ঞার ভাব জেগে উঠল যোগীরাজের। গঞ্জিকাধারীর সামনে যেতেই চমক। এ কী! সাধুর লোটা পরিষ্কার করছেন তাঁর গুরু মহারাজ!  সেদিনই শিষ্যের মন থেকে ভেদবুদ্ধির ভাব দূর করলেন গুরু। সর্বজীবেই ব্রহ্মদর্শনের নিগূঢ় অথচ সহজ তত্ত্ব শ্যামাচরণের হৃদয়ভূমিতে রোপন করলেন। ওই ঘটনার পর আমূল বদলে গেল শ্যামাচরণের জীবনদর্শন। গরিব-নীচ, স্ত্রী-পুরুষ, উচ্চ-নীচ, সব একাকার।

ত্রৈলঙ্গস্বামীর সমসাময়িক ছিলেন লাহিড়ী মশাই। এদের দু’জনের দেখাও হয়েছিল। জানা যায়, ত্রৈলঙ্গস্বামী আলিঙ্গনে বাঁধা পড়েছিলেন যোগীরাজ। তাঁর সম্পর্কে বারাণসীর ‘চলন্ত শিব’- এর উপলব্ধি, যে যোগশক্তি অর্জনের জন্য সন্ন্যাসীকে কৌপিন পর্যন্ত ছাড়তে হয়, এই মহাপুরুষ গৃহী জীবন যাপন করেই তা অর্জন করেছেন।  এরপর যোগীরাজের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে কাশীজুড়ে। নদিয়ার ঘূর্ণিতে জন্ম শ্যামাচরণের। স্ত্রী মুক্তকেশী দেবীর মৃতু্যর পর ছেলে শ্যামাচরণকে নিয়ে কাশীতে চলে আসেন গৌরমোহন (সরকার) লাহিড়ী।

হিন্দি, উর্দু, ইংরেজি শিক্ষার পাশাপাশি বৈদিক সাহিত্য নিয়েও ছেলের পড়াশোনার ব্যবস্থা করেছিলেন। আঠারো পেরনোর পর শ্যামাচরণের বিয়ে হয় আট বছরের কাশীমণিদেবীর সঙ্গে। বিয়ের পর রেল কোম্পানিতে চাকুরি গ্রহণ। শুরু হয় কর্মজীবন। কর্মসূত্রেই দানাপুর থেকে রানীক্ষেত হয়ে আবার দানাপুরে ফিরেছিলেন শ্যামাচরণ। সে ঘটনা আগেই বলা হয়েছে।

দ্রোণগিরির দুর্গম পর্বতগুহায় গুরু তেত্রিশ বছরের শ্যামাচরণের মনোভূমিতে যোগসাধনার যে বীজ  রোপন করেছিল পরে তা মহীরুহ হয়ে ওঠে।

লেখা: গৌতম ব্রহ্ম
পাঠ: গৌতম ব্রহ্ম
আবহ: শঙ্খ বিশ্বাস

পোল