বারবার সংবিধান হাতে তুলে নিয়ে নাগরিককে যদি নিজের স্বাধীনতার জায়গা তুলে ধরতে হয়, তাহলে এটা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, সেই স্বাধীনতার জায়গা কোনওভাবে ক্ষুণ্ণ হয়েই চলেছে। তাই সেক্ষেত্রে রাজনৈতিক নেতা হোন বা কমেডিয়ান, প্রত্যেকেই নিজের শর্তে আঁকড়ে ধরছেন সংবিধান। এ যেন গণতন্ত্রের দুর্বলতারই লক্ষণ।
গত লোকসভার স্মৃতি রাজনৈতিক মহলে এখনও টাটকা-ই। ভোটের ফল ঘোষণা হয়েছে। সাংবাদিকদের সামনে হাজির হয়েছিলেন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী। হাতে ভারতীয় সংবিধানের পকেট সংস্করণ। ছোট্ট লাল মলাটের বইটিই ভারতীয় গণতন্ত্রের রক্ষাকবচ। আর তাই সাংসদ হিসাবে শপথ গ্রহণের সময়ও সেই সংবিধানকেই তুলে ধরেছিলেন রাহুল। একই পথে হাঁটেন প্রিয়াঙ্কা গান্ধীও। তিনিও যখন শপথ নিলেন হাতে ছিল সংবিধান।
এরপর কেবলই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি। সম্প্রতি সংবিধান হাতেই নিজের অবস্থান বুঝিয়েছেন কংগ্রেস নেতা ইমরান প্রতাপগড়ি। একটি সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট ঘিরে তাঁর বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের হয়েছিল। যদিও শীর্ষ আদালতে তা খারিজ হয়ে গিয়েছে। আর তারপরই সংবিধান উঠে এল তাঁর হাতে। দিনকয়েক আগে একই কাজ করেছিলেন কুণাল কামরাও। কমেডি শো ঘিরে তাঁকে যখন পড়তে হচ্ছে আক্রমণের মুখে, তখন বাকস্বাধীনতার পক্ষে নিজের অবস্থান বোঝাতে সংবিধান হাতে নিয়েই ছবি পোস্ট করেছিলেন কুণাল।
:আরও শুনুন:
কৌতুকের ভাষা না বুলডোজারের ভাষা! এ দেশে কোনটি বেশি বিপজ্জনক?
গণতন্ত্রে এরকম দৃশ্যের ফিরে ফিরে আসা যেমন মন্দ, তেমন আশাপ্রদও বটে। বারবার সংবিধান হাতে তুলে নিয়ে নাগরিককে যদি নিজের স্বাধীনতার জায়গা তুলে ধরতে হয়, তাহলে এটা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, সেই স্বাধীনতার জায়গা কোনওভাবে ক্ষুণ্ণ হয়েই চলেছে। অর্থাৎ সংবিধানপ্রদত্ত স্বাধীনতা অনুশীলন করতে গিয়েই বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে এ-দেশে। রাজনৈতিক নেতা হোন বা কমেডিয়ান, প্রত্যেকে তাই নিজের শর্তে আঁকড়ে ধরছেন সংবিধান। এ যেন গণতন্ত্রের দুর্বলতারই লক্ষণ। অথচ পঁচাত্তর বছরের স্বাধীন দেশে তা দিনে দিনে মজবুত হওয়ার কথাই ছিল। বিরুদ্ধমতে প্রকাশের পরিসর এতটা রুদ্ধ হওয়ার কথা ছিল না যে, রাজনৈতিক নেতাকে বারবার সংবিধান হাতে নিয়ে দেশের কথা মনে করিয়ে দিতে হয়। এমনকী কৌতুক-সমালোচনা সহ্য না করতে পারা, এবং এর দরুন যে অসহিষ্ণুতার ছবি দেখা গেল, তাতে বলাই যায় যে, গণতন্ত্রের জোরের জায়গা ক্রমশ আলগা হয়েছে বা হচ্ছে। ইমরান প্রতাপগড়ির মামলায় ঠিক সেই জায়গাটিই ধরিয়ে দিয়েছে শীর্ষ আদালত। জানিয়েছে, দেশের গণতন্ত্রের বয়স পঁচাত্তর হতে চলল। এখন একটা কবিতা বলা, বা যে কোনও আর্ট ফর্ম- ধরা যাক, স্ট্যান্ড-কমেডির জন্য ঘৃণা-বিদ্বেষ ছড়িয়ে যাবে, আমরা এতটাও নড়বড়ে হতে পারি না। যে কোনও বিষয়ে আপত্তি জানানো আদতে এমন একটা জায়গায় দেশকে নিয়ে যাচ্ছে, যেখানে মুক্ত সমাজের ধারণা কষ্টকল্পনা হয়ে উঠছে। ভাবনা-চিন্তা বা মত প্রকাশের স্বাধীনতার পথ ক্রমশ আটকে যাচ্ছে। শীর্ষ আদালতের বক্তব্যের সার কথা এমনটাই।
:আরও শুনুন:
কুণাল কামরা, এমন রসিকতা করা আপনার উচিত হয়নি
সাম্প্রতিক ঘটনাবলির প্রেক্ষিতে এই পর্যবেক্ষণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ‘ছাবা’ সিনেমার মুক্তি পাওয়ার পর থেকে একের পর এক রাজনৈতিক কর্মসূচি ও প্রশ্রয়ে জেগে উঠল ঔরঙ্গজেবের কবর নিয়ে বিতর্ক। আর তার জেরে সাম্প্রদায়িক অশান্তি ছড়িয়ে গেল নাগপুরে। বিশেষ এক সাম্প্রদায়িক আবেগ এই পুরো কর্মকাণ্ডের মূলধন। এবং তা জাগিয়ে ও জিইয়ে রাখা হয়েছে সুকৌশলে। প্রায় একই সময়ে কমেডিয়ান কুণাল কামরার বিরুদ্ধে নেমে এল আক্রমণ। নাম না করে তিনি যে রাজনৈতিক নেতার সমালোচনা করেছিলেন, তার জেরে অনুষ্ঠানের জায়গায় ভাঙচুর অব্দি চালানো হল। দুটি প্রসঙ্গ ধরেই গণতন্ত্রের দুর্বলতা নিয়ে যে সুপ্রিম-উদ্বেগ তা বুঝে নেওয়া যেতে পারে। ঔরঙ্গজেবকে নিয়ে যে সকলের একই মত থাকবে তার কোনও মানে নেই। কেউ তাঁকে অত্যাচারী শাসক ভাবতেই পারেন, তাতে কোনও বাধা নেই। কিন্তু সেই ভাবনা কি সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ছড়ানোর কাজে লাগতে পারে? প্রশ্ন এখানেই। কুণাল কামরার কমেডির সঙ্গেও যে সকলে সহমত হবেন, তা নয়। তা হতেও পারে না। তাহলে কৌতুক তার প্রার্থিত জায়গায় পৌঁছবে না। তবে সেই অসহমতের প্রকাশ ভাঙচুর কিংবা কুণাল কামরার উপর ব্যক্তি আক্রমণ নামিয়ে আনা নয়। অথচ হচ্ছে ঠিক এগুলোই। গণতন্ত্রে যা যা নীতিসঙ্গত, তা অতিক্রম করে যেন এক ধরনের আধিপত্যের ভাষার প্রতিষ্ঠা চলছে সন্তর্পণে। ঠিক এখানেই আলো ফেলেছে সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ। শীর্ষ আদালত জানিয়েছে, একটি মতের বিরুদ্ধতা সম্ভব পালটা মত প্রকাশ করে। গণতন্ত্রে সেটাই দস্তুর। এই গণতান্ত্রিক অভ্যাস নষ্ট হচ্ছে বলেই প্রতাপগড়ির মামলায় বাক স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের গোড়ার কথাগুলো মনে করিয়ে দিতে হয়েছে শীর্ষ আদালতকে। এবং শেষমেশ বিচারকরা বলেছেন, দেশের সংবিধানকে তুলে ধরাই তাঁদের কর্তব্য, দায়-ও।
:আরও শুনুন:
শিল্পী বড় সামাজিক নয়! ঠান্ডা পানীয়ে সাফাই শাহরুখের, গিগ ওয়ার্কারদের নিয়ে সরব কুণাল কামরা
অতএব, ফিরল সেই সংবিধান-ই। ফিরতে হচ্ছে সেই সংবিধানেই। বারবার যে ফিরতে হচ্ছে, তার কারণ বারবার গণতন্ত্র আহত হচ্ছে। তবে ভালো কথা এই যে, দেশের সংবিধানের প্রতি মানুষের বিশ্বাস আজও অটুট। যে কোনও অগণতান্ত্রিকতার বিরুদ্ধে যে সংবিধান হাতে নিয়েই লড়াই করা যায়, এই ভরসা আছে দেশবাসীর। ভারতের গণতন্ত্রের ক্ষেত্রে সেটিই সবথেকে বড় আশার কথা।