কুণাল কামরার ক্ষমা চাওয়ার কিছু নেই। তিনি নতুন কিছু বলেননি। নিজে বানিয়েও কিছু বলেননি। যা হচ্ছে, তা-ই বলেছেন মাত্র। যা হচ্ছে, তার জন্য যদি এই দেশের নীতি-রাজনীতি লজ্জিত না হয়, তাহলে তা বলার জন্য কামরার মস্ত গুণাহ্ হয়েছে, এমনটা ভাবা নিতান্তই অযৌক্তিক।
কাঞ্চীর রাজা তো এদিকে যুদ্ধে কর্ণাট জিতে নিয়েছেন। ছেলের দলের পুতুলযুদ্ধে অথচ তিনি হেরে গিয়েছেন বিলকুল। হাতি, চন্দন, সোনামানিকের ঐশ্বর্য অতএব তুচ্ছ। হোক না পুতুলের খেলা, নাগরিকের এত ঔদ্ধত্য! অতএব বাঁধো আর মারো। এমন মারো যে শেয়াল-কুকুর ছাড়া আর কারও মুখে যেন টুঁ শব্দটি না শোনা যায়।
তা সে ব্যবস্থা পাকা হয়েছে বটে। শব্দ করলে জব্দ করার ফিকির নেওয়া হয়েছে আটঘাট বেঁধেই। ভারত জানে, নানা মুনির নানা মত। তা এত মুনি না রাখলেই হয়! অনেক মতের ল্যাটাও যাবে চুকে। অতএব নতুন ভারতে ভোটে জেতা মহামানবের আবির্ভাব এবং অভ্যর্থনা। একজনই সর্বোত্তম, একটাই মত। এরপরও যাঁরা পুরনো ভারতের বহুমত আঁকড়ে ধরে বসে থাকবেন, আর তা নিয়ে কেবলই কথা বলতেই থাকবেন, তাঁদের জব্দ না করে উপায় কী! রাষ্ট্রের কোনও দোষ নেই। এ ছাড়া ধর্মের তত্ত্ব, সকলেই জানেন, গুহায় নিহিত। তা সে গুহায় ধ্যান-ট্যান করে এসে কেউ একজন বলে দিলেই পারেন যে, বাপু এই হল ধর্ম। বলে দিয়েওছেন। যে সব অভাজন তার পরেও বহুধর্ম, ধর্মনিরপেক্ষ ইত্যাদি বলে শরণাগতি উপেক্ষা করেন, তাঁদের শায়েস্তা না করে উপায় কী! রাষ্ট্রের আর দোষ কোথায়! পৃথিবীর চার বেদে-র কী দরকার! এত বহু হলেই বহুত ঝামেলা। অতএব এক সূর্য, এক চন্দ্র, এক পৃথিবী, এক মহামানব, এক দল, এক ভোট ইত্যাদি ইত্যাদি দিয়ে সাজানো এই নয়া ভারত। মধ্যে মধ্যে সনাতন স্মৃতি ঝুলছে পুজোবাড়িতে দড়িতে গাঁথা আমপাতার মতো। এই পুজোবাড়িই তো দেশ।
:আরও শুনুন:
‘বাবা-মায়ের যৌনতা!’ রণবীরের আগেও একই কথা বলেছিলেন ভারতীয় কমেডিয়ান, কী হয়েছিল তখন?
এত আয়োজনেও তবু কিছু বেয়াড়া স্বর থেকেই যায়। তাদের জন্য থাকে তাই নিশ্চুপ করার দাওয়াই। পুজোবাড়ির পবিত্রতা যাঁরা নষ্ট করছেন, তাঁরা দেশদ্রোহী। অগত্যা জেলে পোরা ছাড়া গতি নেই। দরকারে মরার সময় মুখে যাতে জল না পায় সে ব্যবস্থাও করা হয়েছে সুচারু। এ ছাড়া যাঁরা তথ্য নিয়ে কথা বলেন, ইতিহাস নিয়ে মিথ্যে ইতিহাসের বিরোধিতা করেন, তাঁদের বিদ্যেবুদ্ধিই গিলোটিনে চড়িয়ে দেওয়া যাক। যাতে যে কেউ তাঁদের নিয়ে খিল্লি করতে পারেন। বুঝিয়ে দিতে পারেন, জ্ঞানের আবার কী দরকার! হোয়াটসঅ্যাপে যা আসে, তা-ই প্রজ্ঞা। জ্ঞানের বিহনে প্রেম নেই। দরকারও নেই। হাতে আছে লাভ জিহাদ আর বুলডোজার। থেকে থেকে দলিত, সংখ্যালঘু পিটিয়ে বুঝিয়ে দেওয়া, কেন গোঁসাই মারেন কিল আর দেশ কতটা সহনশীল! তারপরেও দু’চারটে শব্দের সম্ভাবনা দেখলে আগেই ‘আরবান নকশাল’ ইত্যাদি বলে দাগিয়ে দেওয়া। এ-প্রকল্প চলছে চমৎকার। যাতে কাঞ্চীর রাজার নাম কেউ না ভোলে। এমনকী, পুতুলখেলাতেও যেন কর্ণাটের জয় না হয়।
নাগরিক সমাজের বিরোধী স্বর অতএব হয় রুদ্ধ নয় সন্ত্রস্ত। আর কাঞ্চীর রাজনৈতিক বিরোধিতা বলতে যেটুকু যা আছে, তা প্রায় হোমগ্রাউন্ড। এক মাঘে শীত ফুরোয় না, এক ভোটে দল। ফলত হারা-জেতা সাময়িক থাকে, বিরাট ফারাক কিছু হয় না। কাঞ্চীর রাজা তা ভালোই জানেন। তাই মনের কথা ফিরি করে চলেন দেশ থেকে দেশান্তরে। মন্ত্রী-সান্ত্রী সকলেই সেলাম ঠুকছেন। দিব্য চলছে সব। হঠাৎ হাজির বিদূষক। এ জিনিস তিনি কিছুতেই মেনে নিতে পারেন না। সভা ছেড়ে ব্যক্তিগত প্রতিরোধ নথিবদ্ধ করার দিন শেষ। এ আমার দেশ নয় বলে বিস্ময় প্রকাশও এখন এক ধরনের গা-বাঁচানো। অতএব রাজনৈতিক বিদূষণ গাঢ় হয়ে এলে বিদূষক এবার খোলাখুলি ছুড়লেন সমালোচনার তির। রসিকতার ধারে এই এ কাটে তো ওই ও কাটে। আর তা দেখে রেগে আগুন গোটা কাঞ্চী! বলছে, বিদূষক ক্ষমা চান। তাঁর অনুষ্ঠানের ভ্যেনু ভেঙে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, হয় বসে থাকো, নয় বশে থাকো, রসেবশে থাকা, তাও আবার রাজনৈতিক ভাবে, একেবারেই নামঞ্জুর।
:আরও শুনুন:
নেটদুনিয়া ভালগার-আগার, তবে কেন যত পচা ডিম রণবীর এলাহবাদিয়ার মুখে?
বস্তুত, কুণাল কামরার ক্ষমা চাওয়ার কিছু নেই। তিনি নতুন কিছু বলেননি। নিজে বানিয়েও কিছু বলেননি। যা হচ্ছে, তা-ই বলেছেন মাত্র। যা হচ্ছে, তার জন্য যদি এই দেশের নীতি-রাজনীতি লজ্জিত না হয়, তাহলে তা বলার জন্য কামরার মস্ত গুণাহ্ হয়েছে, এমনটা ভাবা নিতান্তই অযৌক্তিক। কুণাল বরং বারবার এই কথাগুলো বলতে বলতে বেআব্রু করে দিয়েছেন এই সময়টাকে। এমন নয় যে, তিনি একা এসব দেখছেন। দেখছেন সবাই। বলছেন না কেউ কিছুই। এই না-বলা এমন স্থিতাবস্থার অনুমোদন দেয় যে, তার সাপেক্ষে স্বতন্ত্র হয়ে পড়েন কামরা। তখন প্রশ্ন ওঠে, কেউ যখন কিছু বলছেন না, কামরা কেন বলছেন? তাঁর উপর আক্রমণ নেমে আসে। আগেও এসেছে। তাতেও দমানো যায়নি আধুনিক ভারতের বিদূষককে। নিতান্ত কোণঠাসা করে দেওয়ার পরও যখন তাঁর জবানে লাগাম লাগানো গেল না তখন চিন্তিত না হয়ে উপায় নেই। সেই চিন্তার জেরেই যাবতীয় হইচই, ভাঙচুর। অতীতের হাজার একটা নমুনা টেনে এনে বলা যায় যে, রাজনৈতিক কার্টুন চর্চা রাজনীতিকে রেয়াত করেনি। রাজনীতি তা স্বীকারই করেছে। এ স্বাধীনতা কার্টুনিস্টের আছে। তিনি দূত মাত্র। সত্যটুকু পৌঁছে দেন। সত্য নিজের পক্ষে না হলে বা তিক্ত হলে, দূতকে হত্যা করা চলে না। সেই সব কার্টুন প্রকাশিত হয়েছে প্রচল প্রাতিষ্ঠানিক সংবাদমাধ্যমে। আজও যে তা হয় না, তা নয়। তবে, প্রকল্প অনুযায়ী সংবাদমাধ্যমও অনেকাংশে হাত-পা বাঁধা। বড় প্রতিষ্ঠান মাথা কিনে নিয়েছে ছোট প্রতিষ্ঠানের। তাহলে কি কার্টুনের যে তির্যকস্বর স্তব্ধ হবে? দেখা যাচ্ছে, সময়োচিত মাধ্যম ব্যবহার করে, প্রতিষ্ঠানের রেয়াত না করেই কেউ তা ছড়িয়ে দিতে পারেন। বলা যায়, রাজনৈতিক কার্টুনের পরম্পরার আধুনিক সংস্করণ কুণাল কামরার স্ট্যান্ড-আপ-কমেডি। কমেডির নামে নিছক রসিকতা তিনি করেন না। বরং বিদূষকের যে কাজ– সত্য ধরিয়ে দেওয়া– সেটিই তিনি করে আসছেন নিয়ম করে। গোটা কাঞ্চীর রাজসভা একদিকে চলে গেলেও বিদূষক তাঁর নিজের অবস্থানে অনড়। এই অনড়তা চিন্তার; এই জোরও চিন্তার রাষ্টের কাছে। তাঁর উপর নেমে আসা আক্রমণ যেন বুঝিয়ে দিচ্ছে যে, এই দেশটার মজ্জায় ঘুণ ধরেছে। ঘরবাড়ি ভালা নেই গণতন্ত্রের।
:আরও শুনুন:
‘রোস্ট কালচার’ নাকি ‘ক্যানসেল কালচার’, কোনটি বেশি ক্ষতিকর? সময় রায়নার অনুষ্ঠান বাতিলে নতুন প্রশ্ন
অথচ কামরাকে এত ভয় কেনই বা পায় রাজনীতি! নেহাত ব্যক্তিমাত্র তিনি। যেভাবে রাজনৈতিক বিরোধীদের উড়িয়ে দেওয়া যায়, সেভাবেই তো তাঁকে দেখা যেত! দেখা গেল না, তার কারণ, কুণাল কামরার কোনও দল নেই। ফলে দলের স্বার্থ নেই। উলটে আছে রসিকতার বল। আর আছে জনতার বিপুল সমর্থন সম্বল। জনতা যতক্ষণ জঙ্গল, ততক্ষণ মাথাব্যথার কারণ নেই। কিন্তু সেই অরণ্যে এমন কেউ যদি থাকেন, যিনি ক্রমাগত ধরিয়ে দেন যে, জনতা জঙ্গল নয়, তাহলেই বিপদ! রাজনীতি তার নিজের স্বার্থে যে ভয়ের বাতাবরণ তৈরি করে, অনেকেই তা হরেদরে মেনে নিয়েছেন। চান বা না-চান তা মানতে বাধ্য হয়েছেন। কুণাল অবাধ্য। তিনি যদি একা অবাধ্য হতেন, তাহলেও গোল মিটে যেত। কিন্তু তিনি এই অবাধ্যতার অভ্যাস ছড়িয়ে দিতে চান। তাঁকে কোণঠাসা করলেও তিনি খুঁজে নেন দাঁড়াবার নতুন জায়গা। এই প্রবণতা রাষ্ট্রের কাছে বিপজ্জনক। মেনে-নেওয়া-সংস্কৃতির পালটা প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠছেন একজন ছত্রিশ বছর বয়সের মানুষ। তিনি তখন আর কেউ ব্যক্তি থাকছেন না। রাজনৈতিক বিরোধিতা মোকাবিলার টেমপ্লেট রাজনীতির জানা। কিন্তু কুণাল যেভাবে মানুষের মেনে-নেওয়ার উইঢিপিতে ভাঙন ধরাতে উদ্যোগী, তার মোকাবিলা সম্ভবত রাজনীতির অজানা। যে কারণে সে ভয় পায় নাগরিক দ্রোহকে। যতদিন আচ্ছন্নতা কাজ করে ভালো। জনতা জাগতে শুরু করলে রাজনীতির মুশকিল। আর যিনি সে সলতেয় আগুন ধরান, তিনিই হয়ে ওঠেন মাথাব্যথার কারণ। দলীয় রাজনীতির বাইরে বেরিয়েও এই যে এক ধরনের রাজনৈতিক চিন্তা-চেতনার পরিসর তা অকেজো করে দেওয়া হয়েছে ধারাবাহিক প্রক্রিয়ায়। কুণাল তা মানতে নারাজ। বরং তিনি সেই পালটা প্রক্রিয়াকে আবার জাগিয়ে তুলতে চান নিজস্ব শিল্প দিয়ে, নিজস্ব কায়দায়। অতএব তাঁকে যে ভয় পাওয়া, তাঁর উপর আক্রমণ নেমে আসা, তা স্বাভাবিক। কুণাল নিজেও তা জানতেন। এবং তাঁর পরিবেশনের মধ্যে সে সম্ভাবনাকে মজার মোড়কে তিনি তুলেও এনেছিলেন।
যদিও বাস্তবে দেখা গেল, যা তিনি ভেবেছিলেন তাই-ই হচ্ছে। পাখির চোখ দেখতে তিনি ভুল করেননি। আর এখানেই থেকে যায় মোক্ষম এক প্রশ্ন! কুণাল কামরার বক্তব্যকে সমর্থন করছেন অনেকেই। তিনি যে সাহসী তা স্বীকার করে নিতেও দ্বিধা নেই। আপাতত যে ঝামেলায় তাঁকে পড়তে হবে, তা মোকাবিলা করবেন কুণালই, ব্যক্তিগত ভাবে। তবে যে সত্য তিনি প্রকাশ করেছেন, তা জেনেও নীরব থাকাই কি শ্রেয় ভাবছে বাকি দেশ! যদি তা হয়ে থাকে তাহলে কুণাল কামরা একজন বিচ্ছিন্ন ব্যক্তি হয়েই থেকে যাবেন আদতে। একদিন রাষ্ট্রেরও তাঁকে ভয় পাওয়ার আর কিছু থাকবে না। ‘আরবান নকশাল’ বলে দাগিয়ে দেওয়ারও আর প্রয়োজন পড়বে না। রাজনীতির প্রকল্প সেদিনও বজায় থাকবে বহাল তবিয়তেই।
কুণাল কামরা তাই শেষ পর্যন্ত একক না সমবেত হয়ে উঠবেন তা নির্ধারণ করবে বাকিরা। সে ভূমিকা কি পালন করার মতো সাহসী হয়ে উঠবে, তাঁর সহ-নাগরিকরা? তা যদি না হয়, তাহলেই বলতেই হয় যে, কুণাল কামরা, এমন রসিকতা করা উচিত হয়নি আপনার। কেননা তা হজম করার মতো রসিক নয় রাষ্ট্র। গ্রহণ করা মতো তৈরি নয় মানুষও। নিছক কমেডি শো কি আর আপনাকে মানায়, কুণাল কামরা?