দখল হয়েছে খেলার মাঠ। বেজায় চটেছে খুদেরা। চিঠি গেল প্রশাসনের দপ্তরে। তড়িঘড়ি পদক্ষেপ, উদ্ধার হল ৭৮ একর সরকারি জমি। কোথায় ঘটেছে এমন কাণ্ড? আসুন শুনে নেওয়া যাক।
ঘড়িতে অ্যালার্ম দেওয়ার দরকার নেই। আলাদা করে কাউকে ডাকতেও হবে না। বিকেল হলে সবাই মাঠে হাজির হবে, ঘড়ি না দেখেই ঠিক পাঁচটায়। রোজের অভ্যাস ক্রিকেট। বৃষ্টি পড়লে ফুটবলটাও চলতে পারে। কিন্তু একি, কারা যেন মাঠের বাইরে নোটিশ ঝুলিয়েছে, ‘বিনা অনুমতিতে প্রবেশ নিষেধ’।
এমনিতে পাড়ায় মাঠ বলতে একটাই। খুব একটা ঘাসজমি নেই, পড়লে লাগে। তবু বিকেল হলে সবাই জড়ো হয়। জমিয়ে খেলা হয়। সেখানে ঢুকতে গেলে অনুমতি নিতে হবে? ব্যাপারটা ঠিক হজম হয়নি সুবল, সাগর, ফড়িং, ছোটকাদের। নোটিশের তোয়াক্কা না করেই সেদিন খেলেছিল ওরা। কিন্তু পরদিন সেই সুযোগটাও হয়নি। বাঁশের বেড়া চারদিকে, ঢুকতে গেলে টপকাতে হবে। একের বদলে কয়েকটা নোটিশ ঝোলানো, ‘প্রবেশ নিষেধ’। এবার ভয় পেল ওরা। কোথায় কে দেখে ফেলবে, হয়তো বকুনি খেতে হবে, তার চেয়ে বরং খেলা বন্ধ থাক। এভাবেই একদিন, দুদিন, তিনদিন, সপ্তাহ পেরোল। রোজ বিকেলে মাঠে যাওয়ার অভ্যাসটাও কাটছে। এসব নিয়ে বাড়ির কারও মাথাব্যথা নেই। না থাকাটাই অবশ্য স্বাভাবিক, কারণ খেলা বন্ধ থাকলে তো পরীক্ষায় নম্বর কমবে না!
যাইহোক, কয়েকদিন পেরিয়ে বেশ বিরক্ত হয়েই ওরা একদিন হাজির হল মাঠের সামনে। চেনাই যাচ্ছে না! বাঁশের বেড়া বদলে ইটের পাঁচিল। তার গায়ে নোটিশ ঝোলানো। এখন অবশ্য গেট আছে, সামনে একজন গোফুরে বসেও আছে। কাছে গিয়ে ছোটকা জানতে চাইল, ‘কী হচ্ছে এখানে?’ কোনও উত্তর নেই। ইশারায় চলে যাওয়ার নির্দেশ। মানা হল, খানিক ভয়, খানিক বিস্ময় সঙ্গে করে বাড়ি ফিরল খুদের দল। এরপর স্কুলে যাওয়ার পথে, বাজার যাওয়ার পথে মাঠটাকে আড়চোখে দেখেছে ওরা সব্বাই। যেটুকু ঘাসজমি ছিল, তাও নেই। বদলে শুধু ইট, সিমেন্ট, বালি আর কয়েকজোড়া বুটজুতোর ঘোরাফেরা। বড়দের জিজ্ঞাসা করেও উত্তর মেলেনি। কেউ জানে না, ওখানে কী হচ্ছে! শুধু ওরা জানে, ওদের খেলার মাঠ ধ্বংস হচ্ছে।
এইসময় একটা বুদ্ধি এল ফটিকের মাথায়। স্কুলে সে সদ্য চিঠি লিখতে শিখেছে, ‘ফরমাল লেটার’। এইভাবে নাকি অভিযোগ জানাতে হয়, এ কথাও স্কুলেই শিখেছে ফটিক। এই মুহূর্তে তাদের একটাই অভিযোগ, খেলার মাঠ হারিয়ে যাওয়া। ঠিক করল সে কথাই চিঠিতে লিখে অভিযোগ জানাবে। কোথায়, কার কাছে অভিযোগ জানাতে হবে, সেসব জেনে নিল বড়দের জিজ্ঞাসা করে। এরপর নিজের মতো করে চিঠি লিখল, সে চিঠি পড়ে শোনাল বন্ধুদের। বড়দের সাহায্য নিয়েই নির্দিষ্ট ঠিকানায় চিঠি পাঠিয়ে দিল। তারপর কয়েকদিনের অপেক্ষা। খেলার মাঠে ফের অচেনা বুটের আওয়াজ, এবার আরেকটু বেশি। কয়েক ঘণ্টায় সবকিছু সাফ। পাঁচিল ভাঙা হল, নোটিশ ছেঁড়া হল, কয়েকজনকে গাড়িতে করে তুলে নিয়ে গেল পুলিশ। এইসব সামনে থেকে দেখল ফটিক, ছোটকা ও দলবল। আনন্দে হাততালি দিয়ে উঠল ওরা। আজ খুব খুশির দিন, আবার ক্রিকেট খেলা হবে!
শুনতে গল্পের মতো মনে হলেও, এ কাহিনি একেবারে সত্যি। ঘটনা হায়দরাবাদের। সম্প্রতি সেখানকার এক গ্রামে অবৈধভাবে দখল করা হয়েছিল প্রায় ৭৮ একর সরকারি জমি। প্রশাসনের নজর এড়িয়ে সেখানে অবৈধ নির্মান শুরু হয়েছিল। তবে ওই জায়গার কিছুটা অংশ যে স্থানীয় খুদেদের খেলার জায়গা ছিল, তা জানতেন না ওই অবৈধ কাজের নেপথ্যে থাকা অসাধু ব্যবসায়ীরা। কাজেই সবদিক ম্যানেজ করলেও, এদিকটা সামলাতে পারেননি তাঁরা। খেলার মাঠ হারিয়ে যাওয়া মেনে নিতে পারেনি খুদের দল। তাদের অভিযোগেই তড়িঘড়ি পদক্ষেপ করে প্রশাসন। জানা গিয়েছে ওই জায়গা ইতিমধ্যেই খালি করা হয়েছে প্রশাসনের তরফে। ‘সরকারি জমি’, এমন নোটিশও দেওয়া হয়েছে। তাতে খুদের খেলায় বাধা নেই। সেই কবে নীরেন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘সে এসে একবার এই হাততালির ঊর্ধ্বে গলা তুলে জিজ্ঞাসা করুক- রাজা, তোর কাপড় কোথায়?’ সেই শিশুরাই যেন দল বেঁধে প্রশ্ন তুলল। রাজা নেই তো কী হয়েছে, যা কিছু ভুল তার বিরুদ্ধে তাদের ওই প্রশ্নই তীরের ফলার মতো কাজ করল।