ছোট হতে হতে বোকাবাক্সে বন্দি হয়েছে পৃথিবী। চেনা গান যে আশঙ্কার কথা শুনিয়েছিল, তা আর অচেনা নয়। পাল্লা দিয়ে ছোট হয়েছে সেই বাক্স। আকারে, বহরে তো বটেই, গুরুত্বের বিচারেও। কথা হারিয়ে চেনা গানের সুর হয়েছে মোবাইলের রিংটোন, আর বোকাবাক্স বেমালুম হাওয়া! কোথায়, কীভাবে, সেই খোঁজ রাখে না কেউ। রাখতে চায়ও না বোধহয়। তবু বোকামির দিনে বোকাবাক্সকে মনে না করলেই নয়! ছবি দীপঙ্কর ভৌমিক।
বোকা হওয়ার দিনে পৃথিবীর যা কিছু ‘বোকা’ সেইসব নিয়ে আলোচনায় বসলে, টেলিভিশনের কথা বলতেই হয়। যাকে ‘বোকাবাক্স’ বলে দুনিয়া চেনে, সে না থাকলে কত চালাক মানুষ কোথায় যেন হারিয়ে যেতেন। নিজেকে মেলে ধরতেই পারতেন না। তাই এক নয়, একশোটা উদাহরণ রয়েছে বোকাবাক্সের বোকামির, কিংবা বোকা বানানোর।
ক্যাটরিনা কাইফ যে ব্র্যান্ডের সাবান ব্যবহার করেন, সেই সাবান যে-কেউ কিনতে পারেন। গেরস্তকে এই জটিল কথা সহজ করে বুঝিয়ে ছিল কে? টেলিভিশন! নেপথ্যে যে বিজ্ঞাপনের কারিগরি, সেসব বুঝত না কেউ। স্রেফ ধরে নেওয়া হত, ‘টিভিতে দেখিয়েছে’, মানে এটাই সত্যি। তার চেয়ে ধ্রুব আর কিছু হয় না। টিভিতে যাই দেখানো হবে সেটাই সঠিক, একথা কেউ কখনও প্রচার করেনি, অথচ এমনটা নিশ্চিন্তে মেনে নিতেন সবাই। বোকামির তালিকায় একে একে জুড়ত, প্রোপাগান্ডা, মিথ্যা ভাষণ, মিথ্যা প্রতিশ্রুতি!
:আরও শুনুন:
বোকাদের দিন! কেন শুরু হয়েছিল এপ্রিল ফুল’স ডে?
দেশে তখন অস্থির পরিস্থিতি। প্রধানমন্ত্রী ঠিক করলেন, টিভিতে এমন এক অনুষ্ঠান শুরু হোক, যা অনেকক্ষণ এক জায়গায় অনেক মানুষকে আটকে রাখবে। শুরু হল রামায়ণ-মহাভারত। ইতিহাসে ভর করে তৈরি সেই অনুষ্ঠান ইতিহাস গড়ল। দীর্ঘক্ষণ বাড়ির বাইরে পা রাখতেন না অনেকে। ঘরে টিভি না থাকলে, অন্য কারও বাড়ি হাজির হতেন। তবু রবিবার সকালের মহাভারত মিস হত না। টিভিতে যখন এই অনুষ্ঠান চলছে, রাস্তা-ঘাট দেখলে মনে হত লকডাউন! বোকাবাক্স এতটাই বোকা যে, ধর্ম-বর্ণ-জাতি যাবতীয় ভেদাভেদ মুছে দেওয়ার চেষ্টা করেছে বারবার। গানের কথায়, কবিতার লাইনে নয়, বাস্তবে সম্প্রীতির সুর বুনতে শিখিয়েছিল টেলিভিশন।
সেই টেলিভিশন, যাকে সবাই বোকাবাক্স বলে চেনে, সে এখন ড্রয়িংরুমের কোণ ছেড়ে পকেটে এসে ঢুকেছে। আসল দুনিয়ার পাশাপাশি নকল একটা দুনিয়া বানিয়েছে। তাতে হিংসা, আক্রমণ, লোভ, মিথ্যাচার সব আছে। শুধু বোকা মানুষ নেই। একসময় যে বোকাবাক্স অনায়াসে সবাইকে বোকা বানাত, তা এখন অতীত। নকল দুনিয়ায় সবাই চালাক। এখানে বোকা হওয়া বেশ কঠিন। তার জন্য যা খুশি প্রমাণ করা যায়। কেউ যাচাই করতে আসে না। প্রত্যেকে ভাবে সে চালাক, কিংবা এত সময় নেই। বোকাবাক্সকে বেমালুম ভুলে চালাক হওয়ার দৌড়ে নেমেছে সবাই। তাতে যে একা একা বোকা হতে হচ্ছে, সেদিকে হুঁশ নেই।
:আরও শুনুন:
স্মার্টের জ্বালায় অস্থির! সাবেকিয়ানায় ঝুঁকে এখন ‘বোকা ফোন’ হাতে চাইছেন তরুণরাই
একসময় খেলা চলত স্রেফ টিভির পর্দায়। একসঙ্গে চিৎকার, একইসঙ্গে হা-হুতাশ, একসঙ্গে উল্লাস। বোকাবাক্সের সঙ্গে সেই সব হারিয়েছে। টিভির পর্দা ছোট হতে হতে হাতের তালুর মাপে এসে পৌঁছেছে। খেলা দেখায় সমস্যা হয়নি কোনও। স্রেফ একা মানুষ, আরও একা হয়েছে। এই একা হওয়ায় কি বোকামি নেই? হয়তো আছে। কিংবা নেই। এসব আলোচনা করেও লাভ নেই। শুধু বোকাবাক্সের কথা মনে পড়লে যেন মনে হয়, হারিয়ে যাবে বলেই সে জন্ম নিয়েছিল। এতবড় জায়গা জুড়ে কেউ থাকবে, এমনটা কাঁহাতক সহ্য করা যায়। তাই বোকাবাক্সটা ছোট ছোট হতে হতে বুকপকেটে ঢুকছে, এমনটা দেখেও কেউ বলেনি ‘আহাহাহা’।
তবু প্রশ্ন থেকেই যায়, আসল বোকা কে? যার নামে ‘বোকা’ শব্দটা জুড়েছিল সেই বাক্স, নাকি তাকে যারা ঘিরে থাকত? বোধহয় দু’জনেই। স্রেফ ধরনটা আলাদা। বোকাবাক্সের বোকামি বলতে মানুষকে একসঙ্গে বেঁধে রাখার চেষ্টা, আর মানুষের বোকামি বলতে বোকাবাক্সকে বেঁধে ফেলার চেষ্টা। দুইয়ের দ্বন্দ্বে জিতেছে মানুষ। পুরস্কার হিসেবে পেয়েছে একাকিত্ব। অস্তিত্ব হারিয়ে নিলামে উঠেছে পুরনো বোকাবাক্স। মিউজিয়ামেও ঠাঁই হতে পারে একসময়। গোটা দুনিয়ায় একটাই মাত্র বাক্স হয়ে বেঁচে থাকতে হবে তখন। কাচের বাইরে আঙুল রেখে, মানুষ মানুষকে চেনাবে। তখন অবশ্য শুধুই বাক্স হবে তার পরিচয়। নকল দুনিয়ায় যেভাবে সবাই চালাক হওয়ার দৌড়ে নেমেছে, তাতে বোকা শব্দটাই বেমালুম হাওয়া হতে পারে। তাই বোকাবাক্স বলে কিছু ছিল, সেটাও যে কারও মনে থাকবে না, এমনটা ধরে নেওয়া যেতেই পারে।