ফলের আশা না করে কাজ করে যেতে হবে। গীতার এই উপদেশ অনেকেই মেনে চলার চেষ্টা করেন। কিন্তু বিষয়টা যে এত সহজ নয় তা বাস্তব অভিজ্ঞতায় টের পাওয়া যায়। আর সেখানেই জন্ম নেয় বিরক্তি। কাজের প্রতি, কাজের পরিবেশের প্রতি, কখনও নিজের প্রতিও। সমীক্ষা বলছে ভারতের অন্তত ৩০ শতাংশ কর্মীই কর্মজগত নিয়ে রীতিমতো বিরক্ত। আর কী জানা যাচ্ছে ওই সমীক্ষা থেকে? আসুন শুনে নেওয়া যাক।
মারাত্মক কাজের চাপ। দম ফেলার সময় নেই। এরই মাঝে বারবার ফোন আসছে। বিষয়টা এমনই গুরুত্বপূর্ণ যে উপেক্ষা সম্ভব নয়। তাই ফোন সামলে চলছে কাজ। এদিকে বস এসে দাঁড়িয়েছেন চেয়ারের পাশে। ফোন আসছে দেখলেই মুখ দিয়ে বিরক্তির শব্দ প্রকাশ করছেন। এক-দুবার এমনটা হল। তারপর সরাসরি ধমক। অপমানের মাত্রাটাও বেশ কড়া। এতেই ভাঙল ধৈর্য্যের বাঁধ। সোজা গিয়ে বসের কলার ধরে টেনে থাপ্পড়। একবার নয়, বেশ কয়েকবার। সব অপমানের উত্তর দিয়ে মুখের উপর আইকার্ড ছুড়ে বেরিয়ে গেলেন শ্রীকান্ত তিওয়ারি।
‘ফ্যামিলি ম্যান’ ওয়েব সিরিজের এই দৃশ্য অনেকেরই চেনা। তবে এভাবেই যে দেশের বর্তমান পরিস্থিতি ফুটিয়ে তুলেছিলেন পরিচালক, তা বোঝা গেল সম্প্রতি। বিষয়টা খুলেই বলা যাক। কথা বলছি গ্যালপের সমীক্ষা নিয়ে। আন্তর্জাতিক এই সংস্থাই বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কর্মজগত নিয়ে সমীক্ষা চালায়। সেখানেই চমকে দেওয়ার মতো তথ্য এসেছে দক্ষিন এশিয়ার দেশগুলি থেকে। তালিকায় ভারতও রয়েছে। এর আগে এক সমীক্ষায় দাবি করা হয়েছিল, এ দেশের মাত্র ১৪ শতাংশ কর্মী কাজের জায়গা নিয়ে সন্তুষ্ট। বাকি ৮৬ শতাংশ সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন। কেউ কর্মজগতের পরিবেশ নিয়ে বিরক্ত, কেউ কাজ নিয়ে, কারও আবার বেতন কিংবা অন্য কোনও সমস্যা। সাম্প্রতিক সমীক্ষাও আলাদা কিছু ইঙ্গিত করছে না। তবে এবার স্পষ্ট হয়েছে কতজন কর্মক্ষেত্র বদলে ফেলতে চাইছেন। সংখ্যাটা ৫০ শতাংশেরও বেশি। যা অত্যন্ত শঙ্কার বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। কিন্তু চাইলেই তো কর্মপরিবর্তন সম্ভব নয়। বাধ্য হয়ে অপছন্দের পরিবেশে কাজ করে যেতে হচ্ছে অনেককে। এঁদের মধ্যে রাগের প্রবণতা বাড়ছে, এমনটাই জানাচ্ছে গ্যালপের সমীক্ষা। প্রায় ৩৪ শতাংশ কর্মী কাজের জগত নিয়ে বিরক্ত, আর সেই বিরক্তির বহিঃপ্রকাশ হচ্ছে রাগের মধ্যে দিয়ে। ব্যক্তিগত জীবনেও তার প্রভাব পড়ছে মারাত্মক।
বিষয়টা নিয়ে যে ভাবনার প্রয়োজন রয়েছে তা বলাই বাহুল্য। এমনিতে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে এতশত কথা হয়, তাতে এই বিষয়টাও উঠে আসা আশু প্রয়োজন। কেন সমস্যা, কোথায় সমস্যা তা আগেভাগে বুঝতে না পারলে বিপদ বাড়বে বই কমবে না। খুব বেশিদিনের ঘটনা নয়, সামান্য ছুটি নিয়ে বচসা হওয়ায় সহকর্মীকে ছুরি দিয়ে আঘাত করেছিলেন এক আইটি কর্মী। তাতেও এতটুকু আক্ষেপ ছিল না তাঁর। এ প্রসঙ্গ ধরেই যেন মনে পড়ে যায়, ‘ফ্যামিলি ম্যান’-এর সেই দৃশ্যটা। একইসঙ্গে মনে পড়ে যায়, সপ্তাহে ৭০ ঘণ্টা কাজের নিদান দিয়েছিলেন ইনফোসিস কর্তা। সপ্তাহে ৯০ ঘণ্টা কাজের দাবিও উঠেছিল। এমনকি সপ্তাহান্তেও অফিসের কাজ থেকে বিরত না থাকার কথা বলেছিলেন কেউ কেউ। অর্থাৎ নিজের জীবন, অবসর সব কিছু ভুলে স্রেফ কাজ করে যেতে হবে। তাতে মোটা টাকা বেতন অবশ্যই মিলবে। কিন্তু তা খরচের অবকাশ খুব একটা মিলবে না। এর থেকেই হয়তো ইঙ্গিত মেলে, কেন নিজেদের কর্মজগত নিয়ে এতটুকু খুশি নন অধিকাংশ কর্মী! যারা বেরিয়ে যেতে পারছেন তাঁদের জীবনটা হয়তো তবু কিছুটা বদলায়। কিন্তু যারা পারছেন না, তাঁদের বিরক্তি প্রকাশ পাচ্ছে রাগ হয়ে। কেউ আবার হতাশায় আত্মহননের সিদ্ধান্তও নিতে বাধ্য হচ্ছেন। একাধিক উদাহরণ রয়েছে তার। অতএব গুরুত্বের বিচারে এই বিষয়টাকে প্রধান্য না দিলে ভবিশ্যতে অনেক বড় বিপদ ডেকে আনবার সম্ভাবনা রয়ে যায়।