সভ্যতার এই লগ্নে দাঁড়িয়ে মানুষের একটাই প্রার্থনা হতে পারে, বিশ্ব জুড়ে থামুক যাবতীয় যুদ্ধ। কেননা মায়েদের কান্নার কোনও দেশ হয় না। তবু শেষ তো হতে পারে। সেটুকু দায়িত্ব আমাদের, এই পৃথিবীর অমৃতের সন্তানদেরই।
… আমরা তোমার শান্তিপ্রিয়, শান্ত ছেলে, তবু শত্রু এলে অস্ত্র হাতে ধরতে জানি- এই বলে বীরপুরুষ সন্তান তো চলল যুদ্ধে। তাতে কী মায়ের প্রাণ মানে! সে তিনি দেশমাতৃকা হোন বা রক্তমাংসের মা! আসলে মা শব্দের মধ্যেই যে মায়া, যে শান্ত আশ্রয় তা যেন যুদ্ধের পরিপন্থী। মা যেন এমন এক আকাশ, যার নিচে দাঁড়িয়ে সব সন্তান-ই সমান।
অথচ সমান কি-না, তা নিয়েই যত ঝামেলা। এ পৃথিবী কাঁটাতারে কাঁটাতারে ভাগ ভাগ। আলাদা মানচিত্র। মায়েদের মনচিত্র তবু পৃথিবী জুড়েই এক। সাম্প্রতিক ভারত-পাক সংঘাতের আবহের কথাই ধরা যাক। যুদ্ধবিরতির আগে পর্যন্ত, এই সংঘাত পুরোদস্তুর যুদ্ধে গড়াবে কিনা তা নিয়ে চলছিল জল্পনা। আর সেই দুঃস্বপ্নের ভিতর অনেকেরই স্মৃতিতেই ফিরে এসেছিল একজন মায়ের ছবি। শহিদ জওয়ান তাঁর সন্তান। ইন্ডিয়া গেটের সামনে শহিদের স্মৃতিসৌধের সামনে ছেলের নাম খুঁজে পেয়ে আর চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি মা। ঠিক পাশেই রাখা যায় আর এক ছবি। পাকিস্তানে যুদ্ধবিরোধী প্রতিবাদী জমায়েতে পোস্টার হাতে দাঁড়িয়ে ছিলেন এক মা। তাঁর একটাই কথা- যা-ই হোক না কেন, সীমান্তের দুই পারে মায়েদের কান্নার স্বর তো লোকানো যাবে না। সত্যিই লোকানো যায় না। কূটনীতির রন্ধ্রে রন্ধ্রে হাজারও ফাঁস। সেই গেরোয় আটকে যায় শান্তিপ্রস্তাব। সংলাপে সমাধানের পথ যখন রুদ্ধ হয়ে যায় তখন সীমান্ত দেখে আগুনের হলকা। যুদ্ধ কিংবা যুদ্ধ পরিস্থিতি। আদতে তো নিরপরাধ নাগরিকদের উপরেই আঘাত। আর সে আঘাতের ক্ষত যাঁদের সবথেকে বেশি, তাঁরা মা। তাঁদের কোনও কাঁটাতার হয় না। তাঁদের অনুভূতির কোনও বিভাজন নেই। এ পৃথিবী যদি মায়েদের যন্ত্রণার সমব্যথী হত, তাহলে যুদ্ধ বলে হয়তো কিছুই থাকত না।
এবার ভারত-পাক সংঘাতে যুদ্ধবিরতি হল। তবু, অনেক ক্ষেত্রেই যুদ্ধ এড়ানো যায় না। যে মানুষ অমৃতের সন্তান, সে অমৃত ভুলে তুলে নেয় গরল। বিদ্বেষের বিষ। দেশে-দেশে, ধর্মে-ধর্মে, জাতে-জাতে সংঘাতের সলতে উসকে দেয় ক্ষমতাদখলের লড়াই। যুদ্ধ সর্বার্থেই এক রাষ্ট্রীয় প্রকল্প। অথচ মাতৃভূমির স্বার্থে তা এমনই অনিবার্য হয়ে ওঠে এক একে সময় যে, মা তার সন্তানকে যুদ্ধে পাঠাতে দ্বিধা করেন না। তাঁদের একক যন্ত্রণা চাপা দেয় বীর সন্তানের বীরত্বের ইতিহাস। যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি বাকিদের কাছে তথ্য। মায়েদের কাছে নাড়িছেঁড়া যন্ত্রণা। আর তাই এই বিশ্বকে যদি মায়েদের চোখে দেখা যায়, তবে দেখা যাবে, সেখানে সংঘাত-যুদ্ধ নয়, বরং জগৎজুড়ে মেলা আছে স্নেহের আঁচলখানা।
যুদ্ধের সময় সেনাবাহিনীতে মহিলাদের প্রতিনিধিত্ব আলাদা গুরুত্ব বহন করে। তবে গবেষণা বলছেন, মায়েরা প্রকৃতপ্রস্তাবে যুদ্ধের বিরোধিতা করেন। তাঁরা চান না, যুদ্ধের দরুন কোথাও কারও সন্তান এ পৃথিবী ছেড়ে চলে যাক। রাশিয়া-ইউক্রেনের যুদ্ধেই সে নজীর ধরা পড়েছে। জনপ্রিয় সংবাদমাধ্যম যুদ্ধের সময় রাশিয়ান সৈনিকদের মায়েদের সাক্ষাৎকার নেয়। প্রত্যেকের ক্ষেত্রেই উদ্বেগ ধরা পড়ে স্পষ্টভাবে। যুদ্ধে কে জিতবে কে হারবে সেসব নিয়ে এতটুকু ভাবনা নেই তাদের। সকলেই প্রার্থনা করছেন, ছেলে ফিরে আসুক। শুধু যে নিজের ঘরে ছেলে ফিরুক এমন নয়, যুদ্ধে যেন কারও সন্তান প্রাণ না হারায় এমনটাই চাইতেন তাঁরা। তবু এই প্রার্থনা ঢাকা পড়ে যেত বিস্ফোরণের ঘায়ে হাসপাতালের ভাঙাচোরা হাসপাতালের ছবি দেখে। কত শিশু জ্ঞান হওয়ার আগেই পৃথিবী ছাড়তে বাধ্য হল! সে ব্যথা কি একা তার গর্ভধারিনীর? কখনই না। এক্ষেত্রে ইউক্রেনের মানবিক পদক্ষেপ বেশ চর্চায় উঠেছিল। রাশিয়ান সৈন্যদের মায়েদের জন্য বিশেষ হটলাইন চালু করেছিল তারা। সেই মারফত সন্তানের বেঁচে থাকার খবরটুকু অন্তত পেতেন তারা।
ইতিহাস সাক্ষী আছে, কোনও যুদ্ধেই মায়েদের সায় থাকে না। সন্তানের বীরত্বের তাঁর মাথা উঁচু হবে একথা সত্যি, তবে সেই সম্মানের জন্য সন্তানের মৃত্যু কাম্য নয়। মনে পড়ে যায় ক্যাপ্টেন অংশুমান সিং-এর কথা। কিছুদিন আগে মরণোত্তর কীর্তি চক্র সম্মানে ভূষিত হয়েছেন তিনি। রাষ্ট্রপতির হাত থেকে সেই পদক গ্রহণ করেছিলেন তাঁর মা ও স্ত্রী। বিষয়টা বিতর্কের দিকে গড়িয়েছিল নানা কারণে। তবে সেদিনের যে কটা ছবিতে ক্যাপ্টেন অংশুমানের মা-কে দেখা গিয়েছে, তাতে একটাই আরজি স্পষ্ট হয়, সম্মানের চেয়ে অনেক বেশি দামী ছিল তাঁর সন্তান। এমনই কতশত মায়ের ছবি ভেসে ওঠে সোশাল মিডিয়ায়। কেউ তাঁর বীর সন্তানের স্মৃতি সৌধ আকড়ে কাঁদছেন, কেউ বা বর্ডারে ডিউটি করতে যাওয়া সন্তানকে শেষবারের মতো জড়িয়ে ধরছেন, যদি আর ফিরে না আসে! কতশত গল্প, কতশত ছবির আড়ালে একটাই সত্যি জ্বলজ্বল করে, মায়ের ভালোবাসা। রবিঠাকুরের কল্পনায় মা-কে ডাকাতের হাত থেকে বাঁচানো বীরপুরুষকে নিয়েও তাঁর মা দুশ্চিন্তা করতেন। বাস্তবের গল্পটা তেমন কিছু আলাদা নয়। সন্তান তার মা কে বাঁচাতে জীবন দিতেও দুবার ভাববে না, কিন্তু মা কখনও চান না এমন। তা সে গর্ভধারিণীই হোন, কিংবা দেশমাতৃকা।
আর তাই সভ্যতার এই লগ্নে দাঁড়িয়ে মানুষের একটাই প্রার্থনা হতে পারে, বিশ্ব জুড়ে থামুক যাবতীয় যুদ্ধ। কেননা মায়েদের কান্নার কোনও দেশ হয় না। তবু শেষ তো হতে পারে। সেটুকু দায়িত্ব আমাদের, এই পৃথিবীর অমৃতের সন্তানদেরই।