পুলিশের তাড়া খেয়ে শুরু হয়েছিল দৌড়, যাত্রা পৌঁছেছিল অলিম্পিকে, সেনাবাহিনীতে চাকরির সুবাদে অকথ্য অত্যাচার সয়েও জীবনযুদ্ধে অপরাজিত থাকার নাম লুই জেম্পারিনি

Published by: Susovan Pramanik |    Posted: April 13, 2021 4:26 pm|    Updated: April 15, 2021 7:01 pm

Published by: Susovan Pramanik Posted: April 13, 2021 4:26 pm Updated: April 15, 2021 7:01 pm

স্কুলে পড়ার সময়েই ছোটখাটো চুরি, ছিনতাই, গ্যাং-ওয়ারে হাত পাকিয়েছিল সে। পুলিশের তাড়া খাওয়া তারকাছে ছিল নিত্য-নৈমিত্তিক ব্যাপার। একটাই জিনিস পারতো সে, দৌড়তে। পুলিশের তাড়া খেয়ে বাতাস কেটে পালকের মতো হালকা হয়ে তীব্র দৌড় অভ্যাস হয়ে গেছিল। বাতাসের গতিতে দৌড়ে বহুবার পুলিশের হাত থেকে পালিয়েছে লুই। আর এভাবেই একদিন তাকে দৌড়তে দেখে ফেলেছিল তার ভাই ও একমাত্র বন্ধু পিটার। ক্রমশ ‘অন্ধকার’ জগতে হারিয়ে যেতে বসা লুই জেম্পারিনির মধ্যে সে দেখেছিল অপার সম্ভাবনা। শুরু হয় ট্রেনিং। টরেন্সে লুইয়ের মতো দৌড়তে পারতো না কেউই। অচিরেই সবার নজর কাড়ে সে। লোকে তাকে ডাকতো ‘দ্য টরেন্স টর্ণেডো’ নামে। এভাবে দৌড়তে দৌড়তেই নতুন জীবনের দিশা পায় লুই। ডাক পায় অলিম্পিকে। ১৯৩৬ সালে বার্লিনে অনুষ্ঠিত ‘সামার অলিম্পিকে’ ৫০০০ মিটারের দৌড়ে অংশ নেয়। ফলের বিচারে খুব ভালো হয়না যদিও, অষ্টম স্থান দখল করে। গড়ে এক নতুন রেকর্ড। ততদিনে মাথায় ভর করেছে নতুন স্বপ্ন—

অলিম্পিকে মশাল হাতে দৌঁড়ানোর। মশালের সেই অনির্বাণ অগ্নিশিখা সহ দৌড়ে গৌরবের অধিকারী হতে চায় সে।

কিন্তু এদিকে অলক্ষ্যে বেজে ওঠে যুদ্ধের দামামা। বিধিলিপি তার জন্য বোধহয় অন্য কিছু অপেক্ষায় রেখেছিল। ইউএস এয়ারফোর্সে ‘বম্ববার্ডার’ হিসেবে নিযুক্ত হয় সে। মিত্র শক্তির হয়ে যুদ্ধে লড়তে শুরু করেন লুই। কিন্তু ভাগ্য তাঁর জন্য বুঝি ভেবে রেখেছিল আর এক অন্য ‘চ্যালেঞ্জ’।

১৯৪৩ সালের ২৭ মে প্রশান্ত মহাসাগরে ভেঙে পড়া একটি প্লেনের ‘রেস্কিউ অপারেশনে’ যায় সে। কিন্তু এমনই কপাল যান্ত্রিক গলযোগের কারণে মাঝ-সমুদ্রে ভেঙে পড়ে জেম্পারিনির বি ২৪ গ্রীন হরনেট বিমানটি। ১১জন সৈনিকের মধ্যে মারা যান ৮জন। প্রাণে বেঁচে যায় লুই জেম্পারিনি সহ পাইলট রাসেল ফিলিপ ও ফ্রান্সিস ‘ম্যাক’নামারা। দুটি ছোট ছোট ‘র‍্যফটে’, অল্প খাবার ও বিনা জলে সেই উত্তাল মহাসাগরের বুকে ৪৭ দিন বেঁচে ছিলেন তাঁরা। কিন্তু বাঁচতে পারেননি ফ্রান্সিস। ৩৩ দিনের মাথায় অনাহারে প্রাণ হারান তিনি। নিয়তির হাতে নিজেদের সঁপে দিয়ে দিন গুনছিলেন বাকি দু’জন। অবশেষে মার্শাল আইল্যাণ্ডের কাছে এক জাপানি নৌ-বহর উদ্ধার করে মুমূর্ষু দুই মার্কিন সেনাকে।

সমুদ্রের করাল গ্রাস থেকে আপাতত প্রাণে বেঁচে ফিরলেও ফিলিপ ও জেম্পারিনি ধরা পড়লেন শত্রুপক্ষ জাপ সেনাদের হাতে। যুদ্ধবন্দী হন তারা। শুরু হয় অকথ্য অত্যাচার। জাপানি সেনারা তাঁদের থেকে মিত্রশক্তি’র সেনাদের নিশান-হদিশ জানতে চায়। তাঁরা কিন্তু মুখ খোলেননি। ফলস্বরূপ, বিপুল নির্যাতনের মুখে পড়েন। যুদ্ধবন্দীদের সাথে এমনটাই হয়ে থাকে চিরকাল। দিনরাত তাঁরা মৃত্যুভিক্ষা করেছেন, কিন্তু মৃত্যু আসেনি। এসেছে ভারি বুটের লাথি আর চাবুক। লুই জেম্পারিনি ও রাসেল ফিলিপকে নিয়ে আসা হয় টোকিও’তে, ‘ওয়ার প্রিজনার’-দের ডিটেনশন ক্যাম্পে। সেখানে তাঁরা মুখোমুখি হলেন জলজ্যান্ত বিভীষিকা জাপ কর্পোরাল মাৎসুহিরো ‘দ্য বার্ড’ ওয়াতানাবির। বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাসে অন্যতম ভয়াল, অত্যাচারী এই জাপানি সেনানায়কের কালো নজর গিয়ে পড়ল জেম্পারিনির উপর। কথায় কথায় মারধর, খেতে না দেওয়া, দিন রাত অকথ্য অত্যাচার-গালিগালাজ করে তিনি এক আশ্চর্য পরিতৃপ্তি পেতেন। সেই দুঃসহ দিনরাত্রি আর অত্যাচারের বহর এমনই ছিল যে, জেম্পারিনি পরে জানিয়েছিলেন, ‘ওয়াতানাবির হাতে ধরা পড়ার চাইতে সমুদ্রে প্রাণ হারালেই বুঝি ভালো হতো।’ শুধু জেম্পারিনি নন, ‘ওয়ার প্রিজনার্স ক্যাম্পে’ আটকে পড়া সমস্ত যুদ্ধবন্দী সৈনিকদের কাছে দুঃস্বপ্নের মতো ছিলেন ওয়াতানাবি। এক সময়, টোকিও’তে বোমা পড়ল। সমস্ত যুদ্ধবন্দীদের সরিয়ে নিয়ে আসা হল নাওয়েৎসুর দুর্ভেদ্য ডিটেনশন ক্যাম্পে। সেখানেও হাজির হলেন ওয়াতানাবি। আবার নতুন উৎসাহে শুরু হয় দ্বিগুণ অত্যাচার। কেউ প্রতিবাদ করলে বা কাজ না করতে চাইলে একটাই শাস্তি, প্রশ্নাতীত মৃত্যু।

শুনুন…

লেখা: প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত
পাঠ: অনুরণ সেনগুপ্ত
আবহ: শঙ্খ বিশ্বাস

পোল