নবাবের শহর ছেড়ে কলকাতায়। তাও আবার রমজানের সময়! বিগত ৭-৮ বছর ধরে এমনটাই অভ্যেস ওয়াজেদ আলি খানের। তাঁর দোকানের ‘শাহি টুকরা’-র অপেক্ষায় থাকেন অনেকেই। কিন্তু নবাবের শহর ছেড়ে কলকাতায় কেন? তাও আবার রমজানের সময়? নিজেই জানালেন ওয়াজেদ আলি খান। শুনলেন শুভদীপ রায়।
কলকাতার মতো আর কোথাও বিরিয়ানিতে আলু দেওয়ার চল নেই। তা শুরু করেছিলেন নবাব ওয়াজেদ আলি শাহ। তাঁর হাত ধরেই কলকাতার মেটিয়াবুরুজে যেন আরও একটা লখনউ তৈরি হয়েছিল। কলকাতায় নবাবি বিরিয়ানির জন্মও তাঁর হাতেই।
ইনিও ওয়াজেদ আলি, তবে শাহ নয় খান। এসেছেন লখনউ থেকেই। সঙ্গে করে এনেছেন ‘শাহি টুকরা’। জনপ্রিয় এই মুঘল পদ কলকাতার বড় বড় রেস্তোরাঁয় খোঁজ করলেই মিলতে পারে, কিন্তু ওয়াজেদ আলি খানের তৈরি ‘শাহি টুকরা’ কিছুটা হলেও আলাদা।
‘শাহি টুকরা’
রমজানের জাকারিয়া মানেই খাবারের মেলা! লাল-নীল-হলুদ-সবুজ, কতশত রঙের বাহার! স্বাদে-গন্ধে এ-ওকে টেক্কা দেয়। এই ভিড়ে নবাবি মেজাজ স্রেফ একজনের, ‘শাহি-টুকরা’। নামেও যেমন বাদশাহি মেজাজ, স্বাদে, গন্ধে-বহরেও তাই। এমনিতে শাহি টুকরা বলতে যা বোঝায় তার রং দুধ-সাদা। তবে ওয়াজেদ আলির তৈরি শাহি-টুকরা খানিকটা সোনালি বর্ণের। তার কারণ, উপরে ছড়ানো কেশর-পেস্তায় ভরা রাবড়ি। বছরের যে কোনও সময় তার স্বাদ পেতে হলে লখনউ ছুটতে হবে। কিন্তু রমজানের মাসে খাস কলকাতার বুকেই হতে পারে এই নবাবি স্বাদাস্বাদন। বিগত ৮ বছর ধরে নিয়মিত কলকাতায় আসছেন ওয়াজেদ। বয়সের ভারে একা হাতে সবটা সামলাতে পারেন না আর, সঙ্গে থাকেন কর্মচারীরা। তাঁরাই মিষ্টি তৈরি থেকে পরিবেশন, সব করেন। ওয়াজেদ অবশ্য দোকানেই থাকেন। তাঁর দোকানের ‘শাহি টুকরা’ কেন আলাদা, সেসব গল্প শোনান। কীসের টানে নবাবের শহর ছেড়ে রমজানের জাকারিয়ায় আসেন, তাও বলেন।
লখনউই শাহি টুকরা
আসলে, ব্যবসায়ী মানুষ। যেখানে টাকার গন্ধ সেখানে ছুটে যাওয়াই নেশা। রমজানের জাকারিয়া সে অর্থেই আদর্শ গন্তব্য। তবে স্রেফ উপার্জনের টানে প্রতিবছর বাড়ি ছেড়ে এতদূর ছুটে আসেন, এমন নয়। তার জন্য কলকাতার প্রতি ভালোবাসাও একান্ত প্রয়োজন। ওয়াজেদ আলি তা বেশ অনুভব করেন। নবাবের শহরে ইদের উন্মাদনা অন্যরকম, কিন্তু কলকাতার জাকারিয়াও কোনও অংশে কম যায় না। তাই পরিবার ছেড়ে, এতদূর ছুটে আসা। তাতে উপার্জন তো হয়ই, সেইসঙ্গে মেলে কলকাতার ভালোবাসা।
নামেও যেমন বাদশাহি স্বাদে, গন্ধে-বহরেও তাই
রমজানের জাকারিয়ায় অস্থায়ী দোকানের সংখ্যাই বেশি। সেসব মোটের উপর এক ধাঁচে তৈরি। অনেকটা রথের মেলায় জিলিপির দোকানের মতো। বিক্রেতা যতটুকু চাইবেন ততটাই সামনে দেখানো হবে। ওয়াজেদ আলির শাহি টুকরার দোকানটিও অস্থায়ী, তবে এর গঠন খানিক আলাদা। সবটাই উন্মুক্ত। কীভাবে তৈরি হচ্ছে মিষ্টি, তা সামনে দাঁড়িয়ে দেখা নেওয়া যাবে। এমন কিছু নেই, যা আগে থেকে তৈরি করে রাখা আছে। একেবারে টাটকা, সামনে বানিয়ে দেওয়া হবে। কীভাবে তৈরি হচ্ছে বুঝতে না পারলে, ওয়াজেদ আলি দায়িত্ব নিয়ে বুঝিয়ে দেবেন। মূল উপকরণ পাউরুটি, তবে তা সাধারণ বাজার চলতি পাউরুটি নয়। এই খাবারের জন্যই বিশেষভাবে তৈরি হয়। পাইকারি দরে কলকাতার নিউমার্কেট থেকে কিনে আনেন ওয়াজেদ। তফাৎ বলতে, একটু শক্ত সহজে গলবে না। শাহি টুকরার রেসিপিও আহামরি কঠিন কিছু নয়। প্রথমে পাউরুটির চারপাশে থাকা শক্ত পোড়া অংশ বাদ দিতে হবে। তারপর ভালো করে ঘিয়ে ভাজা। এই ঘি-ও লখনউ থেকে নিয়ে আসেন বলেই দাবি করেন ওয়াজেদ। তারপর চিনির রস আর রাবড়িতে ডুবিয়ে রাখা। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তুলে নিতে হবে। যাতে পাউরুটি একেবারে নরম না হয়, আবার খুব শক্তও না থাকে। পরিবেশনের সময় উপর থেকে আরও খানিকটা রাবড়ি ছড়িয়ে দেওয়া। তাতে স্বাদ-গন্ধের মাত্রা আরও বাড়বে। এই রাবড়িতে কেশর-পেস্তা এতটাই পরিমাণে থাকে, যে খাওয়ার সময় মুখে লেগে থাকতে বাধ্য। আর এখানেই অন্যান্য দোকানকে অনায়াসে টেক্কা দেয় ওয়াজেদ আলির ‘শাহি-টুকরা’।
ওয়াজেদ আলি খান
নবাবের দেশে তাঁদের এই ব্যবসা বহুদিনের। সেখানে অবশ্য দোকানপাট সবই আছে। মূলত অর্ডার অনুযায়ী বিক্রি করেন। তবে কলকাতায় কোনও অগ্রিম অর্ডার নেন না। দোকানে গিয়ে কিনে আনতে হবে প্রয়োজন মতো। পরি পিস ৫০ টাকা হিসেবে বিক্রি, তবে এক চামচ মুখে দিলেই দাম পুষিয়ে যাবে। জাকারিয়ার খাদ্য গলিতে আরও অনেক দোকানে শাহি-টুকরা মিলবে, তবে সেগুলি যে এই দোকানের মতো নয়, তা বাইরে থেকে দেখেই খানিক বোঝা যায়। কিছু কিছু দোকান আবার এখান থেকে কিনে নিয়ে বিক্রি করছেন। অতিরিক্ত চাহিদার কারণেই এমনটা করা, গর্ব করে তা বললেন ওয়াজেদ আলি। আসলে, সবাই আসছেন, ভালোবাসছেন, এতেই তাঁর তৃপ্তি। পরিবার ছেড়ে এতদূরে আসার দুঃখও ওতেই মিটে যায়। হই হই করে ব্যস্ততার মধ্যে রমজানের কটা দিন কাটিয়ে ফেলেন ওয়াজেদ ও তাঁর কর্মীরা। ইদের সঙ্গে রমজান শেষ হলে তাঁদেরও দোকান গুটানোর পালা। ফিরে গিয়ে বেশ কয়েক দিনের বিশ্রাম। অপেক্ষা আরও এক বছরের। এর মধ্যে দেশের নানা প্রান্তে শাহি-টুকরা নিয়ে হাজির হবেন ওয়াজেদ আলি। তবু কলকাতার মতো আমেজ আমেজ আর কোথায় মিলবে! সেই অপেক্ষাতেই শুরু হয় দিনগোনার পালা, আগামী রমজানের।