চরবৃত্তির অভিযোগে মধ্যরাতে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল পুলিশ, জুটেছিল সীমাহীন অত্যাচার ও ‘দেশদ্রোহী’ তকমা, বিজ্ঞানী নাম্বি নারায়ণনের জীবনের কালো অধ্যায়

Published by: Susovan Pramanik |    Posted: April 16, 2021 5:09 pm|    Updated: April 16, 2021 5:09 pm

Published by: Susovan Pramanik Posted: April 16, 2021 5:09 pm Updated: April 16, 2021 5:09 pm

পিতা মাতার পাঁচ মেয়ের মধ্যবিত্ত সংসারে একমাত্র পুত্র সন্তান ছিলেন নাম্বি। তাঁর বাবার ছিল নারকেলের ব্যবসা। কিশোর বয়স থেকেই তিনি অসাধারণ ছাত্র, ক্লাসের ফার্স্ট-বয়। ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে কিছু অর্থ উপার্জনের জন্য কাজ শুরু করলেন চিনি কলে। কিন্তু বরাবরই তার শখ আকাশে ওড়ার। সুযোগ পেলেন ‘ইন্ডিয়ান স্পেস রিসার্চ অর্গানাইজেশন’ অর্থাৎ ‘ইসরো’তে। অসাধারণ পাণ্ডিত্য আর অধ্যবসায়ে দ্রুত পদোন্নতি হলো এমনকি প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে রকেট প্রপালসান নিয়ে পড়াশোনা করার স্কলারশিপও পেলেন। এক বছরে তরুণ নাম্বি আরও পরিণত হয়ে যোগ দিলেন ইসরো’তে। সেখানে তিনি সাহচর্য পেয়েছিলেন ভারতীয় মহাকাশ বিজ্ঞানের পিতৃকুলের। ইসরোর প্রতিষ্ঠাতা, বিক্রম সারাভাই, মঙ্গলযান-এর ডিরেক্টর সতীশ ধাওয়ান, দ্য মিসাইল ম্যান এপিজে আব্দুল কালাম। এঁদের সবাইকেই।

সেই সময় ইসরো ছিল নাবালক। তখনও অবধি নিজেদের রকেট সিস্টেম বানানোর কোনো পরিকল্পনাই ছিল না। ইউএসএসআর এবং ফ্রান্সের রকেট ব্যবহার করে নিজেদের পে-লোড পাঠানোর চেষ্টা করতেন তাঁরা। কিন্তু পরিকল্পনা বদলালো। নাম্বির কাঁধে দায়িত্ব পড়লো নিজেদের রকেট সিস্টেম বানানোর। অত্যন্ত কঠোর পরিশ্রম শুরু করলেন এই গুরু দায়িত্ব পালনের জন্য। সবই ঠিকঠাক চলছিল কিন্তু হঠাৎ ১৯৯৪-এ যেন এক দমকায় তাঁর কঠোর পরিশ্রম আর অধ্যাবসায় সব ছারখার হয়ে গেলো। তাঁর গ্রেফতারির মাস খানেক আগে কেরালা পুলিশ মারিয়াম রাশিদা নামের এক মালদ্বীপের বাসিন্দা মহিলাকে আটক করে, মূলত ভিসার গন্ডগোলের জন্য। সপ্তাহ খানেক বাদে আরও এক মালদ্বীপের বাসিন্দা মহিলা ফাওজিয়া হাসানকে গ্রেফতার করে পুলিশ আর তখনই এক ভয়ঙ্কর কেলেঙ্কারি ফাঁস হয়। কেরালা পুলিশের তরফ থেকে খবর বেরোয়, ওই দুই মহিলা আদতে গুপ্তচর এবং তারা ‘ইসরো’র নতুন প্রজেক্টের বহু তথ্য ইতিমধ্যেই পাকিস্তানে পাচার করেছে। বহু নামি স্পেস সায়েন্টিস্ট নাকি জড়িয়েছেন এই ‘মধুচক্র’-এ। তাঁদের মধ্যে  অন্যতম নাম্বি নারায়ণন। যেদিন তাঁকে অফিসিয়ালি অ্যারেস্ট করা হয়, সেদিনই তাঁকে কোর্টে তোলা হয়। তখনও অবধি নাম্বি নিজেই জানেন না তাঁর আসল অপরাধ আদতে কী! জজ অপরাধ স্বীকার করতে বললে তিনি আকাশ থেকে পড়েন। তথ্য পাচারের অভিযোগ শুনে ওই টেনশনের মুহূর্তেও তিনি হো হো করে হেসে ফেলেন। আগের রাত্তির থেকে যেন একটা পূর্ব পরিকল্পিত প্র্যাঙ্ক শো চলছে, তাঁর সঙ্গে। রকেট্রি কোনো অ্যাটম বম্বের থিওরি নয় যেটা কাগজে লিখে পাচার করা যায়! তাঁর এই কথা বিশ্বাস করা তো দূর কেউ সেদিন শোনার আগ্রহ অব্দি প্রকাশ করেননি। ১১ দিনের জেল হয় তাঁর। ভারতবর্ষের নামজাদা এই বিজ্ঞানীর সাদা-কালো কয়েদির পোশাকে কোর্ট থেকে বেরোনোর ছবি ভাইরাল হয় মিডিয়ায়। ‘I was in a shock, and then a trance. At one instance it appeared to me that I was watching a movie – with me as the central character,’—নিজের স্মৃতি গ্রন্থে নিজেই লিখেছেন এ কথা। পরবর্তী কিছু মাসের মধ্যেই তাঁর এত পরিশ্রমে অর্জিত মানসম্মান সবই ধুলোয় মিশে গেলো। ভারতের সরকারি গোপন তথ্যাদি পাচার এবং দুর্নীতির কলঙ্ক তাঁর সাধনার জীবনে প্রায় ইতি টেনে দিয়েছিল। নিজের জ্ঞানের সবটুকু উজাড় করে ভারতের নাম উজ্জ্বল করেছিলেন যে নক্ষত্র তাঁর কপালে জুটল পুলিশের গোয়েন্দা দপ্তরের জিজ্ঞাসাবাদের নামে বীভৎস মার। কখনও বিছানায় বেঁধে, আবার কখনো উল্টো করে ঝুলিয়ে। ৩০ ঘণ্টা একটানা দাঁড়িয়ে দিয়ে গেছেন প্রশ্নের উত্তর। এমনকি লাই ডিটেক্টরও ব্যবহার করা হয়েছিল, তবে তার কোনও ফলাফলই কিন্তু কোর্ট অবধি এসে পৌঁছয়নি।

এখানেই শেষ নয়, তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় এক ‘হাই সিকিউরিটি’র জেলখানায়। সেখানে তাঁর আলাপ হয় এক ভয়ঙ্কর সিরিয়াল কিলার এর সঙ্গে। সেই খুনে মানুষটিও বুঝে যান নাম্বি নির্দোষ। হায় রে আমার দেশ! জ্ঞানীদের এ হেন কদরের গল্প অবশ্য আরও অনেক আছে। গোয়েন্দাদের প্রায় সবাইকেই তিনি বুঝিয়েছিলেন আমাদের মহাকাশ গবেষণা এখনও শিশু স্তরে, তাই ইসরোর সত্যি তাঁকে প্রয়োজন। তাঁকে ফাঁসিয়ে আসলে এই গবেষণা প্রকল্পকেই পিছিয়ে দেওয়ার চক্রান্ত চলছে। কিন্তু তাতেও চিড়ে ভেজেনা। আরও পঞ্চাশ দিনের বন্দি-দশা শেষে তাঁকে আবার কোর্টে তোলা হয়। হাজার হাজার মানুষ তাঁকে ঘিরে গুপ্তচর আর বিশ্বাসঘাতক-এর স্লোগান দিতে থাকে। নাম্বির শরীরে শেষ জীবনীশক্তিটুকু যেন এখানেই কেউ নিংড়ে নেয়।

শুনুন…

লেখা: অনীশ ভট্টাচার্য
পাঠ: শঙ্খ বিশ্বাস
আবহ: শঙ্খ বিশ্বাস

পোল