যাঁরা স্বেচ্ছায় সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন, তাঁরা তো খুব ভালোমতন জানেন যে এ ধরণের কর্মক্ষেত্রে সবচাইতে ভয়াবহ পরিণতি কী হতে পারে। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে যাতে নিজের প্রাণ বাঁচানোর কথা না ভেবে সাধারণ জনগণের রক্ষা করতে পারেন, সেইমতোই কঠোর প্রশিক্ষন পর্ব পেরোতে হয় তাঁদের। তা সত্ত্বেও বাড়ির আরামে শান্তির জীবন কাটানোর বদলে দেশরক্ষায় এগিয়ে যান তাঁরা।
‘যারা যুদ্ধ চায়, তারা যুদ্ধে যায় না। যারা যুদ্ধে যায়, তারা যুদ্ধ চায় না’ – এ-কথা প্রায়শই শোনা যায়। সোশ্যাল মিডিয়া অথবা টেলিভিশনের অপর প্রান্তে বসে যারা ‘যুদ্ধ চাই’ মর্মে পরপর যুক্তি সাজিয়ে ফেলেন, দেখা যায় বাস্তবে যুদ্ধের ভয়াবহতা সম্পর্কে তাঁরা খুব একটা অবগত নন। তবে যাঁরা যুদ্ধে যান, অর্থাৎ স্বেচ্ছায় সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন, তাঁরা তো খুব ভালোমতন জানেন যে এ ধরনের কর্মক্ষেত্রে সবচাইতে ভয়াবহ পরিণতি কী হতে পারে। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে যাতে নিজের প্রাণ বাঁচানোর কথা না ভেবে সাধারণ জনগণের রক্ষা করতে পারেন, সেইমতোই কঠোর প্রশিক্ষণ পর্ব পেরোতে হয় তাঁদের। তা সত্ত্বেও বাড়ির আরামে শান্তির জীবন কাটানোর বদলে দেশরক্ষায় এগিয়ে যান তাঁরা। বাস্তবে কী কারণ রয়েছে এর পিছনে?
কেন একথা বলছি, সে প্রসঙ্গে ফেরা যাক। সোশাল মিডিয়ায় ভাইরাল এক ভিডিও। দেখা যাচ্ছে, এক কিশোর, গলায় বেশ কয়েকটা মালা, কোথায় যেন রওনা দিচ্ছে। ভিডিও একটু এগোলেই বোঝা যায়, সেই বিশেষ কাজ দেশমাতৃকার সেবা। অর্থাৎ তিনি সেনা প্রশিক্ষণে যোগ দিতে যাচ্ছেন। ভারত-পাক অশান্তির আবহে সেনায় যোগ দিতে যাওয়া ছেলেকে নিয়ে যথারিতি আবেগে ভেসেছে তার গোটা গ্রাম। পরিবার তো বটেই, ছল ছল চোখ নিয়ে দাঁড়িয়ে বাকিরাও। যেন যুদ্ধে যাওয়ার আগে শেষবারের মতো সকলের সঙ্গে দেখা। ওই ভিড়ে হয়তো তাঁর স্কুলের শিক্ষক রয়েছেন, কিংবা ছোটবেলার বন্ধুরা। এঁরা সবাই গ্রামের ছেলের জন্য গর্বিত। পাশাপাশি সেই গর্বের আড়ালে লুকিয়ে আছে চাপা কান্না।
সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী ভাইরাল ভিডিওর ওই যুবকের নাম মনোরঞ্জন। বাড়ি এই বাংলায়। অন্য কোনও সময় হলে হয়তো তার এই ভিডিও সেভাবে চর্চায় উঠে আসত না। তবে বর্তমান সময়টা বড় অস্থির। বড় অশান্ত। সেখানে সেনার প্রশিক্ষণে যোগ দিতে যাওয়াটা বড্ড ঝুঁকির। তাই এমন ঘটনা হলে, ভিড় করে আসে প্রশ্ন। সেই প্রশ্নের ভিড়েও প্রাসঙ্গিক হয়েছে এই ভিডিও। হয়তো মনোরঞ্জন সুস্থ স্বাভাবিক হয়েই আবার ফিরবেন তাঁর গ্রামে। কিন্তু সেই নিশ্চয়তা কে দেবে? খোদ মনোরঞ্জনের কাছেও জীবনের নিশ্চয়তা নেই। তাই এমন পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে তাঁর ‘অগ্নিবীর’ হতে চাওয়ার ইচ্ছে, ভাবতে বাধ্য করছে নেটদুনিয়াকে।
ভারত-পাক অশান্তির আবহে গোটা দেশ জুড়েই যুদ্ধ-যুদ্ধ রব শোনা গিয়েছিল। প্রতি মুহূর্তে চাঞ্চল্যকর খবর, তা সে যতই ভুয়ো হোক, নতুন চর্চার জন্ম দিয়েছে। কেউ কেউ প্রায় ঘোষণা করে দিয়েছিলেন, দুই প্রতিবেশী দেশ ভয়ঙ্কর যুদ্ধে রত। অথচ প্রথম থেকেই কেন্দ্রের তরফে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা চালানো হয়েছে। কিন্তু সংঘাত-সংঘর্ষের প্রভাব যে কখনওই কোনও নির্দিষ্ট এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। শুধুই যে ক্ষয়ক্ষতি তা নয়, অশান্তির আবহে বড় সমস্যা হয়ে উঠতে পারে মূল্যবৃদ্ধি। এছাড়াও নানান সামাজিক অসুবিধের মধ্যে পড়তে হতে পারে আপামর দেশবাসীকে। তাই সামগ্রিক বিষয়টা নিয়ে চর্চা চলছে, চলবেও।
এই আবহে মনোরঞ্জনরা বুঝিয়ে দেন, দেশাত্মবোধ এক এমন অনুভূতি, যার সামনে মানুষের ব্যক্তিগত চাহিদা নেহাতই অহেতুক। একবার যখন যে কষ্টসাধ্য প্রশিক্ষণ পর্বটি পার করে দেশসেবার জন্য যোগ্য হিসেবে গণ্য হয়, তখন আপনা থেকেই জয়ীর গর্ব অনুভব করতে পারে। নিজের প্রাণ বাজি রেখে সমগ্র দেশবাসীর স্বাধীনতা নিশ্চিত করাই তখন তার মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়। দেশের হয়ে যেকোনও যুদ্ধে জয়লাভ একাধারে তার ব্যক্তিগত জয় বলেও প্রতিপন্ন হয় তার কাছে। তবে বাস্তবজীবন তো আর পোয়েটিক জাস্টিস-এর ধার ধারে না। তাই বীররস সমৃদ্ধ সব রকমের তত্ত্বের মাঝে দাঁড়িয়েও সাধারণ মানুষের আর্থিক অসহায়তার কথা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। অনেকক্ষেত্রেই সাধারণ নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তানেরা কেবলমাত্র আর্থিক নিশ্চয়তার কথা ভেবে সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। বাড়িতে থাকা অন্যান্য সদস্যদের খাদ্যের নিশ্চিত সংস্থান হবে আর পাড়ায় প্রতিবেশীদের কাছে সম্মান বাড়বে, এ কথা মাথায় রেখে এগিয়ে যান তাঁরা। সে অবস্থায় তার লক্ষ্য কেবলমাত্র কর্মসংস্থানের দিকেই থাকে। ফলে এমন পরিস্থিতিতে উদ্দেশ্যগত দিক থেকে অন্য কোনও চাকরিজীবীর সঙ্গে তফাত থাকে না সে মানুষটির।