যে দেশে নিজে বড় হয়েছেন, সন্তানদের সেখানে বড় করতে চান না। এমনটা ভারতীয়দের গড় ধারণা হতেই পারে। কিন্তু মার্কিন মুলুকের কেউ যদি এমনটা ভাবেন? এমনকি এক্ষেত্রে ভারতকেই সন্তানদের বড় করার উপযুক্ত জায়গা হিসেবে বেছে নিতে চেয়েছেন তিনি। ঠিক কেন ভাবনা? আসুন শুনে নেওয়া যাক।
তাঁর সন্তানদের ‘মানুষ’ করতে, ভারতই সবচেয়ে যোগ্য বলে মনে করছেন এক বিদেশিনী মা। শুধু মনে করছেন তাই নয়, নিজের বক্তব্যের স্বপক্ষে এক লম্বা-চওড়া পোস্ট-ও করেছেন সোশ্যাল মিডিয়ায়। আর তাই দেখেই অবাক হয়েছেন নেটনাগরিকেরা। কারণ সত্যিই তো, এমন কথা কাউকেই সচরাচর বলতে শুনি না আমরা।
এ কথা বললে ভুল হয় না যে, বর্তমানে ভারতের অনেকেই মনে করেন যে, এ দেশে পাকাপাকিভাবে থেকে যাওয়ার চাইতে বাইরের কোনও দেশে গিয়ে নতুন করে জীবন শুরু করা অনেক ভালো। বিশেষত আমেরিকা কিংবা ইউরোপের দেশগুলিতে। সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতে এখন বাড়ি বসেই আমরা দেখতে পেয়ে যাই প্রথম বিশ্বের এই দেশগুলির মনোরম পথঘাট, অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, কিংবা ভিন্নস্বাদের লোভনীয় সব খাবারদাবার। তবে আকর্ষণের মুখ্য কারণ এটি হলেও, পাশ্চাত্যের দেশগুলির সামাজিক সুযোগসুবিধা, পড়াশুনো ও উন্নতমানের কর্মসংস্থানের সুযোগ সেগুলিকে ভারতীয়দের পছন্দের তালিকায় স্থায়ী জায়গা দিয়েছে।
তবে এমন ধারণা যে কেবল এ দেশের মানুষের, তা কিন্তু নয়। ইউরোপ-আমেরিকার বাসিন্দারা বরাবরই সদর্পে নিজেদের অবস্থান ভারতের চাইতে অনেক উঁচু আসনে বলে দাবি করেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় জানান দেন যে তাঁদের মতে, ভারতের মতন অপরিচ্ছন্ন আর অসুরক্ষিত দেশ দুটি হয় না! এমতাবস্থায় যদি কোনও মার্কিনী মা লেখেন যে তিনি সন্তান প্রতিপালনের উপযোগী হিসেবে ভারতবর্ষকেই বেছে নিয়েছেন, তখন একঝাঁক সপ্রশ্ন দৃষ্টি তাঁর ঘিরে ধরে বৈকি! আর তাই জন্যই বিগত কয়েক বছর ধরে ভারতের অস্থায়ী বাসিন্দা ক্রিস্টেন ফিসচার নামের এই তরুণী কেবল সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিয়েই ক্ষান্ত হননি। তাঁর নাতিদীর্ঘ পোস্ট-টি পড়লেই বোঝা যায়, ভারতের প্রতি তাঁর এমন পক্ষপাতিত্ব কেন।
ক্রিস্টেন তাঁর পোস্ট-টিতে বলেন যে, অন্য কোনও দেশেই ভারতবর্ষের মতন এতরকম ভিন্ন ধরণের সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন দেখতে মেলে না। এখানে বাস করলে মানুষ নিজের ক্ষুদ্র গণ্ডির বাইরে বেরিয়ে অন্যের ধর্ম-সংস্কৃতির প্রতিও শ্রদ্ধাশীল হয়। ফলত, শিশুটি মুক্তমনা হয় এবং যেকোনও প্রতিকূল পরিস্থিতিতে দ্রুত অভিযোজন করতে শেখে। দ্বিতীয়ত, ভারতে বহু ভাষাভাষী মানুষের বাস। ফলে ইংরেজি ছাড়াও স্থানীয় ভাষাগুলি সম্পর্কেও ধারণা লাভ করে শিশুরা। আলাদা কোনও প্রচেষ্টা ছাড়াই তাদের ‘কমিউনেশন স্কিল’ দৃঢ় হয়, যা ব্যক্তিজীবন বা কর্মজীবন, সবেতেই কাজে লাগে। ভারতকে বেছে নেওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে ক্রিস্টেন বলেন, এখানকার পরিবারগুলির আভ্যন্তরীণ বন্ধন রীতিমত লক্ষ্যনীয় বিষয়। আগের চাইতে সংখ্যায় অনেক কমে গেলেও এখনও এখানে জয়েন্ট ফ্যামিলি দেখা যায়। এমনকি এক বাড়িতে না থাকলেও মামা-মাসি-কাকা-পিসিদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে ভালোবাসে এখানকার মানুষ, যেকোনও অনুষ্ঠানে একত্রিত হয়ে তা উদযাপন করে। এমন নিদর্শন পাশ্চাত্যের দেশগুলিতে সত্যিই বিরল।
রবি ঠাকুর লিখেছিলেন ‘নদীর এপার কহে ছাড়িয়া নিশ্বাস, ওপারেতে সর্বসুখ আমার বিশ্বাস’। তরুণীর এই পোস্ট সে কথাকেই মনে করায়। ভিনদেশের এক তরুণী প্রশংসা করছেন সেই ভারতের, যা পিছনে ফেলে তরুণীর জন্মস্থানটিতেই গিয়ে বসতি গড়তে চান এখানের বাসিন্দারা। এমনটাও নয় যে অল্পদিনের অভিজ্ঞতায় বিভোর হয়ে ক্রিস্টেন এমনটা বলছেন। ভারতীয় জীবনে প্রসন্ন হয়েই তাঁর এমন সিদ্ধান্ত। এই ঘটনাটি যেন দু’দণ্ড থমকে ভাবতে বলে আমাদের। নদীর পারের কোন ঘাস বেশি সবুজ, তা জরিপ করবার বদলে যেখানে আছি, সেখানকার যা কিছু ভালো, তার প্রতি মুহূর্তখানেকের জন্য হলেও কৃতজ্ঞ হতে শেখায়।