গল্প: কালাচাঁদের ছবি – সুকুমার রায়

Published by: Sohini Sen |    Posted: March 28, 2021 4:26 pm|    Updated: March 28, 2021 4:26 pm

Published by: Sohini Sen Posted: March 28, 2021 4:26 pm Updated: March 28, 2021 4:26 pm

কালাচাঁদ নিধিরামকে মারিয়াছে– তাই নিধিরাম হেডমাস্টার মশায়ের কাছে নালিশ করিয়াছে। হেডমাস্টার আসিয়া বলিলেন, “কি হে কালাচাঁদ, তুমি নিধিরামকে মেরেছ?” কালাচাঁদ বলিল, “আজ্ঞে না, মারব কেন? কান মলে দিয়েছিলাম, গালে খামচিয়ে দিয়েছিলাম, আর একটুখানি চুল ধরে ঝাঁকিয়ে মাটিতে ফেলে দিয়েছিলাম।” হেডমাস্টার মহাশয় বলিলেন, “কেন ওরকম করেছিলে?” কালাচাঁদ খানিকটা আমতা আমতা করিয়া মাথা চুলকাইয়া বলিল, “আজ্ঞে, ও খালি খালি আমায় চটাচ্ছিল।” হেডমাস্টার মশাই জিজ্ঞাসা করিলেন, “তোমায় মেরেছিল?” “না।” “ধমকিয়েছিল?” “না।” “তবে” “বারবার ঘ্যান্‌‌ ঘ্যান্‌‌ করে বোকার মত কথা বলছিল, তাই, আমার রাগ হয়ে গেল।” হেডমাস্টার মশাই তাহার কান ধরিয়া বেশ ভালোরকম নাড়াচাড়া দিয়া বলিলেন, “মেজাজটা এখন থেকে একটু সংশোধন করতে চেষ্টা কর।”

ছুটির পর আমরা জিজ্ঞাসা করিলাম, “হ্যাঁরে কালাচাঁদ, তুই খামকা ঐ নিধেটাকে মারতে গেলি কেন?” কালাচাঁদ বলিল, “খামকা মারব কেন? কেন মেরেছিলাম ওকেই জিজ্ঞাসা কর না!” নিধেকে জিজ্ঞাসা করিতে সে বলিল, “খামকা নয় তো কি? তুই বাপু ছবি এঁকেছিস তার কথা আমায় জিগ্‌‌গেস করতে গেলি কেন? আর যদি জিগ্‌‌গেস করলি, তাহলে তাই নিয়ে আবার মারামারি করতে এলি কেন?” আমরা বলিলাম, “আরে কি হয়েছে খুলেই বল না কেন।”
নিধিরাম বলিল, “কালাচাঁদ একটা ছবি এঁকেছে, ছবির নাম– খাণ্ডব দাহন। সেই ছবিটা আমায় দেখিয়ে ও জিগ্‌‌গেস করল, ‘কেমন হয়েছে?’ আমি বললাম, ‘এটা কি এঁকেছ? মন্দিরের সামনে শেয়াল ছুটছে?’ কালাচাঁদ বলল, ‘না, না, মন্দির কোথায়? ওটা হল রথ। আর এগুলো তো শেয়াল নয়– রথের ঘোড়া।’ আমি বললাম, ‘সূর্যটাকে কালো করে এঁকেছ কেন? আর ঐ চামচিকেটা লাঠি নিয়ে ডিগবাজি খাচ্ছে কেন?’ কালাচাঁদ বলল, ‘আহা তা কেন? ওটা সূর্য নয়, সুদর্শন চক্র। দেখছ না কৃষ্ণের হাতে রয়েছে? আর তালগাছ কোথায় দেখলে? ওটা তো অর্জুনের পতাকা! আর ঐগুলোকে বুঝি পদ্মফুল বলছ? ওগুলো দেবতা– খুব দূরে আছেন কিনা তাই ছোট ছোট দেখাচ্ছে। আর এই বুঝি চামচিকে হল, ওটা তো গরুড়পাখি!’ ‘আচ্ছা, ঐ কালো কাপড় পড়া মেয়েমানুষটি যে ওদের মারতে আসছে ওটি কে?’ কালাচাঁদ বলল, ‘তুমি তো আচ্ছা মুখ্যু হে! ওটা গাছে আগুন লেগে ধোঁয়া বেরুচ্ছে বুঝতে পারছ না? অবাক করলে যে!'”
“তখন আমি বললাম, ‘আচ্ছা এক কাজ কর না কেন ভাই, ওটাকে খাণ্ডব দাহন না করে সীতার অগ্নিপরীক্ষা কর না কেন? ঐ গাছটাকে শাড়ি পরিয়ে সীতা করে দাও। ঐ রথটার মাথায় জটা-টটা দিয়ে ওকে অগ্নিদেব বানাও, কৃষ্ণ অর্জুন আছেন তাঁরা হবেন রাম লক্ষ্মণ। আর ঐ সুদর্শন চক্রে নাক হাত পা জুড়ে দিলেই ঠিক বিভীষণ হয়ে যাবে। তারপর চামচিকের পিছনে একটা লম্বা ল্যাজ দিয়ে তার ডানা দুটো মুছে দাও– ওটা হনুমান হবে এখন।’ কালাচাঁদ বলল, ‘হনুমানও হতে পারে, নিধিরামও হতে পারে।'”
“আমি বললাম, ‘তাহলে ভাই, আর এক কাজ কর। ওটাকে শিশুপাল-বধ করে দাও। তাহলে কৃষ্ণকে বদলাতে হবে না। চক্র তুলে শিশুপালকে মারতে যাচ্ছেন। অর্জুনের মুখে পাকা গোঁফ দাড়ি দিয়ে খুব সহজেই ভীষ্ম করে দেওয়া যাবে। আর রথটা হবে সিংহাসন, তার উপর যুধিষ্ঠিরকে বসিয়ে দিও। আর ঐ যে গরুড় আর সাপ, ঐটে একটু বদলিয়ে দিলেই গদা হাতে ভীষ্ম হয়ে যাবে। আর শিশুপাল তো আছেই– ঐ গাছটাকে একটু নাক-মুখ ফুটিয়ে দিলেই হবে। তারপর রাজসূয় যজ্ঞের কয়েকটা রাজাকে দেখালেই বাস্‌‌!'”
বাকিটা শুনে নিন…

লেখা: সুকুমার রায়
পাঠ: কোরক সামন্ত
আবহ: শঙ্খ বিশ্বাস

পোল