বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়-এর গল্প: ভূত

Published by: Susovan Pramanik |    Posted: May 16, 2021 5:44 pm|    Updated: May 16, 2021 5:44 pm

Published by: Susovan Pramanik Posted: May 16, 2021 5:44 pm Updated: May 16, 2021 5:44 pm

মাস্টার তো নয়, সাক্ষাৎ যম। বেতের বহর দেখলে পিলে চমকে যায় আমাদের। টিফিনের সময় মাস্টার মশায়রা সব ঘুমুতেন। আমরা নিজের ইচ্ছেমতো মাঠে-বাগানে বেড়িয়ে ঘন্টাখানেক পরেও এসে হয়তো দেখি তখনও মাস্টার মশায়দের ঘুম ভাঙেনি। সুতরাং তখন আমাদের টিফিন শেষ হল না। টিফিনের মানে হচ্ছে ছুটি মাস্টার মশায়দের, ঘুমুবার ছুটি।

সেদিনও এমনি হল।

রেল লাইন আমাদের স্কুল থেকে অনেক দূরে। আমরা মাতলার পুল বেড়িয়ে এলাম, রেল লাইন বেড়িয়ে এলাম— ঘণ্টাখানেক পরে এসেও দেখি এখন হাঁটি-বেচা মাস্টারের নাক ডাকছে। নারাণ বললে–ওরে চুপ চুপ, চেঁচামনি, চল ততক্ষণ পরামানিকদের বাগানে বাদাম খেয়ে আসি—

আমাদের দলে সবাই মত দিলে।

আমি বললাম-বাদাম পাড়া সোজা কথা—তলায় কত পড়ে থাকে এ সময়

—চল তো দেখি—

এইবার আমরা সবাই মিলে পরামানিকদের বাগানে ঢুকলাম পুলের তলার রাস্তা দিয়ে। দুপুর দুটো, রোদ ঝম্ ঝম্ করচে। শরৎকাল, রোদের তেজও খুব বেশি।

 

গত বর্ষায় আগাছার জঙ্গল ও কাঁটা ঝোপের বেজায় বৃদ্ধি হয়েছে বাগানের মধ্যে। জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে সুঁড়ি পথ। এখানে ওখানে মোটা লতা গাছের ডাল থেকে নেমে নীচেকার কোপের মাথায় দুলচে। আমরা এ বাগানের সব অংশে যাইনি, মস্ত বড় বাগানার। পাকা রাস্তা থেকে গিয়ে নদীর ধার পর্যন্ত লম্বা।

 

পেয়ারাও ছিল কোনো কোনো গাছে। কিন্তু অসময়ের পেয়ারা তেমন বড় হয়নি। ফল আরও যদি কোনো রকম কিছু থাকে খুঁজতে খুঁজতে নদীর ধারের দিকে চলে গেলাম। বাদাম তো মিললোই না, যা বা পাওয়া গেল, ইট দিয়ে ছেঁচে তার শাঁস বের করবার ধৈর্য আমার ছিল না। সুতরাং দলের সঙ্গে আমার ছাড়াছাড়ি হয়ে গেল। নদীর দিকে বন বোয় ঘন। এপিকে বড় একটা কেউ আসে না।

খস্ খস্ শব্দে শুকনো পাতার ওপর দিয়ে শেয়াল চলে যাচ্ছে। কুল্লো পাখি ডাকচে উঁচু তেঁতুল গাছের মাথায়। আমার যেন কেমন ভয়-ভয় করচে।

আমাদের স্কুলের ছেলেরা কানে হাত দিয়ে গায়—

ঠিক দুক্ খুর বেলা—

ভূতে মারে ঢ্যালা—

ভূতের নাম রসি—

হাঁটু গেড়ে বসি—

সঙ্গে সঙ্গে তারা অমনি হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে। এসব করলে নাকি ভূতের ভয় চলে যায়।

 

আমার সঙ্গে কেউ নেই–ঠিক দুপুর বেলাও বটে। মন্তরটা মুখে আউড়ে হাঁটু গেড়ে বসবো? কিন্তু ভূতের নাম রসি হল কেন, শ্যামও হতে পারতো, কালো হতে পারতো, নিবারণ হতেই বা আপত্তি কি ছিল?

একটা বাঁক ঘুরে বড় একটা বাঁশবন আর নিবিড় ঝোপ তার তলায়।

সেখানটায় গিয়ে আমার বুকের ঢিপ ঢিপ শব্দ যেন হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল।

একটা আমড়া গাছের তলায় ঘন ঝোপের মধ্যে আমড়া গাছের গুঁড়ি ঠেস দিয়ে ভালো করে উকি মেরে দেখলাম। হ্যাঁ, ঠিক–বরো বাগদিনীই বটে, সর্বনাশ!

সে যে মরে গিয়েছে।

তারপর? শুনুন…

লেখা: বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
পাঠ: শঙ্খ বিশ্বাস
আবহ: শঙ্খ বিশ্বাস

পোল