ট্রেন ছাড়ার আগের মুহূর্তে সিগারেটের প্যাকেটের মধ্যে গীতিকার লিখলেন কালজয়ী বাংলা গানের ক্লাইম্যাক্স

Published by: Susovan Pramanik |    Posted: May 13, 2021 6:26 pm|    Updated: May 13, 2021 10:54 pm

Published by: Susovan Pramanik Posted: May 13, 2021 6:26 pm Updated: May 13, 2021 10:54 pm

আবার সেই ‘ডাউন মেমরি লেন’। আবার সেই মায়াময় স্মৃতিঘেরা কলকাতা। ব্যস্ত মহানগরীর বুকে কোনও এক দুপুর তখন চেষ্টা করছে তার আলস্যকে এখানে ওখানে ছড়িয়ে দিতে। বাংলার সেই বিখ্যাত গীতিকার তখন আধশোয়া হয়ে হাতে ধরা সিগারেটে আরাম করে টান দিচ্ছেন। এমন সময়ই এলো সেই চ্যালেঞ্জটা – “আচ্ছা কাকু, এমন একটা গান লিখতে পারবেন যাতে বাঙালির আড্ডার কথা থাকবে। নস্টালজিয়া থাকবে। সেই গানের ভাষা হবে আরও বাস্তবের কাছাকাছি। এপ্রোচ হবে রিয়ালিস্টিক। পারবেন?” গীতিকার সোজা হয়ে বসলেন। যিনি কথাটা বলছেন, তার গলায় মিশে থাকা চ্যালেঞ্জের সুরটা তিনি বিলক্ষণ ধরতে পারছেন। এই চ্যালেঞ্জটা কে করছে? করছে এমন একজন যাকে তিনি সেই হাফপ্যান্ট পরা অবস্থা থেকে দেখেছেন। যাকে তিনি খোকা বলে ডাকেন। সিগারেটে শেষ টান দিয়ে, একদম সোজা হয়ে বসে কিছুক্ষন খোকার দিকে তাকিয়ে রইলেন গীতিকার। উল্টোদিকে চুপ করে বসে তখন মিটিমিটি হাসছে খোকা, অর্থাৎ সুপর্ণকান্তি ঘোষ। প্রবাদপ্রতিম সুরকার নচিকেতা ঘোষের সুযোগ্য পুত্র।

সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে গান লিখলেন গীতিকার। আশির দশকের কলকাতার বুকে কোন এক দুপুরে সেদিন আসলে গান নয়, ইতিহাস রচনা করেছিলেন গীতিকার গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার। কিন্তু ভীষন ভালোবাসার ও শ্রদ্ধার গৌরিকাকুর লেখা গানটা, খোকা অর্থাৎ সুপর্ণকান্তিকে পুরোপুরি খুশি করতে পারলনা।কিছু একটা যেন মিসিং। একটা কিছুর অভাব থেকে যাচ্ছে। অসাধারণভাবে গানটা শুরু হয়েছে।বাঙালির আড্ডা আর কুয়াশার মতো নস্টালজিয়া যেন জড়িয়ে রয়েছে প্রতিটি লাইনে। বাংলা গানে এক নতুন এপ্রোচ। কিন্তু গানটার মধ্যে একটা ক্লাইম্যাক্স চাই।কথাটা গৌরিকাকুকে বলেই ফেলেন সুপর্ণ।শুরু হলো তর্ক। গৌরিবাবু বলছেন- গান এখানেই শেষ।  সুপর্ণ- ক্লাইম্যাক্স চাই, এরকম ফ্ল্যাট এন্ডিং হলে চলবে না। তর্কের মীমাংসা সেদিন অবশ্য হয়নি।সেটা হয়েছিল আরও কিছুদিন পর, হাওড়া স্টেশনে। ক্যান্সারের চিকিৎসার জন্য মাদ্রাজ যাচ্ছিলেন গৌরীপ্রসন্ন। ট্রেন ছাড়তে আর মাত্র কয়েক মিনিট বাকি।গৌরিকাকুকে ট্রেনে তুলে দিতে সেদিন স্টেশনে উপস্থিত সুপর্ণকান্তিও। এমন সময় প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে থাকা খোকার দিকে হাত বাড়িয়ে দিলেন গৌরিকাকু।বলে উঠলেন: “খোকা, এই নে তোর সেই ক্লাইম্যাক্স”। অবাক হয়ে গেলেন সুপর্ণকান্তি।

গৌরিকাকু একটা সিগারেটের প্যাকেট ছিড়ে তার ভেতরের সাদা অংশে লিখে দিয়েছেন ক্লাইম্যাক্স। লাইনগুলোর দিকে তাকালেন সুপর্ণ।তার বুক যেন ধক করে উঠল। মিস হয়ে গেল হার্টবিট। কি লিখেছেন গৌরিকাকু। কি করে লিখলেন- “সেই সাতজন নেই আজ/টেবিলটা তবু আছে সাতটা পেয়ালা আজও খালি নেই/একই সে বাগানে আজ/এসেছে নতুন কুঁড়ি/শুধু সেই সেদিনের মালি নেই..”। চশমা খুলে গৌরিকাকুর দিকে তাকালেন সুপর্ণ।

তাঁর মুখে তখন অপার প্রাপ্তির হাসি। যা চাই ছিলেন তার বেশিই পেয়েছেন। উত্তেজিত কণ্ঠে সুপর্ণ বলে উঠলেন: “কাকু, আমি দারুণ সুর করব। একদম অন্যরকম। আপনি ফিরে এলেই শোনাব আপনাকে।” পুত্রসম সুপর্ণর দিকে তাকিয়ে স্নেহের হাসি হেসে হাত নাড়েন গৌরীপ্রসন্ন। ট্রেন ছেড়ে দেয়। তীক্ষ্ণ হুইসলের শব্দ। প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে এগিয়ে যায় এক্সপ্রেস ট্রেন। হাতে সেই সিগারেটের প্যাকেটের অংশটা ধরে সুপর্ণকান্তি ভাবতে থাকেন গৌরিকাকু ফিরে এলে তাক লাগিয়ে দেবেন। এমন একটা কম্পোজিশন করবেন যা আগে কখনও হয়নি। সত্যিই, তাই করেছিলেন সুপর্ণকান্তি। কিন্তু ফিরে আসেননি গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার। খোকার তাক লাগানো কম্পোজিশনটা শোনার জন্য তিনি আর ফিরে আসেননি।

শুনুন…

লেখা: অনুরাগ মিত্র
পাঠ: শঙ্খ বিশ্বাস
আবহ: শঙ্খ বিশ্বাস

পোল