ডাল-ভাতের জোগান না থাকলে সাহিত্য করতে আসা উচিত নয়, মনে করতেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়

Published by: Sankha Biswas |    Posted: February 19, 2021 7:40 pm|    Updated: February 19, 2021 7:40 pm

Published by: Sankha Biswas Posted: February 19, 2021 7:40 pm Updated: February 19, 2021 7:40 pm

১৯৫০। কমিউনিস্টদের ওপর নেমে এল চূড়ান্ত সরকারি দমননীতি, পত্রপত্রিকায় মানিকের লেখা ছাপানো বন্ধ করে দেওয়া হল। নেমে এল অন্ধকার দিন। যন্ত্রণা ভুলতে মদ বাড়ছিল মানিকের, সঙ্গে বাড়ছিল ক্ষয়। শরীর আর মনের ক্ষয়। এই সময়েই জানা গেল অতিরিক্ত মদ্যপানের দরুন লিভার নষ্ট হয়ে যেতে বসেছে মানিকের। যে মানিক একদিন সদর্পে ঘোষণা করেছিলেন আমি শুধু সাহিত্যিকই হব, সেই মানিকই অস্ফুটে এইসময়ে একদিন বলেছিলেন, ‘দেখো, দুটি ডাল-ভাতের সংস্থান না রেখে বাংলাদেশে কেউ যেন সাহিত্য করতে না যায়।’

১৯৫৬। এইসময় ঘনঘন জ্ঞান হারিয়ে ফেলতেন মানিক। বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ লেখকের শেষদিনটি ক্রমশ ঘনিয়ে আসছিল। ৩০ নভেম্বর, মানিক জ্ঞান হারালেন। ২ ডিসেম্বর, সম্পূর্ণ অচেতন অবস্থায় ঘরে পড়ে রয়েছেন মানিক। তাঁকে নিয়ে যাওয়া হবে হাসপাতালে। এমন অসুস্থতার খবর পেয়ে ছুটে এলেন মানিকের বন্ধু কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়। লেখকপত্নীকে অনুযোগ করে সুভাষ মুখোপাধ্যায় বললেন, ‘বৌদি এমন অবস্থা, আগে টেলিফোন করেননি কেন?’

ম্লান হেসে কমলাদেবী উত্তর দিলেন, ‘তাতে যে পাঁচ আনা পয়সা লাগে ভাই।’

সেটুকুও নেই যে ঘরে!

অরেক বন্ধু, শেষযাত্রার সঙ্গী দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় সেই মুহূর্তটির মর্মস্পর্শী বিবরণ দিতে গিয়ে যা লিখেছনে, আসুন তাঁর বয়ানেই শুনে নেওয়া যাক: ‘খাট থেকে ধরাধরি করে যখন নামানো হল, তখন দুটি চোখই খোলা। কপালের ওপর আর কানের পাশে কয়েকটা শিরা কুঁচকে উঠেছে। ডান হাতটা প্রতিবাদের ভঙ্গিতে একবার নাড়লেন। চাউনিতেও তীব্র প্রতিবাদ। গলায় অস্ফুট শব্দ, যার কোন ভাষা নেই কিন্তু যন্ত্রণা আছে।…

মিউনিসিপ্যালিটির ভাঙা অ্যাম্বুলেন্স এল। যে মানুষটাকে খাট থেকে নামালে হার্ট ফেল করার সম্ভাবনা, তাঁকে এই গাড়িতেই নীলরতন সরকার হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। অর্থাভাবে ভাল গাড়ি আর মুরুব্বির অভাবে বড় হাসপাতালের ব্যবস্থা করা যায় নি।

প্রচণ্ড ঝাঁকুনি দিয়ে গাড়ি ছাড়ল। মেঝেতে স্ট্রেচারের ওপর তিনি শুয়ে।… ড্রাইভারকে আস্তে চালাতে বলা ছিল। আস্তে আর সাবধানে। অথচ গাড়িটা প্রায় বাতিলের পর্যায়ে পড়ে। রাস্তাও খারাপ। থেকে থেকে ঝাঁকুনি লাগছে। সকলে একবার চমকে মানিকবাবুর মুখের দিকে তাকাচ্ছেন। তারপর ছোট্ট এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে মুখ ঘুরিয়ে নিচ্ছেন।

মৃত্যুর এত কাছে এর আগে আমি আসি নি।… বরানগর থেকে মৌলালি। কি দীর্ঘ সেই যাত্রা আর কি ভয়ংকর। স্পষ্ট বুঝছিলাম আস্তে আস্তে তাঁর জ্বরতপ্ত শরীরের উত্তাপ কমছে। আর আহ্‌, আমি বুঝছিলাম তিনি মরে যাচ্ছেন।… হাতটা আর নাড়ছেন না। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত নিশ্চল হয়ে গেছে।’

 

লেখা: সানু ঘোষ
পাঠ: শ্যামশ্রী সাহা ও শঙ্খ বিশ্বাস
আবহ: শঙ্খ বিশ্বাস

পোল