স্বৈরতন্ত্রের বিরোধিতার মাসুল হিসেবে ‘হম দেখেঙ্গে’র স্রষ্টা ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ-এর কপালে জুটেছিল নির্বাসন ও কারাবাস, গায়িকা ইকবাল বানো হয়েছিলেন নিষিদ্ধ

Published by: Susovan Pramanik |    Posted: April 26, 2021 6:30 pm|    Updated: May 8, 2021 11:05 am

Published by: Susovan Pramanik Posted: April 26, 2021 6:30 pm Updated: May 8, 2021 11:05 am

১৯৮০ সালে প্রকাশিত হয়েছিল ফয়েজ-এর কবিতার বই ‘মেরে দিল মেরে মুসাফির’ সেখানেই প্রথম ‘হম দেখেঙ্গে’ নাজমের প্রকাশ। ‘৭৭ সালে জিয়া উল হক ক্ষমতায় আসার পরই ‘পাকিস্তান পিপল’স পার্টি’কে সমর্থনের অপরাধে তাঁকে নজরবন্দী করা হয়। রাজনৈতিক আশ্রয়ের কারণে, তিনি পাকিস্তান ছাড়তে বাধ্য হন। রাজনৈতিক শরণার্থী হিসেবে তাঁর ঠাঁই হয়, বেইরুট-এ। সেখানে ৫৮-৭৯ সাল পর্যন্ত তিনি ‘লোটাস’ নামের একটি অ্যাফ্রো-এশিয়ান রাইটার্স অ্যাসসিয়েশনের ম্যাগাজিনের সম্পাদক ছিলেন, পারিশ্রমিক হিসেবে খুব যৎসামান্য পেতেন। ফয়েজ নিজের স্বদেশ পাকিস্তানের ইসলামিকরণ এবং ধর্মান্ধতা এবং গণতন্ত্রের ধ্বংসের প্রচেষ্টা যেমন দেখছিলেন, তেমন লেবানন এবং অন্যান্য দেশে প্যালেস্তানিদের কায়ক্লেশ যাপন প্রত্যক্ষ করছিলেন। সেইসব অভিজ্ঞতা তিনি কবিতার শরীরে বুনে দিয়েছিলেন এই বইয়ে।

বানো ‘৮১ সাল থেকেই ফয়েজ-এর অনেক কবিতা থেকে গান তৈরি করে নানা প্রকাশ্য অনুষ্ঠানে গাইতে থাকেন। বানো’র অন্যতম পছন্দের মানুষ এবং কবি ছিলেন ফয়েজ। ‘৮২ সালে লেবানন যুদ্ধ এবং অশক্ত শরীরের কারণে তিনি পাকিস্তান ফিরতে বাধ্য হন। কিন্তু শাসক তাঁকে রেয়াত করে না। বিরোধী স্বরের মানুষ, এবং কবি, যিনি মুক্তচিন্তা করেন, তাঁকে বাইরে রাখা বিপজ্জনক। অতএব আবার জেলে ভরা হয়। কিছুদিন পর মুক্তিও মেলে। ইতিমধ্যেই সাবেক সোভিয়েত রাশিয়ার লেনিন শান্তি পুরস্কারে ভূষিত হয়েছিলেন। কুড়িই ডিসেম্বর, ১৯৮৪-তে মৃত্যুর কিছুদিন আগেই তিনি  শুনেছিলেন, সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারের জন্য তাঁর নাম মনোনীত হয়েছিল।

আবার ফিরে আসি সেই দিনে, সেই বিশেষ অনুষ্ঠানের কথায়,

ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ-এর নাতি এবং তাঁর অনুমোদিত জীবনীর লেখক আলি মাদিহ হাশমি, সেই বিশেষ দিনে উপস্থিত ছিলেন। তিনি সেদিনের অভিজ্ঞতা জানিয়েছেন নানা সাক্ষাৎকারে,

‘সেদিনে সেই হলে তিলধারণের জায়গা ছিল না। প্রত্যেকেই এসেছিলেন ফয়েজ সাহাব আর ইকবাল বানো’র জন্য। আর ওই কালো অন্ধকার সময়ের মধ্যে যদি একটু আলোর দিশা পাওয়া যায়, এই আশায়। সিঁড়িতে লোকে-লোকারণ্য, মেঝেতে একটুও যাওয়ার জায়গা অবধিও নেই। যেখানে একটুকরো ফাঁক পেয়েছে, সেখানেই লোকজন দখল করে নিয়েছে। ইকবাল বানো মঞ্চে এলেন, জনতা উদ্বেল হয়ে তাঁকে অভিবাদন জানাতে লাগলেন। তিনি একের পর এক ফয়েজ-এর নানা কবিতাশ্রয়ী গজল গাইতে লাগলেন। তুমুল হর্ষধ্বনি শুরু হল যখন তিনি ‘হম দেখেঙ্গে’ গাওয়া শুরু করলেন। একেবারে শেষে তিনি এই গান শুরু করেছিলেন, এই গান দিয়ে সেদিনের নিবেদন শেষ করবেন, এমনই ইচ্ছে ছিল। কিন্তু জনতার নাছোড় দাবী আরও একবার, অন্তত একবার এই গান গাইতেই হবে। তাঁদের শিরায় ধমনীতে যেন আগুন লেগেছে উত্তেজনায় তাঁরা বুঁদ, নতুন দিনের ভোর দেখার জন্য তাঁরা উদগ্রীব, সেই তৃষ্ণায় আকুল এবং অস্থির। জনতার নাছোড়বান্দা অনুরোধে আবার শুরু হল গাওয়া, ‘হম দেখেঙ্গে’… সেদিনের আলহামরা হলের এক যন্ত্রপ্রকৌশলী গোপনে সেই দ্বিতীয়বারের গাওয়া গানটি রেকর্ড করেছিলেন, যা ইউটিউবে ইকবাল বানো’র গলায় গাওয়া হিসেবে এখন মেলে। এগারো মিনিট ত্রিশ সেকেন্ডের সেই গানের মধ্যে জনতার করতালি, অভিবাদন, উদ্বেলতা আর থেকে থেকে ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ ধ্বনির প্রাবল্যে সেদিন মনে হচ্ছিল আলহামরা হলের ছাদ উড়ে যাত্রা করবে…

সেই গানের স্মৃতি নিয়ে একনায়কতন্ত্রের পথে রুখে দাঁড়ানোর শপথ গোপনে এবং প্রকাশ্যে নিয়েছিলেন অনেকেই।

শুনুন…

লেখা: সুশোভন প্রামাণিক
পাঠ: অনুরণ সেনগুপ্ত
আবহ: শঙ্খ বিশ্বাস

পোল