গহীন বনের মধ্যে ভবানী পাঠক দেখা পেয়েছিলেন দেবী জয়চণ্ডীকে, সেই থেকে এখানে সপ্তমীর দিন শাক্তমতে পালিত হয় দোল

Published by: Susovan Pramanik |    Posted: March 29, 2021 2:22 pm|    Updated: March 29, 2021 2:22 pm

Published by: Susovan Pramanik Posted: March 29, 2021 2:22 pm Updated: March 29, 2021 2:22 pm

কাছেপিঠে কোন জনবসতি নেই। হিংস্র শ্বাপদসঙ্কুল এই ঘন অরণ্য। দিনেরবেলাতেও অনেকে এখানে আসার সাহস পায় না। সেখানে একাকী এই নারী কী করছেন? বৃদ্ধের মনের মধ্যে অসংখ্য প্রশ্ন আকুলিবিকুলি করতে লাগল।

– মা আপনি কে? কোথা হতে আসছেন?

তিনি বৃদ্ধের কথায় কোন ভ্রুক্ষেপ করলেন না। যেন কিছুই শুনতে পাননি। অথচ বৃদ্ধের সাথে তাঁর দূরত্ব মাত্র হাত খানেকের। শুনতে না পাওয়ার বিশেষ কোনও কারণও নেই। বরং তিনি এগিয়ে চলেছেন। তাহলে কি ইচ্ছাকৃতভাবে তাকে এড়িয়ে যাচ্ছেন ঐ নারী?

এত বড় দুঃসাহস! হাফপ্যান্ট পরা গোরা সিপাহীরা তাঁর নামে থর থর করে কাঁপে। জমিদাররা ভয়ে চিতপটাং হয়। তিনি স্বয়ং ভবানী পাঠক। আর তাকেই কিনা এই নারী অগ্রাহ্য করেন!!

রাগে, উত্তেজনায়, কৌতূহলে ভবানী পাঠক পিছু নিলেন সেই রহস্যময়ীর। গোধূলি সূর্য তখন শেষবেলার দিগন্তরেখার কাছে হাবুডুবু খাচ্ছে। লালচে আবহাওয়াটা ঈষৎ ধীরে অন্ধকারের দিকে ঢুলে পড়ছে। রহস্যময়ী ততক্ষণে একটা বড় আমগাছের পিছনের পুকুরে নেমে যাচ্ছেন। তাহলে কি আত্মাহুতি দিতে যাচ্ছেন ঐ নারী!! সেটা তিনি হতে দিতে পারেন না। ভবানী পাঠক আর দেরি করলেন না। তাঁকে বাঁচাতে ঝাঁপ দিলেন পুকুরে। কিন্তু কোথায় কি?

নিমেষে যা ঘটে গেল তাঁকে অবশ করে দিল। এ যেন জাদুর মায়া! ভোজবাজি!

জলজ্যান্ত মহিলা নিমেষেই গায়েব হয়ে গেলেন।

তাঁকে চেপে ধরতে গিয়ে ভবানী পাঠক পেলেন পাথরের একটি ছোট শিলাখণ্ড আর একটি ছোট দেবীবিগ্রহ। সেই দিনটি ছিল দোলযাত্রার ঠিক সাত দিন পরের সপ্তমী, অর্থাৎ সপ্তমদোল।

রাতে ভবানী পাঠক স্বপ্নে দেখলেন সেই নারী আসলে দেবী মঙ্গলচণ্ডী বা জয়চণ্ডী। তিনি তাঁকে পুজোর নির্দেশ দিলেন। সেই থেকেই প্রচলন হল পুজোর।

এমন গল্প শুনে যা ঝটকা খেয়েছিলাম, কী বলি!

বিশ্বাস, অবিশ্বাস, তক্ক-বিতক্ক— এ সব বাদ দিন। কাহিনির অমন মুখড়া শুনে বাঙালি-কান যে ‘পাগলা দাশু’র মতো খাড়া হয়ে উঠবে, এ বুঝতে কেজি ক্লাসের বিদ্যে লাগে না।

আসলে, ঘুরতে গিয়েছিলাম উত্তর ২৪ পরগনার মাদারাল গ্রামের জয়চণ্ডীর সপ্তমদোলের মেলায়। নৈহাটি লোকালে চাপলে ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই পৌঁছবেন কাঁকিনাড়ায়। বিকেলে ভিড়ভাড় নেহাতই কম। স্টেশন চত্বরে চায়ের ভাঁড়ে চুমুক দিয়ে ব্রিজে উঠে পড়া গেলো। তারপর হাঁটতে হাঁটতে রথতলা বাজার। সেখান থেকেই টোটো ধরে মিনিট সাতেকের মধ্যে দিব্যি পৌঁছে যাবেন কয়েক শত বছরের প্রাচীন মেলায়।

মেলার প্রচলিত নাম ‘হাঁড়ি-কলসির মেলা’। কোন একসময় এই মেলায় পাওয়া যেত মাটির হাঁড়ি, কলসি, জালা আর নানা রকমের মাটির পুতুল। তখন দশ বিঘে জমিতে মেলা বসত। দূরদূরান্ত থেকে পসরা সাজিয়ে বেনিয়ারা হাজির হতেন এখানে। তবে মেলার সেই সাবেক ছবিটা বদলে গেছে। এখন মেলায় মাটির হাঁড়ি, কলসি বা মাটির পুতুলের কোনও নামগন্ধ নেই। মেলার পরিধিও ছোট হয়ে গেছে। এখন মেলা চলে দিন দশেক। হাল আমলের এই মেলায় আর পাঁচটা সাধারণ মেলার মতোই প্লাস্টিকের জিনিস, ছোটদের খেলনা, ইমিটেশন গয়না, ছোলা-বাদাম ভাজা আর গরম গরম জিলিপিই ভরসা।

মেলার মধ্যে ঘুরতে ঘুরতে একসময় মন্দিরের সামনে এসে পৌঁছলাম। সেখানেই সেবায়েত মশাইয়ের কাছে জিজ্ঞেস করলাম, দোল উৎসব মূলত বৈষ্ণবধর্মকে কেন্দ্র করে হয়। অথচ এখানে শাক্ত দেবীকে কেন্দ্র করে সপ্তমদোল কেন অনুষ্ঠিত হয়?

তিনি জানালেন, কিংবদন্তী অনুসারে, সন্ন্যাসী বিদ্রোহের সময় ভবানী পাঠক উত্তরবঙ্গ থেকে এখানে এসে কিছুদিন আত্মগোপন করেছিলেন। সেই সময় তিনি দেবীর পুজো চালু করেন। পরবর্তীকালে এই মেলার সূচনা হয়। কিন্তু কে এই ভবানী পাঠক?

কথাসাহিত্যিক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের অমর সৃষ্টি ‘দেবী চৌধুরানী’। এই উপন্যাসেই দেখা যায় শ্বশুরের চাপে স্বামীর দ্বারা পরিত্যক্ত হয়ে কিশোরী প্রফুল্ল, ডাকাত সর্দার ভবানী পাঠকের সাহায্যে দেবী চৌধুরানী হয়ে ওঠেন। এঁরা কিন্তু শুধুমাত্র কল্প-কাহিনির চরিত্র নয়। বাস্তবের মাটিতে সন্ন্যাসী বিদ্রোহের অন্যতম মুখ। যাঁদেরকে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর উপন্যাসের চরিত্রে রুপায়িত করেছিলেন। এই ভবানী পাঠক ছিলেন শাক্ত।

তারপর? শুনুন…

লেখা: সৌমেন জানা
পাঠ: কোরক সামন্ত
আবহ: শঙ্খ বিশ্বাস

পোল