বনস্পতির ছায়া দেওয়া মহীরুহ, সান্নিধ্য ও প্রেরণার উজ্জ্বল বাতিঘর; শঙ্খ ঘোষ বিষয়ে দুই কৃতী অনুজের স্মৃতি-তর্পণ

Published by: Susovan Pramanik |    Posted: April 22, 2021 1:56 am|    Updated: April 22, 2021 2:30 pm

Published by: Susovan Pramanik Posted: April 22, 2021 1:56 am Updated: April 22, 2021 2:30 pm

শঙ্খ ঘোষ চলে গেলেন, শব্দহীনভাবে আয়ুর মতো চলে গেল এক যুগ। ‘অন্ধের স্পর্শের মত’ ছুঁয়ে দেখতে চেয়েছিলেন যাঁরা, তাঁদের আর ছুঁয়ে দেখার অবকাশ রইল না। শঙ্খ ঘোষকে অধ্যাপনার জগতের বাইরেও নানাভাবে পেয়েছেন নানা মানুষ। তাঁদের প্রেরণা উৎসাহ আলোচনা সান্নিধ্যের বাতিঘর হয়ে উঠেছিলেন এই মানুষটি। তেমনই দুজন মানুষ, প্রখ্যাত নাট্যব্যক্তিত্ব কৌশিক সেন এবং সাহিত্যিক বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়। শঙ্খবেলায় তাঁরা জানিয়েছেন তাঁদের শঙ্খ ঘোষকে।

কৌশিকবাবুর নাটকের দল ‘স্বপ্নসন্ধানী’র নিবিড় শুভাকাঙ্ক্ষীদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন শঙ্খ ঘোষ। তাঁদের নাটক বুদ্ধদেব বসু’র লেখা কালজয়ী ‘প্রথম পার্থ’ অভিনয় ও নির্মাণের সঙ্গে জড়িয়ে ছিলেন মানুষটি। এই নাটকের অভিনয় দেখে তাঁর মুগ্ধতা অথবা পরামর্শের যে বয়ান সে বিষয়ে চিঠি লিখেছিলেন কৌশিক’কে। সেই চিঠি পরবর্তীতে শঙ্খ ঘোষের প্রবন্ধের বই ‘আরোপ আর উদ্ভাবন’-এ সঙ্কলিত। তিনি নিয়মিত স্বপ্নসন্ধানীর প্রযোজনাগুলি দেখতেন, জানাতেন সুচিন্তিত মতামত। স্বপ্নসন্ধানীর হয়ে ওঠার পিছনেও মানুষটির ভূমিকা রয়ে গেছে অমলিনভাবে। কোনোকিছুই উপর উপর বিশ্লেষণ করতে চাইতেন না। ভিতরে ঢুকে গভীরতার পরত থেকে ছেঁকে তুলে আনতেন নির্যাসটুকুকে। কৌশিক জানালেন, তাঁর অন্যতম প্রিয় বই শঙ্খ ঘোষের লেখা, ‘কালের মাত্রা ও রবীন্দ্র নাটক’ বারবার তিনি এই বইয়ের কাছে ফিরে ফিরে যান, নিজের নাট্যবোধের বোঝাপড়াটুকু যাচাই করে নিতে। তাঁদের একসাথে গণ আন্দোলনের স্মৃতিও অমলিন। শঙ্খ বাবুর থেকে উপহার পাওয়া, তাঁর স্বাক্ষরিত বই, তাঁর কাছে ‘অস্কার’ পাওয়ার সমান।

আদ্যোপান্ত কবি ছিলেন শঙ্খ বাবু। তাঁর উৎসাহ এবং প্রেরণা বহু তরুণ কবিকে মহীরুহের মতো ছায়া দিয়েছে, স্পর্ধা জুগিয়েছে। তিনিই একসময়ে লিখেছিলেন, ‘তরুণ কবির স্পর্ধা’। স্ফুলিঙ্গের মতো জ্বলে ওঠা এই মানুষটির সান্নিধ্য পেয়েছিলেন কত তরুণ কবি-সাহিত্যিক! অগ্রজ হয়ে অনুজদের যথাযোগ্য সম্মান প্রদর্শন করাই ছিল তাঁর বৈশিষ্ট্য। বিনায়কের এমন কোনও দিন কাটে না, যেখানে তিনি শঙ্খ ঘোষের লেখার অন্তত একটা পাতা তাঁর দিন যাপনের সঙ্গী করেননি। প্রায়ই তিনি দেখা করতেন, কথা বলতে যেতেন তাঁর বাড়িতে। তিনি শুনতেন বেশী, বলতেন খুবই কম। তাঁর সেই অস্ফুট স্বরে বলা কথাগুলো কবি বিনায়কের কাছে হয়ে আছে খাজুরাহো বা কোনার্কের ভাস্কর্যের মতো। বিনায়কের নতুন লেখা কবিতার নিবিষ্ট পাঠক ছিলেন তিনি। মনোযোগ সহকারে অনুজ কবিদের লেখা পড়তেন তিনি বরাবরই, জানাতেন নিজের ভাবনার কথা। বিনায়কের মনে হয়, তাঁর অকিঞ্চিৎ কবিতা পড়ে শঙ্খ বাবুর কতো সময়ের অপচয় হয়েছে। আবার এও মনে হয়, ভাগ্যিস পড়েছিলেন, তাই কবিতাগুলোর গায়ে তাঁর সস্নেহ পরশ এবং উৎসাহ-এর ছোঁয়া লেগে রয়েছে, অমলিন।

তাঁর লেখা পাঠক ও লেখকের মধ্যে যে অদৃশ্য মেলবন্ধন সৃষ্টি করত, তা তাঁরই মতো চির অমলিন-অবিনশ্বর। কবির মৃত্যু হয় না, যেমন মৃত্যু হয় না কবিতার…

এমনই নানান স্মৃতিচারণা উঠে আসে আলাপচারিতায় টিম ‘শোনো’-র তরফে শুনলেন, সুযোগ বন্দ্যোপাধ্যায়, শ্যামশ্রী সাহা, সুশোভন প্রামাণিক।

লেখা: সুশোভন প্রামাণিক
আবহ: শঙ্খ বিশ্বাস

পোল