ছড়ার ছররা- দেওয়াল লিখন-প্যারডির ফুলঝুরি, দুই শতাব্দী ধরে ভোটরঙ্গে বাঙালির রাজনৈতিক সরসতার সংস্কৃতি

Published by: Susovan Pramanik |    Posted: March 31, 2021 10:52 pm|    Updated: March 31, 2021 11:11 pm

Published by: Susovan Pramanik Posted: March 31, 2021 10:52 pm Updated: March 31, 2021 11:11 pm

খেলা হবে‘ এই একটা লব্জে বাংলার ভোট ময়দান এখন রীতিমতো প্লে গ্রাউন্ড। আক্যশন শুরু হয়ে গেছে। রেফারির ভূমিকায় নির্বাচন কমিশন বাঁশি ফুকে চলেছে অহরহ। নির্বাচনের এই খেলায় আমাদের মতো আমজনতার অবস্থান কি তবে দর্শক আসনে? অন্য খেলার সঙ্গে গণতন্ত্রের খেলার এখানেই তো ফারাক— বাঘা বাঘা প্লেয়ারকেও এখানে জিততে হলে কেবল পারফরমেন্সে ভরসা করলে হয় না, ‘করজোড় নিবেদনম্‌’ বলে এসে দাঁড়াতে হয় গণতন্ত্রের ঈশ্বরের দ্বারে—ঘাড় কাত করে এক গাল হেসে প্রার্থী বলেন ‘ভোটটা কিন্তু আমাকেই হে হে…’

তবে এতেই শুধু চিড়ে ভেজে না, মনের ভিতর দিয়া মরমে পশিতে হইলে লাগে আরও কিছু কৌশল। ‘ও খারাপ আমি ভালো’, ‘ওরা কিছু করেনি’, ‘আমরা সব করব’, ‘ওরা কথা রাখেনি, আমরা কথা দিচ্ছি’— ভোটারের মনের ভিতরে নিলামের হাতুড়ি ঠোকার মত এইসব বলে যেতে হবে অনর্গল, তবে না মন গলবে, তবে না ছিঁড়বে শিকে। এই শিকে ছেঁড়ার প্রক্রিয়ার নামই ভোটপ্রচার— যার হাজারো উপায়, আর হাজারো পন্থা। আর সেইসব পন্থা উদ্ভাবনের জন্য ইদানিং ক্রিয়েটিভ টিম থেকে শুরু করে অ্যাড এজেন্সি, মার্কেটিং পলিসি কি নেই! স্লোগান থেকে গান, ভিডিও, অডিও কিংবা মিম— জনতার মন পেতে কিচ্ছু বাদ যাচ্ছে না।

রসিক বাঙালির সেই চলার পথ বানিয়ে রেখেছিল ‘হরবোলা ভাঁড়’ নামের একটি পত্রিকা, সময়কাল আজ থেকে দেড়শো বছর আগে। এটিই বাংলায় প্রকাশিত প্রথম ব্যঙ্গচিত্রের পত্রিকা। ‘হরবোলা ভাঁড়’-এর যোগ্য সহচর হিসেবে প্রকাশ পেয়েছিল আর একটি পত্রিকা— ‘বসন্তক’। সাল ১৮৭৪। ওই বছরই পুর আইন সংশোধন করে পুরভোটে নাগরিকদের ভোটদানের অধিকার দেয় ইংরেজ শাসক। পরাধীন বাঙালির বুকের ভেতর ধিকধিক করছে ক্ষোভ, অতএব উর্বর মস্তিষ্কের খাটুনিতে শান দাও বিদ্রুপ-কৌতুকে। সেই থেকে হল শুরু।

‘বসন্তক’ ছাপতে শুরু করল একের পর এক ব্যঙ্গ ছবি। সে সব ছবি আঁকতেন দুই শিল্পী— গিরীন্দ্রনাথ দত্ত আর প্রাণনাথ দত্ত। কিন্তু শিল্পীদের পরিচিতি পত্রিকায় থাকত না। শুভেন্দু দাশগুপ্ত-এর ‘বাংলা কার্টুনে ভোট’ বইয়ে ‘বসন্তক’ থেকে নেওয়া একটি ছবি রয়েছে, ছবি-পরিচিতিতে লেখা— ‘আমাদের গৌরে মুদি সবে বাটীটির দ্বারটি খুলিয়া কী দেখিলেন।’ ছবিতে দেখা যাচ্ছে খাটো ধুতি, খালি গায়ে টিকিওয়ালা গৌরে মুদি দেখছেন, তাঁর বাড়ির দরজায় হত্যে দিয়ে পড়ে আছেন মান্যগণ্য ভোটপ্রার্থীরা। এই ছবি কিন্তু বদলায়নি আজও।

‘বসন্তক’-এর পরে এল ‘জন্মভূমি’ পত্রিকা। চৈত্র ১২৯৮-এ ‘ভোট ভিক্ষা’ ছড়া বেরোল সেখানে। তৈলিক ভবনে গিয়েছেন এক ভোটপ্রার্থী। তিনি বেশ মান্যগণ্য লোক। কিন্তু ভোট ভিক্ষা চাইছেন সামান্য এক তিলির কাছে— ‘পাত্র মিত্র সঙ্গে করে যায় বাবু কলু-ঘরে/ গিয়ে পড়ে কলুর চরণে,/ দোহাই তোমার লাগে ভোট দাও আগে ভাগে/ কহি শুন কাতর বচনে।’ আজ এত বছর পরেও এই ছবি বদলাল কই? ভোটের আগে জাতের অঙ্ক কষে ইস্তাহারের পাতা তো আজও ভরে ওঠে। ভোটের এই রঙ্গব্যঙ্গের কথা যখন এসেই গেল, তখন দাদাঠাকুরের এই আলোচনায় আসা আটকাবে কে? ভোটপ্রার্থীর স্বরূপ তুলে ধরে তিনি লিখেছিলেন, ‘যিনি তস্কর-দলপতি দৈত্যগুরু,/ তিনি বাক্যদানে আজ কল্পতরু।’ ভোটের ছড়ার তো বটেই ভোটের গানেও জঙ্গিপুরের শরৎপণ্ডিত—ওরফে দাদাঠাকুর ছিলেন ‘ওয়ান অ্যান্ড অনলি’। তাঁর বিখ্যাত ভোটের গান— ‘আমি ভোটেরও লাগিয়া/ ভিখারি সাজিনু/ ফিরিনু গো দ্বারে দ্বারে’ আজও কথায় সুরে অনবদ্য। রামকুমার চট্টোপাধ্যায় ছাড়াও গানটি শুনতে পাওয়া যায় হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠেও, সিনেমার পর্দায় দেখা গিয়েছিল ভোটপ্রার্থীরূপী ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে কীর্তনের সুরে এই গান গেয়ে প্রচার করেছেন তরুণকুমার। ভোটরঙ্গের এই ছবিই যেন ফিরে এসেছে নির্বাচনে।

শুনুন…

 

চিত্রঋণ: চণ্ডী লাহিড়ীর কার্টুন এবং সাতের দশকের একটি লিফলেট

লেখা: সানু ঘোষ
পাঠ: সুশোভন প্রামাণিক
আবহ: শুভাশিস চক্রবর্তী

পোল