‘বাংলাদেশ’কে চিনেছিল বিশ্ব রবিশঙ্করের হাত ধরে

Published by: Sankha Biswas |    Posted: December 16, 2020 8:32 pm|    Updated: December 20, 2020 7:18 pm

Published by: Sankha Biswas Posted: December 16, 2020 8:32 pm Updated: December 20, 2020 7:18 pm

সাতের দশক। এক ঐতিহাসিক কনসার্টের মাধ্যমে একটি নতুন দেশের জন্ম ইতিহাস লেখা হতে থাকে। সেই কনসার্ট বিনোদন থেকে চ্যারিটির রাস্তা পেরিয়ে ইতিহাসে এক অন্য মাত্রা পায়। হ্যাঁ এমনই এক ঐতিহাসিক কনসার্ট অনুষ্ঠিত হয়েছিল, নিউ ইয়র্কের ম্যাডিসন স্কোয়ার গার্ডেনে। মূল উদ্যোক্তা ছিলেন পণ্ডিত রবিশঙ্কর আর বিটলস খ্যাত জর্জ হ্যারিসন

এই ঘটনার একটি পূর্বসূত্র আছে। জর্জ প্রাচ্যের সংস্কৃতির প্রতি প্রচণ্ড মাত্রায় অনুরক্ত ছিলেন। ১৯৬৬ সালের সেপ্টেম্বর মাস। জর্জ তখন খ্যাতির শীর্ষে। নিজের পরিচয় লুকিয়েই, তিনি এবং তাঁর স্ত্রী প্যাটি, বম্বে আসেন। মিস্টার এন্ড মিসেস স্যাম ওয়েলস নাম নিয়ে ওঠেন, বম্বের তাজ হোটেলে। মূল উদ্দেশ্য যোগব্যায়াম শিক্ষা এবং ‘সিতার মায়েস্ত্রো’ রবিশঙ্করের কাছে সেতার-এর পাঠ নেওয়া। সেই থেকে জর্জের সঙ্গে উপমহাদেশের সংস্কৃতির যোগসূত্র নির্মান ও স্থাপন শুরু হয়। সেই সাক্ষাতে জর্জ ছিলেন ছয় সপ্তাহ। মেঝেতে বসে সেতারের লম্বা অনুশীলনে পশ্চিমা জর্জের হাঁটু আর কোমর দুইই জবাব দিত। তাঁর মুশকিল আসানের জন্যেই পণ্ডিতজি এক যোগ শিক্ষকের বন্দোবস্ত করেন। সেই ভ্রমণে জর্জ কাশ্মীর গেছিলেন, বেনারাসে ‘রামলীলা’ দেখে শিহরিত হয়ে সেই অভিজ্ঞতাও লিখেছিলেন।

‘বিটলস’-এর বিখ্যাত এ্যালবাম ‘অ্যাবি রোড’-এর প্রাক্কালে, পুরো দলটাই, আরও একবার ভারত ভ্রমণে এসেছিল। এবার স্বনামে। মিডিয়া থেকে সাধারণ মানুষ সবারই আগ্রহের কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল এই ভ্রমণ। এই ভ্রমণ তৎকালীন ভারতের অধ্যাত্মের প্রতি পাশ্চাত্যের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিয়েছিল। আর এই যাত্রায় বিটলস সদস্যরা নিজেদের মধ্যে বোধহয় ঘুমন্ত এক গানের খনির সন্ধান পেয়েছিলেন।

জন লেনন, পল ম্যাককার্টনি, সিন্থিয়া লেনন, রিঙ্গো স্টার, সবাই। তাঁরা এসেছিলেন হৃষীকেশের এক ধর্মগুরু মহাঋষি মহেশ যোগীর আশ্রমে। তাঁর উদ্ভূত এক বিশেষ মন্ত্র যোগ শিখতে।

বিটলস-এর ভারতের প্রতি শ্রদ্ধা ও পরিচিতি, এই কয়েক মাসের হৃষীকেশ বাসে পোক্ত হয়েছিল বলাই যায়।

১৯৭০ সালের নভেম্বরে ‘ভোলা’ নামের এক সাইক্লোন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিমবঙ্গের উপকূলবর্তী অঞ্চলে আছড়ে পড়ে। প্রাণ হারান প্রায় পাঁচ লক্ষ মানুষ। মার্চ, একাত্তর থেকে শুরু হয়, স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য স্বাধীনতা আন্দোলন। লাখে লাখে মানুষ, কাঁটাতারের সীমানা পেরিয়ে পশ্চিমবঙ্গের নানা জায়গায় আশ্রয় নিতে শুরু করে। গড়ে ওঠে, অস্থায়ী রিফিউজি ক্যাম্প। কোথাও সেটুকুও জোটে না। খোলা আকাশের নীচে, হাজারে হাজারে, শিশু, মহিলা, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা’র ঢল। নিরন্ন, অসুস্থ মানুষের ভিটেমাটি হারানোর হাহাকার আর বাঁচার জন্য, দু মুঠো খেয়ে প্রাণধারণের উদগ্র চেষ্টা। সেইসব খবর, সেইসব ছবি শিল্পী রবিশঙ্করকে বোধহয় স্বস্তি দেয়নি। তিনি যতই বিদেশে থাকুন না কেন! হৃদয়ের শিকড় তখনও এই বাংলার জল হাওয়া মাখা।

তাঁর ভাষায়, ‘আমি অত্যন্ত বিমর্ষ হয়ে পড়েছিলাম, এইসব ছবি দেখে, এইসব খবর পড়ে, আমার অস্থির লাগছিল। একদিন কথা প্রসঙ্গে আমি জর্জকে ডেকে সবটা বললাম। এও বললাম, দেখো আমি জানি, এই ঘটনার সাথে তুমি হয়তো নিজের আবেগকে সংযুক্ত করতে পারবেনা। আর এটা তোমার আগ্রহের বিষয় হওয়ার কোনও কারণও নয়। তবুও দেখো, যদি কিছু করা যায়। জর্জ বলেছিল, আমাকে একটু সময় দাও, আমি দেখছি, মনে হয় নিশ্চয় কিছু একটা করতে পারব’।

মাত্র দু সপ্তাহের মধ্যে জর্জ তাঁর বন্ধুদের মধ্যে যোগাযোগ করতে শুরু করেন। ফোনাফোনি, কথা বলা সবই প্রায় হয়ে ওঠে। প্রত্যেকেই এক বাক্যে স্বীকার করলেন, জর্জের আইডিয়াটি দারুণ।

তারপর? শুনুন…

 

লেখা: সুশোভন প্রামাণিক
পাঠ: শ্যামশ্রী সাহা ও সুশোভন প্রামাণিক
আবহ: শঙ্খ বিশ্বাস

পোল