তাঁর কাছে ধর্ম ছিল মানবতা ও সংগীত, উস্তাদ বিসমিল্লাহ্ খান তাঁর গড়ে ওঠার জন্য আজীবন স্বীকার করেছেন বেনারস ও কাশী বিশ্বনাথের অবদান

Published by: Susovan Pramanik |    Posted: March 30, 2021 7:18 pm|    Updated: March 30, 2021 7:18 pm

Published by: Susovan Pramanik Posted: March 30, 2021 7:18 pm Updated: March 30, 2021 7:18 pm

১৯১৬-র ২১ মার্চ বিহারের ডুমরাওতে জন্ম। পাঁচ পুরুষ ধরে বংশ পরম্পরায় তাঁরা ছিলেন ডুমরাও প্রসাদের সভাসঙ্গীত সদস্য। রাজ দরবারে প্রাত্যহিক সান্ধ্য আসরে নহবতখানায় সানাই বাজাতেন। এছাড়াও মন্দিরে, আর যে কোনও মাঙ্গলিক অনুষ্ঠানে, তাঁরা বাজনা বাজাতেন। নাতি হওয়ার খবর শুনে ঠাকুরদা রসুল খান আনন্দ উত্তেজনায় আল্লাহ্‌-এর উদ্দেশ্যে ধন্যবাদের ভঙ্গীতে বলে উঠেছিলেন ‘বিসমিল্লাহ্‌’। যা কিছু শুভদায়ক ইসলামি সংস্কৃতিতে তার উদ্দেশ্যেই এই উচ্চারণ। দাদা সামসুদ্দিনের সঙ্গে মিলিয়ে তাঁর নাম রাখা হয়েছিল কামরুদ্দিন। কিন্তু এইভাবেই তিনি হয়ে উঠেছিল বিসমিল্লাহ্ খান।

বাপ পয়গম্বর বক্সের মনে হয়েছিল ডুমরাও-এর পরিবেশ সঠিক শিক্ষা ও সংস্কৃতির অনুপন্থি নয়। তাই মা আর তিন ভাইয়ের সঙ্গে বিসমিল্লাহ্ এসে উঠেছিলেন বেনারস এর বেনিয়া বাগে তাঁর মামুর কাছে। ছ বছর বয়সে। সেখানে পরম্পরাগত ভাবে অন্য আত্মীয়রা বিশ্বনাথ আর বালাজি মন্দিরে সেনহাই বাদকের কাজ করতেন। মামু আলি বক্স হন তাঁর গুরু। তাঁর কাছেই শিক্ষার সূত্রপাত।

১৯৩০ সাল মামু আলি বক্স চোদ্দ বছরের বিসমিল্লাহ্কে নিয়ে যান ‘এলাহাবাদ মিউজিক কনফারেন্স’-এ। সেই সময়ের অন্যতম মান্য এবং বিখ্যাত সংগীত সমারোহ এটি। সেখানে তাঁর বাজনা শুনে শ্রোতারা চমকিত। এমনকি মামুরও বিস্ময়ের ঘোর কাটেনা। বুঝতেই পারেননি কিশোরের মধ্যে সংগীতের সকল রসের ধারার এমন সম্মিলন এত অল্পদিনে ঘটল কি করে! কলকাতা শহরের সঙ্গেও তাঁর ছিল গড়ে ওঠার সম্পর্ক। বয়স যখন একুশ, ৩৭ সালে কলকাতায় অনুষ্ঠিত ‘অল ইন্ডিয়া মিউজিক কনফারেন্স’ তিনি আবারও সবাইকে তাক লাগিয়েছিলেন।

কয়েক বছর আগে নিঃশব্দে পেরিয়ে গেছে তাঁর জন্মশতবর্ষ। মাঝে তাঁকে নিয়ে কয়েকবার খবর হয়েছে বটে। কখনও তাঁর বাড়ি ভেঙে শপিং মল হচ্ছে এই জানতে পেরেছি আমরা। তাঁর বাড়ি থেকে চুরি গিয়েছে তাঁর সাধের সানাই। অথবা জেনেছি, তাঁর পদ্মভূষণ-এর শংসাপত্র উইয়ে কেটেছে। আমাদের কাছে এই ঘটনাগুলি যথেষ্ট লজ্জার এবং হতাশার। কিন্তু এই অসহিষ্ণু সময়ের বহমানতার মধ্যে তিনি বাতিঘর। কেন এবং কীভাবে অনেক টুকরো ঘটনার মালা গেঁথে সে উত্তর আমরা খুঁজতে পারি।

সানাই তো অনেকেই বাজাতেন, বিসমিল্লাহ্ খান-এর বিশেষত্ব কোথায় এই প্রশ্ন যদি কেউ করেন, তার নানাবিধ উত্তর আছে।

বিসমিল্লাহ্র কৃতিত্ব রাজসভার একটা সাধারণ বাদ্যযন্ত্রকে তিনি একা হাতে ধ্রুপদী সংগীতের যন্ত্রে উত্তরণ। মন্দির বা রাজার নহবতের বাজনা সেনহাই থেকে নিখাদ রাগসংগীতের যন্ত্র রূপে সানাইয়ের নির্মাণের সম্পূর্ণ কৃতিত্ব তাঁর। তাঁর বাজনা হয়ে উঠেছিল ভারতীয় মার্গ সংগীতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সম্পদ। হয়ে উঠেছিল যে কোনও ‘শুভ’ অনুষ্ঠানের প্রতীক।

নিরাকার আল্লাহ্‌-এর উপাসনা তিনি আজীবন ভক্তিভরে করেছেন, তেমনই সংগীতের দেবী সরস্বতীর প্রতি ছিলেন সীমাহীন শ্রদ্ধালু। তাঁর নিজের এবং সাংগীতিক অস্তিত্ব নিয়ে বলতেন, ‘পেহলে নমাজ্ উসকে বাদ রিওয়াজ্’। ‘মজহব’ নিয়ে মাথা ঘামাতেন কম। আমৃত্যু বিশ্বাস করেছেন সংগীত এবং মানবতা, এই দুইই তাঁর ধর্ম, মানুষের শ্রেষ্ঠ ধর্ম। চল্লিশ বছর আগে দেশব্যাপী দাঙ্গার সময়, তিনি প্রতিরোধ করেছেন। ধর্মের নামে নয়, মানবতার নামে। ব্যারিকেডে দাঁড়িয়েছেন বাঁশি হাতে।

একেবারে সাধারণ নভিশ শ্রোতা থেকে রসজ্ঞ বিশারদ সবারই মনে হিল্লোল তুলতে পারতেন। তাঁদের আবেগ এবং অনুভূতির মাত্রাকে এমন এক স্তরে নিয়ে যেতে পারতেন যে তাঁদের গলায় কান্না বা খুশীর মণ্ড আটকে যেত। একেবারে সাধারণ লোকসংগীতের ধুন থেকে ইমন-এর মতো রাগ। সবেতেই তিনি সবাক এবং প্রশ্নাতীত মুন্সিয়ানার মালিক ছিলেন।

সংগীতে তাঁর শ্বাসের নিয়ন্ত্রণ ছিল বিস্ময়াতীত। তিনি নিজে আজীবন বিড়ি সিগারেট ফুঁকেছেন বিস্তর। কিন্তু সত্তর ঊর্ধ্ব বয়সেও তাঁর দমে বিন্দুমাত্র অসুবিধে হয়নি। তাঁর হাতে তাঁর ফুঁয়ে সানাই কথা বলে উঠত, এবং বাধ্য শিষ্যের মতো তাঁর কথা শুনত। তাঁর বাজনার গুণাবলীর মধ্যে সবসময় ছিল এক অন্তরঙ্গ কথোপকথন এর চাল এবং সীমাহীন আনন্দের বহমানতা। যে কোনও চেনা রাগকে তাঁর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও সরগমের বাঁধা গতের বাইরে, তিনি নিজের মত অপ্রত্যাশিত পদ্ধতিতে, ব্যাকরণ ভেঙে গড়ে তুলতেন।

নিজে সানাই বাজালেও জানতেন অজস্র ঠুমরী, দাদরা, চৈতি, খেয়াল নানাবিধ সংগীত। এবং যে কোনও সময় অবলীলায় এইসব গেয়ে দিতে পারতেন।

তাঁর কাছে বাজনা যত না ‘অসর’ যত না অভিজ্ঞতা এবং অন্যান্য তার থেকে বেশী ঈশ্বরের সঙ্গে সংযোগের সেতু তৈরির মাধ্যম। তিনি যেন সূফী সাধক যাঁর কাছে সংগীতের নানা ধারার সমাহার হয়েছে। সেখানে সন্ত কবীরের দোঁহা, রাধা কৃষ্ণের লোক ধুন দুই’ই উপস্থিত। হোলির সময়ে তিনি তাঁর মহল্লায় এক নিম গাছের তলায় বসে সারাদিন বাজাতেন রাগ গুণকেলি।

কখনও দাঁড়িয়ে সানাই বাজাতেন না। শুধু বছরের এক দিন। মহরমের দিন। অন্য সকলের সঙ্গে চোখের জল ফেলে বিলাপ করতে করতে তিনি মিছিলে হাঁটতেন। ওই এক দিন তিনি রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে বাজাতেন ‘বিলাতগীতি নৌহা’।

শুনুন…

লেখা: সুশোভন প্রামাণিক
পাঠ: কোরক সামন্ত
আবহ: শুভাশিস চক্রবর্তী

পোল