বিপুল মেধা আর বহুমুখী প্রতিভা থাকা সত্ত্বেও জ্যোতিরিন্দ্রনাথ রয়ে গেলেন অন্তরালেই

Published by: Sankha Biswas |    Posted: May 4, 2021 9:26 pm|    Updated: May 7, 2021 6:25 pm

Published by: Sankha Biswas Posted: May 4, 2021 9:26 pm Updated: May 7, 2021 6:25 pm

জ্যোতিদাদার কত গুণ! অবাক হয়ে ভাবে রবি। কোনও কিছুতেই কখনও হারানো যাবে না জ্যোতিদাদাকে, সে নিশ্চিত। এবং সে মুগ্ধ। রবি আরও বিস্মিত জ্যোতিদাদা বাবামশাইয়ের কাছ থেকে জমিদারি দেখাশোনার ভার পেয়েছেন বলে। একইসঙ্গে একই লোক শিল্পী এবং জমিদার হতে পারে? আবার পিয়ানো বাজিয়ে গান, কখনও সেতার বাজাচ্ছেন, কখনও আবৃত্তি করছেন ফরাসি কবিতা! জ্যোতিদাদা বোধহয় মানুষ নন– দেবতা। দেবতার মতোই তো দেখতে। দেবতার এক নতুন রূপে প্রকাশ ঘটেছে ইদানীং।

জ্যোতিদাদা জমিদারি দেখার পাশাপাশি শুরু করেছেন দ্বারকানাথের মতো নীলের ব্যবসা। দ্বারকানাথের মতো জাহাজের ব্যবসাও শুরু করবেন। জ্যোতিদাদাকে নিয়ে রবির বিস্ময়ের শেষ নেই। ইতিমধ্যে অবিশ্যি আরও একটি কাণ্ড ঘটিয়েছেন ১৯ বছরের জ্যোতিরিন্দ্র। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, বারোয়াঁ সুরে সানাই বাজিয়ে বাড়িতে এনেছেন নতুন বউ– কচি শ্যামলা হাতে সোনার চুড়ি, চেনাশোনার বাহির সীমানা থেকে মায়াবি দেশের নতুন মানুষ। এই মায়াবি দেশের নতুন মানুষই ধীরে ধীরে হয়ে উঠল রবীন্দ্রনাথের ‘নতুন বৌঠান’, তাঁর প্রাণের মানুষ, কাদম্বরী।

কিন্তু তার অনেক আগে ঘটল এক ঘটনা। যে-ঘটনায় সূচিত হল জ্যোতিরিন্দ্র- রবীন্দ্র কাহিনির অপ্রত্যাশিত মোড়।
একদিন জ্যোতিরিন্দ্র ও রামসর্বস্ব- দু’জনে পড়ার ঘরে জ্যোতিরিন্দ্রর ‘সরোজিনী’ নাটকের প্রুফ দেখছেন। এবং মাঝেমধ্যে নাটকের কোন জায়গায় কী করলে ভাল হয়, সেই বিষয়ে পণ্ডিতমশাইয়ের সঙ্গে আলোচনা চলছে। পাশের ঘরে চোদ্দো বছরের রবি সেই আলোচনা নীরবে শুনছে। ‘সরোজিনী’ নাটকের একটি দৃশ্যে রাজপুত রমণীরা চিতায় আত্মাহুতি দিচ্ছে। সেই দৃশ্যের জন্য জ্যোতিরিন্দ্র লিখেছেন একটি গদ্য-বক্তৃতা। হঠাৎ ছোট্ট রবি পাশের ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বলল, গদ্য নয়, এ জায়গাটায় গানের প্রয়োজন। জ্যোতি বললেন, ‘রবি, তুই ঠিকই বলেছিস। আমার মনটাও খুঁতখুঁত করছে। কিন্তু এখন আবার নতুন গান লেখার সময় কোথায়?’ রবি বলল, ‘যদি এখুনি লিখে দিতে পারি?’ এবং সকলকে হতবাক করে সেই আশ্চর্য ক্ষমতা দেখাল রবি, মুহূর্তে এই গান লিখে দিয়ে–
জ্বল জ্বল চিতা দ্বিগুণ দ্বিগুণ
পরান সঁপিবে বিধবা বালা।
জ্বলুক জ্বলুক চিতার আগুন,
জুড়াবে এখনি প্রাণের জ্বালা।।
জ্যোতিরিন্দ্র লিখছেন, ‘এই সময়ে আমি পিয়ানো বাজাইয়া নানাবিধ সুর রচনা করিতাম। আমার দুই পার্শ্বে অক্ষয়চন্দ্র ও রবীন্দ্রনাথ কাগজ পেন্সিল লইয়া বসিতেন। আমি যেমনি একটি সুর রচনা করিলাম, অমনি ইহারা সেই সুরের সঙ্গে তৎক্ষণাৎ কথা বসাইয়া গান রচনা করিতে লাগিয়া যাইতেন।’
এইভাবেই, এই আবহাওয়ার মধ্যেই, রবীন্দ্রনাথ লিখলেন ‘বাল্মীকি প্রতিভা’ ও ‘কালমৃগয়া’র গানগুলি।
১৮৮০ সাল। রবীন্দ্রনাথ উনিশ। সবে ফিরেছেন বিলেত থেকে।
জ্যোতিরিন্দ্রনাথ লিখলেন তার ‘মানময়ী’ নাটক। সেই নাটকের শেষ রবীন্দ্রনাথ জুড়ে দিলেন একটি গান অনায়াস অনর্গলতায়:
আয় তবে সহচরী,
হাতে হাতে ধরি ধরি
নাচিবি ঘিরি ঘিরি গাহিবি গান। আন্ তবে বীণা
সপ্তম সুরে বাঁধ তবে তান।।
তারপর এই দুই ভাইয়ের সম্পর্কের রসায়ন গেল কোনদিকে! শুনুন…

লেখা: রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়
পাঠ: সুশোভন প্রামাণিক
আবহ: শঙ্খ বিশ্বাস

পোল