‘মৎস্য মারিব খাইব সুখে’, মাছ-ভাতে বাঙালির মঙ্গলকাব্য থেকে কবিতায় ‘মছলিশি সংস্কৃতি’র হাল হকিকৎ

Published by: Susovan Pramanik |    Posted: April 2, 2021 3:32 pm|    Updated: April 2, 2021 3:32 pm

Published by: Susovan Pramanik Posted: April 2, 2021 3:32 pm Updated: April 2, 2021 3:32 pm

প্রায় সর্বক্ষেত্রেই মাছ বাঙালির জীবনের সঙ্গে ওতোপ্রতোভাবে জড়িয়ে গেছে। আর তারই প্রমাণ পাই, যখন দেখি সেই প্রাচীন যুগ থেকে বাংলা সাহিত্যে কিভাবে মাছ  প্রসঙ্গ উঠে এসেছে বারবার। প্রাকৃত বাঙালির খাদ্যাভাস নিয়ে নানা তথ্য মেলে ‘প্রাকৃত পৈঙ্গল’-এর পদে। “ওগগর ভত্তা রম্ভঅ পত্তা, গাইক ঘিত্তা দুগ্ধ সযুত্তা।/ মোইলি মচ্ছা নালিত গচ্ছা দিজ্জই কান্তা খা পুনবন্তা”।। অর্থাৎ যে রমণী প্রতিদিন কলাপাতায় করে গাওয়া ঘি সহযোগে  গরম ভাত, নালিতা বা পাট শাক এবং মৌরলা মাছের ঝোল পরিবেশন করেন, তাঁর স্বামী একজন পুণ্যাত্মা ব্যক্তি।

“কানু বিনে যেমন গীত নেই” তেমনি মাছ বিনে বাঙালির কথা নেই। ১৪৬৩ খ্রীস্টাব্দে কৃত্তিবাস ওঝা রচিত রামায়ণে বাঙালির প্রিয় মাছ রুই, চিতলের উল্লেখ পাই। “ভালো মৎস্য আন সবে রোহিত চিতল।/ শিরে বোঝা কাঁধে ভার বহরে সকল”।
মধ্যযুগীয় কবি বিজয়গুপ্ত এবং দ্বিজ বংশীদাস ছিলেন পূর্ববঙ্গের লোক। ওঁদের রচিত ‘মনসামঙ্গল’-এর পাতায় পাতায় শুধু মাছের বিবরণই নয়, রন্ধনকলার বিশদ বর্ণনা মেলে।

বিজয়গুপ্ত ‘মনসামঙ্গল’-এ লিখলেন, “মৎস্য কাটিয়া থুইল ভাগ ভাগ।/ রোহিত মৎস্য দিয়া রান্ধে কলতার আগ”। বা “ভিতরে মরিচ-গুঁড়া বাহিরে জড়ায় সূতা।/ তৈলে পাক দিয়া রান্ধে চিংড়ির মাথা”। এছাড়া রয়েছে ডুমো ডুমো করে কাটা মানকচু দিয়ে শোলমাছের পদ, মাগুর মাছের ঝুরি, আছে ফালা ফালা করে কাটা ইলিশ মাছে “দক্ষিণ সাগর কলা” দিয়ে রান্নার সরস উল্লেখ।

ময়মনসিংহের কবি দ্বিজ বংশীদাস আবার লিখেছেন, “বড় বড় কই মৎস্য, ঘন ঘন আঞ্জি।/ জিরা লঙ্গ মাখিয়া তুলিল তৈলে ভাজি”। এইভাবে দুই বাঙাল কবি তাঁদের রচনাতে শুধু মাছের কথা লিখেই ক্ষান্ত  হননি, তাঁরা পূর্ববঙ্গীয় মাছ রান্নার চমৎকার সব নমুনাও পাঠকের কাছে পেশ করেছেন।

১৫৫০ সাল নাগাদ লেখা মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর ‘চণ্ডীমঙ্গল’কে অনেকেই সে সময়ের বাঙালির খাওয়া-দাওয়া’র খবরের ‘ভাঁড়ার ঘর’ বলে থাকেন। এই কবির জন্মস্থান ছিল বর্ধমান জেলার দামুনা নামের এক গ্রামে। তাঁর মঙ্গলকাব্যে নানাবিধ মাছের মধ্যে পুঁটি, চিংড়ি, বোয়াল, রুই, কাতলা, শোল, পাকাল ইত্যাদি মাছের  উল্লেখ পাই।  কবির ‘ধনপতি উপাখ্যান’-এ খুল্লনার মাছ রান্নায় আবার রন্ধন-প্রণালীর বৈচিত্রের সন্ধান মেলে। যেমন- শোল মাছের কাঁটা বেছে আম দিয়ে তিনি যে মাছের পদটি রান্না করেছিলেন, আজও বাঙালির হেঁশেলে তা ‘আমশোল’ নামে পরিচিত। এবাদ দিয়ে উল্লেখ মেলে কাঁঠালবিচি দিয়ে চিংড়ি মাছ, খরশোলা মাছ ভাজা, মরিচগুঁড়ো ও আদাবাটা দিয়ে কাতলা মাছের ঝোল ইত্যাদি। দেবীর নির্দেশে লহনা সতীন খুল্লনাকে সাদরে  ফিরিয়ে এনে নিজের হাতে রান্না করে যে পঞ্চাশ ব্যঞ্জন পরিবেশন করেছিলেন তার মধ্যে মাছের পদের বিশেষ উল্লেখ মেলে। যেমন “কটু তেলে রান্ধে বামা চিতলের কোল।/ রুহিতে কুমুড়া বড়ি আলু দিয়া ঝোল।।/কটু তৈলে কৈ মৎস্য ভাজে গণ্ডা দশ।/ মুঠো নিঙ্গারিয়া তথি (তাহাতে) দিল আদারস”।।

রায়গুণাকর ভারতচন্দ্রের ‘অন্নদামঙ্গল’-এর রচনাকাল ১৭৫২-১৭৫৩। সেই কাব্যেও কবির কলমে পাই মাছের রকমারিত্বের বর্ণনা। ভবানন্দ মজুমদারের স্ত্রী পদ্মমুখী তাঁর স্বামীর আমন্ত্রিত অতিথিদের জন্য মাছের যেসব পদ রান্না করেছিলেন তার দীর্ঘ বিবরণ মেলে এই কাব্যে। “ঝালঝোল ভাজা রান্ধে চিতল ফলুই/ কই মাগুরের ঝোল ভিন্ন ভাজে কই।/ ময়া সোনা খড়কীর ঝোল ভাজা সার/ চিংড়ির ঝোল ভাজা অমৃতের তার”। ……… কয়েক পদ পরে কবি আবার লিখছেন, “রুই কাতলার তৈলে রান্ধে তৈল শাক/ মাছের ডিমের বড়া মৃতে দেয় ডাক”। প্রতিটি ছত্রে মাছের নামের যেমন উল্লেখ আছে তেমনি আছে পদের রকমারিত্ব।

মাছের ডিমের প্রসঙ্গে কবি যখন লেখেন এই পদটি মৃত ব্যক্তিকেও জাগিয়ে তোলার মতো ক্ষমতা রাখে, তখন সেই পদের স্বাদ সম্বন্ধে আমাদের আর কোন সন্দেহ থাকেনা। দুই বাংলার মাছ রান্নার বৈচিত্রের ঝুড়ি ঝুড়ি নমুনা তাঁদের রচনার ছত্রে ছত্রে রেখে গেছেন মধ্যযুগের মঙ্গলকাব্যের কবিরা। পাঁচশো- সাড়ে পাঁচশো বছর আগের এই সব রান্নার আজও কোন তুলনা নেই। সন্দেহ নেই যে বাংলার এই  রন্ধনশিল্পের নেপথ্যে রয়েছে বহু শতাব্দীর ভাবনা-চিন্তা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা।

বাকিটা শুনুন…

লেখা: আলপনা ঘোষ
পাঠ: সুশোভন প্রামাণিক
আবহ: শুভাশিস চক্রবর্তী

পোল