পৃথিবীর অধিকাংশ রন্ধনশিল্পী পুরুষ। ভারতও নেহাত পিছিয়ে নেই এই তালিকায়। অথচ ভারতীয় পুরুষদের ক’জনকে দৈনন্দিন জীবনে হেঁশেল সামলাতে দেখা যাবে, তা বলা ভার। বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়েও পুরুষশাসিত সমাজের অধিকাংশই মনে করেন যে, রান্না করা কিংবা ঘরের অন্যান্য কাজ কেবলমাত্র সংসারের মহিলাদের দায়িত্ব।
উত্তর ভারতে মহিলারা বেশি সময় কাটান রান্নাঘরে, দক্ষিণ ভারতের মহিলারা কম। সম্প্রতি এমনই এক তুলনার কথা শোনা যাচ্ছে। নিছকই ফেলনা নয়, কথার কথাও নয়। কারণ রয়েছে যথেষ্ঠ, রীতিমতো প্রমাণ দেখিয়ে বলা যেতে পারে, এটাই হচ্ছে। তবে তার প্রভাব কীভাবে পড়ছে দেশের মহিলাদের উপর?
দেবদূত পট্টনায়কের মন্তব্যের প্রসঙ্গ ধরেই বলা যাক। সম্প্রতি এই জনপ্রিয় লেখক তথা মাইথোলজিস্ট দাবি করেছেন, ‘উত্তর ভারতীয় নারীরা রুটি বানান, রান্নাঘরে অনেক বেশি সময় কাটান, তাই সেখানে শিক্ষার হার অনেকখানি কম। অপরদিকে, দক্ষিণ ভারতীয় নারীদের রান্নাঘরে কম সময় থাকতে হয়, যা সেখানের শিক্ষাক্ষেত্রেও প্রতিফলিত হয়।’ এই বক্তব্যকে হয়তো সহজেই ‘নারীবাদি’ বলে দাগিয়ে দেবেন অনেকে। তবে খতিয়ে বিচার করলে বোঝা যায়, দেবদূতবাবুর মন্তব্যটি নেহাত ফেলনা নয়! নিজের যুক্তির স্বপক্ষে লেখক এ কথাও বলেন যে, উত্তর ভারতের নাগরিকদের প্রধান খাবার রুটি, চাপাতি ইত্যাদি। আটা মেখে রুটি তৈরি করতে সময় যায়। সেই রুটি আবার গরম গরম পরিবেশন করবার ঝক্কি থাকে। ফলে একেবারে কাজ মিটিয়ে দিলেই হয় না। বাড়ির পুরুষ সদস্যরা যতক্ষণ খাওয়ার টেবিলে থাকেন, মেয়েদের ততক্ষণ থাকতে হয় রান্নাঘরে উনুনের সামনে, যাতে তাঁরা তৎপর হাতে ক্রমাগত গরম রুটি বানিয়ে যেতে পারেন।
অন্যদিকে, দক্ষিণ ভারতের বেশিরভাগ মানুষই প্রধান খাদ্য হিসেবে ভাতের উপর নির্ভরশীল। এক্ষেত্রে হাঁড়ির ফুটন্ত জলে শুধুমাত্র চাল ঢেলে দিলেই ভাত রান্নার যাবতীয় দায়িত্ব মিটিয়ে ফেলা যায়। তাছাড়া তৈরির পরেও ভাত বহুক্ষণ উত্তপ্ত থাকে, ফলত মেয়েদের অপেক্ষাকৃত কম সময় রান্নাঘরে থাকতে হয়, যে সময়টা তাঁরা পুরুষদের মতো ব্যবসায়িক কাজে কিংবা পড়াশুনোয় ব্যয় করতে পারেন। আর উত্তর ভারতীয় নারীরা যে বাস্তবিকই দক্ষিণী নারীদের চাইতে শিক্ষাগতভাবে পিছিয়ে, সমস্ত পরিসংখ্যান তার সাক্ষ্য দেয়।
সত্যিই কি রান্না তথা সমস্তরকমের ঘরের কাজ আর শিক্ষার হারের বিষয়টি পরস্পর নির্ভরশীল? উত্তর মোটামোটি স্পষ্ট হলেও বিতর্ক চলতেই থাকে। পৃথিবীর অধিকাংশ রন্ধনশিল্পী পুরুষ। ভারতও নেহাত পিছিয়ে নেই এই তালিকায়। অথচ ভারতীয় পুরুষদের ক’জনকে দৈনন্দিন জীবনে হেঁশেল সামলাতে দেখা যাবে, তা বলা ভার। বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়েও পুরুষশাসিত সমাজের অধিকাংশই মনে করেন যে, রান্না করা কিংবা ঘরের অন্যান্য কাজ কেবলমাত্র সংসারের মহিলাদের দায়িত্ব। আজ থেকে কুড়ি বছর আগেও এ বিভাজন হয়তো অনেকখানি সহজ ছিল, কারণ বেশিরভাগ ভারতীয় নারীর গতিবিধি তখনও বাড়ির গণ্ডির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকত। কিন্তু আজকের দিনে সে ছবি বহুলাংশে পাল্টেছে। মহিলারা অনেকেই এখন কেরিয়ারকে তাঁর সাংসারিক জীবনের মতো সমান গুরুত্বে অথবা ক্ষেত্রবিশেষে অধিক গুরুত্বের সঙ্গে দেখেন।
যদিও সাম্য প্রতি এখনও অধরা মাধুরী হয়েই রয়ে গিয়েছে। বরং উদ্ভব হয়েছে এক আরও বিচিত্র অবস্থার। বর্তমানে দেখতে পাওয়া যাচ্ছে যে, চাকুরিক্ষেত্র থেকে ফিরে বাড়ির পুরুষেরা হাত-পা ছড়িয়ে দিব্যি আয়েশ করবার সুযোগ পাচ্ছেন, সপ্তাহান্তে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে বেরোচ্ছেন। কিন্তু উল্টোদিকে মেয়েটির বেলায় পরিস্থিতি আগের চাইতেও জটিল হয়ে গিয়েছে। সে চাকরি থেকে ফিরেই আবার তাড়াতাড়ি ঘরের কাজে বহাল হচ্ছে। একটু আগেই অফিসের প্রোজেক্ট শেষ করে আসা, ট্রেনে-বাসে রীতিমতো ধাক্কাধাক্কি করে ফেরা মেয়েটা বাড়ি ফিরেই টিভির সামনে বসে বিশ্রাম নেওয়া পুরুষটির দিকে বাড়িয়ে দিচ্ছে শরবতের গ্লাস। মেয়েটির জন্যও যে কেউ শরবত এনে দেবে, এমনটা তার প্রত্যাশার মধ্যেই নেই! গৃহকর্মে পুরুষদের সামান্য সাহায্যকেও অত্যন্ত বড় করে দেখানো হচ্ছে সেখানে। যেন মা-বোন অথবা সহধর্মিণীর জন্য চা’টা-জলটা এগিয়ে দেওয়া নিতান্ত উদারতার পরিচয়।
রান্নাঘর তথা ঘরের যেকোনও কাজ যেমন ঝাড়পোঁছ, কাপড় কাচা ইত্যাদিতে কম সময় ব্যয় করতে হলে মেয়েদের ক্ষেত্রে পড়াশুনোর সুযোগ বাড়ে। এর কথাকে সঠিকতর প্রমাণ করতে, প্রসঙ্গ টানা যেতে পারে প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক বাস্তবায়িত ‘জল জীবন মিশন’ প্রকল্পের কথা। সমীক্ষায় জানা যায়, ২০১৯ সালে প্রকল্পটির সূচনার আগে অবধি সমীক্ষাধীন এলাকার মাত্র ১৭ শতাংশ গ্রামীণ ঘর জলের সুবিধা পেত। ২০২৪-এর অক্টোবর নাগাদ এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৮.৬২ শতাংশ-এ। স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া-র রিপোর্ট অনুযায়ী, গ্রামে গ্রামে রীতিমতো উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে মহিলা কর্মীদের সংখ্যা, যার অন্যতম কারণ এই প্রকল্পটি। প্রতিদিন জল তুলতে যে পরিমাণ সময় ব্যয় করতেন গ্রামের মহিলারা, তা এখন তাঁরা বিনিয়োগ করতে পারছেন নানান অন্যান্য কাজে। কৃষিকাজ বা মজদুরি করতেও দেখা যাচ্ছে তাঁদের, যা সাধারণত দাগিয়ে দেওয়া হয় কেবলমাত্র পুরুষদের জন্য বরাদ্দ ‘বাইরের কাজ’ হিসেবে।
এ নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রায়শই বিতর্ক দেখা যায়, যার বেশিরভাগটাই সময়ের অপচয়মাত্র। পুরুষদের একদল বলেন, সবের শেষেও ঘরের কাজ আর বাইরের কাজের মধ্যে ব্যবধান রয়েই যায়। যেসব কাজে প্রচুর শারীরিক শ্রমের দরকার হয়, সেগুলো চেয়েও মহিলারা কখনওই করতে পারবেন না। হাজারও আলোচনার পরেও কোনও নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারে না দুই পক্ষের কেউই।