‘মেইড মার্কেট’! যেন বাড়িতে আসা পরিচারিকারা মানুষ নন, প্রয়োজনীয় কাজের প্রম্পট সম্বলিত কোনও এআই বট। ভারতীয় গৃহস্থরা বার্ষিক হারে যে বিপুল অর্থ গৃহপরিচারিকাদের নিয়োগে ব্যয় করেন, তা নাকি আদতে অপচয় বই অন্য কিছু নয়! যে অ্যাপের মাধ্যমে এর আগে পর্যন্ত প্লাম্বার, ক্লিনার, ইলেকট্রিশিয়ান, বিউটিশিয়ানদের পরিষেবা পাওয়া যেত। এবার সেই তালিকায় যোগ হয়েছেন গৃহসহায়িকারা। কিন্তু ২০২৫ সালে দাঁড়িয়ে এমন পরিষেবার প্রতিশ্রুতি কি বহুলাংশে মানবাধিকারের মৌলিকতাকে লঙ্ঘন করছে না?
“আপনার গৃহসহায়িকা কি গ্রামের বাড়ি যাওয়ার জন্য ঘনঘন ছুটি নেয়? সময়ে কাজে আসে না? প্রায়শই মাইনে বাড়াতে বলে? তাহলে আর দেরি নয়! আজই ডাউনলোড করে ফেলুন বিশেষ অ্যাপ। সরাসরি বুক করতে পারবেন পছন্দসই পরিচারিকা, যিনি সঠিক সময়ে আপনার বাড়িতে পৌঁছে সমস্তরকমের কাজ করে দেবেন। ঘণ্টা প্রতি খরচ মাত্র ৪৯ টাকা!” – এরকম বিজ্ঞাপন নিশ্চয়ই আপনার চোখে পড়েছে। সম্প্রতি এমন পরিষেবা চালু করেছে একটি অ্যাপ। যে অ্যাপের মাধ্যমে এর আগে পর্যন্ত প্লাম্বার, ক্লিনার, ইলেকট্রিশিয়ান, বিউটিশিয়ানদের পরিষেবা পাওয়া যেত। এবার সেই তালিকায় যোগ হয়েছেন গৃহসহায়িকারা।
কিন্তু ২০২৫ সালে দাঁড়িয়ে এমন পরিষেবার প্রতিশ্রুতি কি বহুলাংশে মানবাধিকারের মৌলিকতাকে লঙ্ঘন করছে না?
সংস্থাটির বিজ্ঞাপনে দেখা যাচ্ছে, একরাশ নোংরা বাসনের সামনে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছেন একজন মহিলা। পরনে পরিপাটি ইউনিফর্ম। অনেকটা কর্পোরেট ধাঁচেই গৃহসহায়িকাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে সংস্থাটি, ঠিক যেভাবে পাঁচতারা হোটেল কিংবা রেস্তরাঁয় পরিষেবা দেওয়া হয়, তেমনটাই।
আমরা জানি, বিজ্ঞাপনের যাই-ই বলুক না কেন, ঘণ্টাপ্রতি মাত্র উনপঞ্চাশ টাকা দরে নির্দ্বিধায় অমানবিক খাটনি খাটতে রাজি হয়ে যে মানুষটি আমাদের বাড়ির দরজায় এসে দাঁড়াবেন, তাঁর চেহারা বিজ্ঞাপনের সঙ্গে মিলবে না। চোখেমুখে উদ্বেগ থাকবে, কপালে বলিরেখা। কোম্পানি প্রদত্ত ইউনিফর্ম যদি তিনি পরেও থাকেন বা সামান্য পোশাকি বুলি রপ্ত করেও ফেলেন, তবুও ছবির মডেলটির মতো হওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। বিজ্ঞাপন জানায়, বুকিং-এর পর মাত্র পনেরো মিনিটেই চলে আসবেন পরিচারিকা, যা কিনা “পিৎজার চাইতেও তাড়াতাড়ি”! সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার আবার ব্যখ্যা করেন, এ নাকি ভারতের অগোছালো ‘মেইড মার্কেট’-কে গুছিয়ে নেওয়ার প্রচেষ্টা মাত্র।
‘মেইড মার্কেট’! যেন বাড়িতে আসা পরিচারিকারা মানুষ নন, প্রয়োজনীয় কাজের প্রম্পট সম্বলিত কোনও এআই বট। তাঁদের গ্রামের বাড়ি যাওয়ার বাসনা থাকবে না। বাড়ির বাচ্চাটির স্কুলের ফি অথবা অসুস্থ স্বামীর ওষুধের বিল মেটাতে বাড়তি মাইনের প্রয়োজন পড়বে না। যাঁর কায়িক শ্রমকে মেপে নেওয়া সম্ভব হবে সামান্য কিছু খুচরো টাকায়। কারণ ভারতীয় গৃহস্থরা বার্ষিক হারে যে বিপুল অর্থ গৃহপরিচারিকাদের নিয়োগে ব্যয় করেন, তা নাকি আদতে অপচয় বই অন্য কিছু নয়! আপাতত মুম্বইয়ের নির্দিষ্ট কিছু জায়গার জন্য এই পরিষেবা চালু হলেও সত্ত্বর যাতে ভারতের নানা জায়গায় ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হয়, সে প্রচেষ্টায় রয়েছে কোম্পানিটি।
ঠিক কতদূর গড়িয়ে যেতে পারে এর পরিণাম? কাজ পাওয়ার জন্য অবশ্যই উল্টোদিকে এহেন কাজে ইচ্ছুক ব্যক্তিরা নিজেদের নাম নথিভুক্ত করবেন। হয়তো দেখা যাবে যে, কোনও পরিচারিকা যদি এর অধীনস্থ না হয়ে আগের নিয়মে বাড়ি বাড়ি গিয়ে সাধারণ যোগাযোগের ভিত্তিতে কাজের খোঁজ করেন, তাঁকে ফিরতে হবে খালি হাতে। তাঁর মাসপ্রতি বেতনের আরজি সদর্পে নাকচ করে দেবে ঘণ্টাপ্রতি বেতনভিত্তিক স্বল্পস্থায়ী কর্মীলাভের চকচকে অফার। অগত্যা বেঁচে থাকার খাতিরেই বড় পুঁজির আগ্রাসনের সামনে আত্মসমর্পণ করতে হবে সেই ব্যক্তিকে। ঠিক যেভাবে রিটেল মার্কেটকে গিলে ফেলেছে বড় পুঁজির কর্পোরেট চেন। উপার্জনের বাজার তৈরি করে, আসলে তা মানুষের স্বাধীনতাকেই কেড়ে নিতে চায় এক লহমায়।
ইতিমধ্যেই এর বিরুদ্ধে সরব হয়েছে বেঙ্গালুরুর ‘ডোমেস্টিক ওয়ার্কার্স রাইটস্ ইউনিয়ন’ (DWRU) এবং ‘স্ত্রী জাগ্রুতি সমিতি’। তাদের মতে, ঘরোয়া শ্রমের এই ‘করপোরেটাইজেশন’ একাধারে শোষণমূলক ও অমানবিক। এর পাশাপাশিই, লিঙ্গ-নিরপেক্ষ যে-কোনও শব্দ ব্যবহারের অবকাশ থাকতেও ‘মেইড’ শব্দটির ব্যবহার যৌন বৈষম্যের দিকেও ইঙ্গিত করে। যদিও এহেন দাবি খারিজ করতে, দ্রুততার সঙ্গে উক্ত কোম্পানি অ্যাপটির নাম বদলের পথে হেঁটেছে। তবুও অন্যান্য অভিযোগগুলি সম্পর্কে কর্মকর্তাদের উদাসীনতা চোখে পড়বার মতো বটে!
সাধারণত দৈনন্দিন জীবনে ঘর ঝাঁট দেওয়া বা বাসনে ছোবড়া ঘষার ফাঁকে সামাজিক নিরাপত্তা, চুক্তিভিত্তিক সুযোগসুবিধা বা নির্দিষ্ট ছুটির স্বাদ আস্বাদন করবার সৌভাগ্য হয় না গৃহপরিচারিকাদের। একই হাল ‘গিগ’ কর্মীদেরও। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় যে রবিবার অথবা কোনও ছুটির দিনেও কাজ থেকে তাঁদের নিস্তার মিলছে না। আর পাহাড়প্রমাণ কাজের বিপরীতে যৎসামান্য বেতন ধরিয়ে দেওয়ার ঘটনা তো আকছার ঘটে থাকে। প্রযুক্তির উন্নতিকে কাজে লাগিয়ে এ অবস্থার ঠিক সমাধান খোঁজার বদলে, ন্যূনতম বেতনের মাত্রা নির্দিষ্ট করবার বদলে, এ জাতীয় অ্যাপের আবিষ্কার যেন মধ্যযুগীয় ক্রীতদাস প্রথাকে নতুন করে উস্কে দেয়। ইন্ডিয়ান ফেডেরেশন অফ অ্যাপ বেসড ট্রান্সপোর্ট ওয়ার্কার্স, তেলেঙ্গানা গিগ ও প্ল্যাটফর্ম ওয়ার্কার্স ইউনিয়ন-সহ বেশ কিছু সংগঠন এর প্রতিবাদ জানালেও সমাজমাধ্যমে প্রকাশিত বিজ্ঞাপনটির কমেন্টবক্স জানাচ্ছে সে আশঙ্কার কথা।
এ যেন, এক সংকটের সমাধান করতে গিয়ে ডেকে আনা হচ্ছে আর এক সংকটকে। তথাকথিত উচ্চবিত্ত সম্ভাব্য ক্রেতারা প্রশ্ন তুলেছেন, আগত পরিচারিকা যদি বেশি টাকার লোভে সামান্য কাজ ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে করে চলেন? গৃহকর্তা যদি বিপুল কাজের ভার কম সময়ে শেষ করতেই হবে, এমন দায় চাপিয়ে দেন পরিচারিকার ঘাড়ে? পালটা প্রশ্ন মানবাধিকার কর্মীদের। আর এসবের মাঝে গ্যারান্টি-সহ সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার জানাচ্ছেন, এই বিচক্ষণ পদক্ষেপ সংস্থার ঘরে এনে দেবে বিপুল মুনাফা।
তাহলে ব্যাপারটা আদতে কী হল? জীর্ণ-দীর্ণ হতক্লান্ত উনপঞ্চাশ টাকার ভারতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে দামী গাড়ি-বাড়ি-গ্লাস স্কিনের অধিকারী দৈত্যাকার বিলিয়ন ডলারের ‘ইন্ডিয়া’। মাঝে এঁটো বাসন, মেঝেময় ধুলো, আর আকাচা জামার স্তূপ। এই কি আমাদের ভবিষ্যৎ! আমাদের ভারতবর্ষ! অ্যাপের বাটন ক্লিক করার আগে আমরা কি একবারও ভাবনা যে, মানুষ হয়ে মানুষের মূল্য কমিয়ে দিচ্ছি আমরাই?