৫-১ গোলে টটেনহ্যামকে হারিয়ে এবারের ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে চ্যাম্পিয়ন সালাহরা। এই নিয়ে ২০ বার ইপিএল খেতাব জিতে ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেডকে ছুঁয়ে ফেলল লিভারপুল। খেলার দুনিয়ায় এমনটা হতেই পারে। তাই দলের উচ্ছ্বাস বা জয় কোনওটাই অবাক করার বিষয় নয়। কিন্তু এদিনের উল্লাসে মিশেছিল বেঁধে বেঁধে থাকার বার্তা।
দল জিতেছে (Liverpool Football Club)। খেলোয়াড়দের উচ্ছ্বাস, দর্শকদের উল্লাস, মাঠে নেমে এসেছেন সাপোর্টিং স্টাফরা। সবাই একে অন্যকে জড়িয়ে ধরছেন। কেউ কেউ আনন্দে কেঁদেও ফেলছেন। যেন রৌদ্রতপ্ত দিনের শেষে কালবৈশাখী, সবাই একসঙ্গে ভিজতে বেরিয়ে পড়েছে!
এ দৃশ্য খুব অচেনা নয়। বিশ্বকাপ জয় কিংবা শিল্ড জেতা, বিজয়ী দলের এমন উচ্ছ্বাস চোখে পড়ে। সম্প্রতি, যে আনন্দের স্বাদ পেয়েছে লিভারপুল (Liverpool Football Club)। ৫-১ গোলে টটেনহ্যামকে হারিয়ে এবারের ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে চ্যাম্পিয়ন সালাহরা। এই নিয়ে ২০ বার ইপিএল খেতাব জিতে ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেডকে ছুঁয়ে ফেলল লিভারপুল। খেলার দুনিয়ায় এমনটা হতেই পারে। তাই দলের উচ্ছ্বাস বা জয় কোনওটাই অবাক করার বিষয় নয়। কিন্তু এদিনের উল্লাসে মিশেছিল অদ্ভুত এক বেঁধে বেঁধে থাকার বার্তা। ম্যাচের শেষে দর্শকদের সঙ্গে গলা মিলিয়ে খেলোয়াড়, সাপোর্টিং স্টাফদের ‘ইউ উইল নেভার ওয়াক অ্যালোন’ বুঝিয়েছে, এ জয়গান আদতে জীবনেরই জয়গান। এই মিলেমিশে থাকাই আগামীদিনে এগিয়ে যাওয়াকে নিশ্চিত করবে। বিশেষ করে এই অস্থির সময়, বেঁধে বেঁধে থাকাটা ঠিক কতটা জরুরি, তা বুঝিয়েছে লিভারপুলের (Liverpool Football Club) এই সেলিব্রেশন।
বিগত ৬ দশক ধরে এই গান লিভারপুলের (Liverpool Football Club) অ্যান্থেম। দলের জয় কিংবা সাফল্য উদযাপনে এই গানই বাজে। ফ্যানদের কাছেও এই গানের আবেগ নেহাতই কম নয়। কিন্তু একসঙ্গে গ্যালারিতে দাঁড়িয়ে, দলের জয় উদযাপনে এই গান গাওয়ার সুযোগ মিলেছে বহুদিন পর। তাই এদিনের সমবেত জয়গান অনেকেরই চোখের কোনে জল এনেছে। খেলোয়াড়রাও যেভাবে মাঠে দাঁড়িয়ে ফ্যানেদের সঙ্গে গলা মিলিয়েছেন, তা নজিরবিহীন। এই জয় তাঁদের প্রত্যেকের। সেটা সর্বসমক্ষে স্বীকার করে নেওয়াই যেন এই সমবেত সঙ্গীতের মূল উদ্দেশ্য ছিল। জানা যায়, এই গান প্রথমবার গেয়েছিলেন জেরি মার্সডন নামে এক স্থানীয় গায়ক। তিনি নিজেও লিভারপুলের ফ্যান ছিলেন। ১৯৬৩ সালে গাওয়া সেই গান বেশ জনপ্রিয় হয়। লিভারপুলের (Liverpool Football Club) তৎকালীন কোচ বিল সাঙ্কলে গানটির কপি উপহার দিয়েছিলেন গায়ক। সেই থেকে দলের অন্দরেও গানটির চর্চা শুরু হয়। তবে গানটির আসল জনপ্রিয়তা ১৯৮৯ সালের পর থেকে। এফএ কাপের সেমিফাইনাল ম্যাচে দর্শকদের মধ্যে চূড়ান্ত বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। বিষয়টা এমনই মারাত্মক আকার নেয় যে ৯৭ জন ফ্যান ঘটনাস্থলে প্রাণ হারান। সেই সময় এই গানই ছিল লিভারপুলের আশার আলো। ক্লাব এবং তার ফ্যানেরা যে আলাদা নয়, সেটাই বারবার বুঝিয়ে দেওয়া গানের মাধ্যমে। আর বিষয়টা খুব স্পষ্ট হয় গানের প্রতিটা কথায়। ‘ইউ উইল নেভার ওয়াক অ্যালোন’ অর্থাৎ তোমায় কখনও একা হাঁটতে হবে না!
আসলে জীবন তো একা একা বেঁচে নেওয়ার নয়। মিলেমিশে থাকার আনন্দটা উপভোগ করতে হবে। খেলার ক্ষেত্রেও সেকথা সর্বত সত্য। দলগত খেলায় প্রত্যেক খেলোয়াড়ের সমান অংশগ্রহণ দলকে জেতাতে পারে। শুধুমাত্র যারা মাঠে নেমে খেলছেন তারা নয়, মাঠের বাইরে যারা সমর্থন জানাতে এসেছেন তাঁরাও জয়ের জন্য সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দুদিকের ভারসাম্য যেন নষ্ট না হয় সেকথাই বুঝিয়ে দেয় এই গান। তবে একে জীবনের জয়গান বলার কারণ রয়েছে। সেক্ষেত্রে ফিরবে কোভিড প্রসঙ্গও। এই মুহূর্তে বিশ্বজুড়ে অতিমারির আতঙ্ক কাটলেও, এই কিছুদিন আগে অবধি তা ভয়ঙ্করভাবে দানা বেঁধেছিল অনেকের মনে। সেক্ষেত্রে সবথেকে সমস্যা হয়েছিল যে বিষয়টা নিয়ে, তা হল হাতে হাত রেখে এক হওয়া। নিজেকে সুস্থ রাখার যে প্রবল চেষ্টা, তা আদতে কতদূরে ঠেলেছিল পাশাপাশি থাকা দুজনকে তা বলাই বাহুল্য। লিভারপুলের সমর্থকরাও (Liverpool Football Club) এই কোভিডের কারণেই দীর্ঘদিন গ্যালারিতে জমায়েত হতে পারেননি। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে জয়গান গাইতে পারেননি। অবশেষে এক হওয়ার সুযোগ পেলেও, গান গাওয়ার পরিস্থিতি উপহার দিতে পারেনি দল। তাই এতদিনের প্রতীক্ষা শেষে, যেন প্রাণভরে জল খেতে পেরেছে চাতক পাখি।
এই প্রসঙ্গ ধরেই ফিরে দেখা যায়, যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশগুলোর দিকে। চারিদিকে হাহাকার, ধ্বংচিহ্ন, অথচ কেউ কাউকে ছেড়ে চলে যাচ্ছেন না। বরং একসঙ্গে জুড়ে জুড়ে থাকতে চাইছেন আরও। রমজান মাসে রাস্তায় নেমে একসঙ্গে সার বেঁধে ইফতার পালন করলেন গাজার মানুষজন। গোটা বিশ্ব তাকিয়ে দেখল সেই ছবি। কিংবা ক্ষোভ, সেই যে চিকিৎসক তরুণীর মৃত্যুর প্রতিবাদে সবাই রাস্তায় নামল, হাতে হাত রেখে মানববন্ধনে জুড়ল। সেই ছবিও ভোলার নয়। মৃত্যু আসন্ন বুঝেও পাশের মানুষটিকে ছেড়ে না যাওয়া আসলে সেই জুড়ে থাকার কথাই মনে করিয়ে দেয়। সুতরাং যুদ্ধ, ক্ষোভ, মৃত্যু, বিদ্বেষ পেরিয়েও পৃথিবী যে জুড়ে জুড়েই থাকতে চায়, তা অনায়াসে বলা যায়। জয় পেরিয়ে ফুটবল শিখিয়ে দেয় সেই জীবনের মূলমন্ত্র। বেঁধে বেঁধে থাকাই আসলে এগিয়ে যাওয়ার পথটাকে সহজ করে। একসঙ্গে জীবনের গান গাইতে পারাটাই তখন আসল জয়।