কেউ কেউ কান্না লুকোতে পারেন, কেউ পারেন না। তবে ইতিহাস সাক্ষী আছে, কোনওমতে কান্না ঢাকার চোখ মনে থেকে যায় বহুদিন। ঠিক যেমনটা থেকে গিয়েছে শচীনের কান্না, কাম্বলির কান্না। ঠিক যেমনটা থেকে যাবে বৈভবের কান্না।
ডিসেম্বর, ১৯৮৯। ২২ গজে ভারত বনাম পাকিস্তানের মহারণ। খেলা চলছে শিয়ালকোটে। প্রথম ইনিংসে ৩২৪ রান ঝুলিতে ভরেছে ভারত। বেশ লড়াই করে। ব্যাট করতে নেমে পাকিস্তানের সংগ্রহ ২৫০। দ্বিতীয় ইনিংসে ভারতের পাল্টা লড়াই। ব্যাট হাতে দাপট দেখালেন নভজ্যোত সিং সিধু। কিন্তু ধস নামল মিডল অর্ডারে। পাক বোলারদের দাপটে ফিরে গেল ভারতীয় ব্যাটিংয়ের রথী-মহারথী। পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যাট হাতে নামল বছর ষোলোর ছেলেটা! ছোটখাটো চেহারা, ঝাঁকড়া চুল, ব্যাট হাতে তাকেই কি না সামলাতে হবে আক্রাম, ইউনিসদের মতো দুর্ধর্ষ পেস-বোলারকে, সবুজ-ভরা শিয়ালকোটের পিচে। অঘটনটা ঘটলও শেষমেশ একটা সময়। দুরন্ত গতিতে ছুটে এল ইউনিসের ঘাতক-বাউন্সার, আছড়ে পড়ল বাচ্চা ছেলেটার নাকে, ঝরঝর করে ঝরে পড়ল রক্ত, ভিজল সাদা-পোশাক, ভিজল ক্রিকেটের ধাত্রীভূমি। উৎকণ্ঠায় ভরা এমন পরিস্থিতিতে সমবেত সকলেই ভেবেছিল ড্রেসিংরুমে ফিরে যাবে নিশ্চয় ছেলেটা। রক্তের স্বাদ-পাওয়া ছেলেটা ভেবেছিল অন্যকিছু। ভাঙা গলায় নাকের রক্ত মুছতে মুছতে বললেন, ‘ম্যায় খেলেগা’!
বাকিটা ইতিহাস, আর সে ইতিবৃত্ত সকলের জানা। সেই বছর ষোলোর শিয়ালকোটের ‘শিশু’ আজকের কিংবদন্তি শচীন তেণ্ডুলকর, এ তথ্যও সকলের জানা। তাহলে হঠাৎ ‘মাস্টার ব্লাস্টার’কে মনে করা কেন। কারণ একটাই। সম্প্রতি, আইপিএলের লখনউ বনাম রাজস্থানের ম্যাচ এক লহমায় ফেরাল সেই স্মৃতি। নাহ না, কেউ আহত হননি। চোট নিয়ে দুরন্ত ইনিংস খেলার নজিরও গড়েননি। তবে শচীনের মতো ‘ম্যায় খেলেগা’ বলতে চেয়েছেন একজন। কান্নাভেজা গলায় সে শব্দ কেউ শুনতে পায়নি। কিংবা হয়তো এত আলো, এত আওয়াজ, এত আয়োজনে সেই আর্তি ঢেকে গিয়েছে।
কথা বলছি বৈভব সূর্যবংশী সম্পর্কে। রাজস্থানের এই খেলোয়াড় আইপিএলের ইতিহাসে সর্বকনিষ্ট। মাত্র ১৪ বছর বয়সে আইপিএলে অভিষেক হল তাঁর। আর মাঠে নেমেই একগুচ্ছ রেকর্ড ঝুলিতে ভরলেন বৈভব। শার্দুল ঠাকুরের মতো পোড়খাওয়া পেসারকে প্রথম বলে ছক্কা হাঁকানো মুখের কথা নয়! তার চেয়েও অবাক করা বিষয় এমনটা যিনি করছেন, তাঁর বয়স মাত্র ১৪! আইপিএলের মতো বড় আসরে ব্যাপারটাকে ম্যাজিক বললে বোধহয় ভুল হয় না, অন্তত গুগলের সিইও সুন্দর পিচাই তেমনটাই মনে করেছেন। ক্রিকেটবোদ্ধারা অবশ্য বলতেই পারেন এতটাও অবাক হওয়ার কিছু নেই। এর আগেও অনেকে অভিষেক ম্যাচের প্রথম বলে ছক্কা হাঁকিয়েছেন। অস্বীকারের উপায় নেই। কিন্তু এঁদের মধ্যে ক’জন আউট হওয়ার পর কেঁদেছেন? তাও আইপিএলের ম্যাচে?
উত্তরটা হয়তো শূন্য। আর এখানেই নিজেকে আলাদা করে ফেলেছেন বৈভব। আউট হয়ে মাঠ ছাড়ার সময় তাঁর চোখের জল, এক লহমায় ফিরিয়েছে অনেক পুরনো স্মৃতি। ফিরে এসেছে বিনোদ কাম্বলির কান্না, মনে পড়েছে বিশ্বকাপ সেমিফাইনাল হারের পর ল্যান্স ক্লুজনারের চোখের জল। এমন আরও অনেক কিছু। বৈভব হয়তো এত কিছু ভাবেননি, কিন্তু যে আবেগ একজন খেলোয়াড়ের থাকাটা খুব স্বাভাবিক, সেটা তাঁর রয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্রিকেটের বদলে যাওয়া হয়তো তাঁকে সেইভাবে এখনও প্রভাবিত করতে পারেনি। আইপিএল মানেই বেটিং, খেলার নামে স্রেফ ব্যবসা-বিনোদন, এমনটা হয়তো মনে করে তামাম বিশ্ব। বৈভব মনে করেন না। আইপিএল তাঁর কাছে ক্রিকেট-আরাধনা। তাই আউট হয়ে যাওয়া, আর একটিও বল খেলতে না পারা তাঁর কাছে আরাধ্যের থেকে বিচ্যুতি। তাই ওই নতমুখে দু’ফোঁটা চোখের জল। যা তাঁর গলার কাছে আটকে দিয়েছে দুটো শব্দ, অস্ফুটে হয়তো বলেছেন নিজেকেই, ‘ম্যায় খেলেগা’!
আশ্চর্যের বিষয়, এইসব কান্নাভেজা মাঠের কথা, গল্পের মতোই শুনেছেন বৈভব। মাত্র ১৪ বছরের জীবনে জ্ঞান হওয়া ইস্তক যে ক্রিকেট তিনি দেখেছেন, তাতে আর যাই থাকুক এমন আবেগ ভরা কান্না নেই। হয়তো বিনোদ কাম্বলির কান্না দেখেননি বলে কটাক্ষও শুনেছেন বৈভব। তবু তাঁর মধ্যে দিয়েই সেই স্মৃতি খুঁজে পেলেন অনেকে। সেই ১৯৯৬-র ভুলতে না পারা রাত। বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে ভারতের হার, দর্শকদের উত্তাল আচরণ, মাঠ ছাড়ার সময় বিনোদ কাম্বলির কান্না, এক লহমায় মনে পড়েছে আরও কত কিছু। শুধু দুঃখ কেন, আনন্দের কান্নাও কম দেখেনি ক্রিকেট মাঠ। ২০১১-র বিশ্বকাপের ফাইনাল এমন কতশত মুহূর্ত ধরে রেখেছে তার ইয়ত্তা নেই। তবে কর্পোরেট ক্রিকেটের দুনিয়ায় এইসব দৃশ্য বড় বেমানান। আন্তর্জাতিক ম্যাচে তাও একটা ব্যাপার থাকে, কিন্তু আইপিএলে এই ধরনের ঘটনা বিরল। নেই বললেই চলে। চারিদিকে আলো, চাকচিক্যে ভরা গ্যালারি, সারি সারি ক্যামেরার ভিড়ে চোখের জল মুছতে খুব একটা দেখা যায় না কোনও খেলোয়াড়কে। হোক না মাত্র কয়েক রানের জন্য দল হারল, হোক না ১ রানের জন্য হাফ-সেঞ্চুরি ফসকাল, তবু কেমন নির্লিপ্ত সব কিছু। তাই হয়তো সহজেই এমন বয়ান প্রতিষ্টিত হয়, ‘সবটাই সাজানো, সবটাই মেকি’।
এসবের ভিড়ে ব্যতিক্রম হয়ে থেকে গেলেন বৈভব। হয়তো আগামীতে অনেক বড় মাপের কোনও খেলোয়াড় হবেন বছর ১৪-র এই ব্যাটার, কিংবা হয়তো হারিয়ে যাবেন, তবে তাঁর এই কান্না থেকে যাবে। যেখানে নিজের সেরাটুকু দেখানোই সকলের প্রধান উপজীব্য, সেখানে ব্যর্থতা নিয়েও প্রকাশ্যে আবেগের বহিঃপ্রকাশ, আলাদা করেছে বৈভবকে। খেলার জন্য যে প্রবল ইচ্ছা সেটাও স্পষ্ট হয়েছে তাঁর চোখে। নেটদুনিয়া বিষয়টাকে মজার ছলেই দেখেছে। বৈভবের কান্না দেখে অনেকেই কটাক্ষ করেছেন, ‘এতক্ষণে বিশ্বাস হল এর বয়স সত্যিই ১৪’! আশা রাখি তাঁদের এই বিশ্বাস যেন চট করে না ভাঙে। শুধু কান্না নয়, ব্যাটের দাপটেও বৈভব যেন বুঝিয়ে দিতে পারেন বয়সটা স্রেফ সংখ্যামাত্র।