বডি বিল্ডিং করেন। অথচ নিয়মিত পান্তা ভাত খান। এমন কথা শুনলে অনেকেই হাসবেন। তবে একটা নাম শুনলে এঁরা সকলেই লজ্জায় মাথানত করতে পারেন। বিশ্বশ্রী মনোহর আইচ। বাঙালির দেহচর্চার এক অধ্যায়। ১০৪ বছর বয়সেও দিব্য নিজের কাজ নিজেই করতে পারতেন। তবে জীবনের বেশ কিছুটা অংশ জেলে কাটাতে হয়েছিল তাঁকে। কেন জানেন? আসুন শুনে নেওয়া যাক।
ছোট্ট একটা ঘর। একটাও জানলা নেই। সামনে লোহার গরাদ। ওপারে আরও অনেক ঘর। চিৎকার, হুল্লোড়, অপশব্দ। এসবের মাঝে ছোট্ট ঘরে একজন ডন-বৈঠক করছেন। একশো, দেড়শো, দুশো, পাঁচশো..। সময়ের হিসাব নেই। খাওয়া, ঘুম কিচ্ছু নেই। স্রেফ একটাই ধ্যান-জ্ঞান, শরীরচর্চা।
জেলবন্দী কয়েদির এমন আচরণ দেখে চমকে গিয়েছিলেন ব্রিটিশ সাহেবরাও। সেল বদল হল। আলাদা ডায়েট ঠিক হল। সেসব নিয়েও ভাবার সময় নেই, কয়েদির। তিনি শুধু একটাই জিনিস বোঝেন, শরীরচর্চা। প্রয়োজন নেই কোনও যন্ত্র, দরকার নেই অন্য কারও সাহায্য, নিজের জন্য তিনি নিজেই যথেষ্ট। সময়টা প্রায় ৭০ বছর আগেকার। তখনকার জেলের গঠন ছিল আলাদা। কয়েদিদের ভিড়ে স্বাধীনতা সংগ্রামীই বেশি। তাই অত্যাচারের বহর ছিল অন্যরকম। এসবের ভিড়ে ব্যতিক্রমী হয়েই ধরা দিয়েছিলেন মনোহর আইচ। তিনি অবশ্য স্বাধীনতা সংগ্রামের দায়ে জেলবন্দী হননি। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার মাশুল হিসেবেই এমন সাজা শুনতে হয়েছিল তাঁকে।
পান্তা ভাত খেয়ে মুগুর ভাঁজা। এমনটাই ছিল রোজের রুটিন। তবে ৭ ফুট লম্বা কাউকে অনায়াসে ধরাশায়ী করতে পারতেন। এদিকে তাঁর উচ্চতা, মাত্র ৪ ফুট ১১ ইঞ্চি। বাঙালির দেহচর্চার বড় একটা অধ্যায় তাঁকে কেন্দ্র করেই লেখা যায়। তিনি যে আদ্যপান্ত বাঙালি, তা খাদ্যাভ্যাসেই বেশ টের পাওয়া যেত। সে যুগে ফুড সাপ্লিমেন্টের বালাই নেই। তাই ভাত-ডাল-পুঁইশাক চচ্চড়ি খেয়েই শরীরচর্চা করতেন। মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন, দেহ হল মন্দির। তাই পরম ভক্তিতে তার যত্ন নিতেন। উচ্চতার কারণে নাম হয়েছিল ‘পকেট হারকিউলিস’। তাতেই অবশ্য অধিক পরিচিত হয়েছিলেন। স্রেফ অধ্যাবসায় আর নিষ্ঠার উপর ভর করে, বিশ্বজয় করেছিলেন। স্বাধীন ভারতের দ্বিতীয় মি. ইউনিভার্স তিনিই। এছাড়া ঝুলিতে রয়েছে আরও কত সম্মান।
মিষ্টভাষী ও বন্ধুত্বপূর্ণ স্বভাবের জন্য ক্রীড়ামহলে ভালবাসার পাত্র ছিলেন৷ জীবনে কখনও মদ-সিগারেট ছুঁয়ে দেখেননি। বিশ্বের তাবড় সব, বডি বিল্ডারদের কাছে তাঁর ফিটনেস ছিল বিস্ময় ও গবেষণার বিষয়৷ ১৯৫১ সালে মিস্টার ইউনিভার্সের খেতাব জেতেন৷। সেই নিয়ে অবশ্য তেমন গর্ব ছিল না। সাধারণ জীবনযাপন বদলাননি। তবে এই মনোহরের জীবনের শুরুটা ছিল একেবারে অন্যরকম। পেশিবহুল চেহারা দূর অস্ত, ছোট থেকে রুগ্নতায় ভুগতেন। কমবয়সে একবার কালাজ্বরে আক্রান্ত হন। তাতে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসেন। ধীরে ধীরে নিজের শরীরের প্রতি যত্ন নেওইয়া, অভ্যাস বানিয়ে ফেলেন। উচ্চতা কম হওয়া সত্ত্বেও, রয়্যাল বায়ু সেনায় যোগ দেওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। এই সময় থেকেই শরীরচর্চায় মন দেন মনোহর৷ ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ওই সেনায় থাকার সময়েই। আসলে, সেনার ভারতীয় জওয়ানদের ব্রিটিসদের উচ্ছিষ্ট খাবার দেওয়া হত সেকালে। এই নিয়ে ঘোর আপত্তি ছিল মনোহরের। কিন্তু সরকারের বিরুদ্ধে এমন আপত্তি সহ্য হয়নি কারও। তাই গরাদের ওপারে যেতে হয়। অবশ্য নিজের গুণেই সাজা কমিয়েছিলেন। ভারত স্বাধীন হওয়ার পরে পরেই জেল থেকে মুক্ত হন। এতদিন জেলে থেকেও যেভাবে শরীরচর্চার অভ্যাস বজায় রেখেছিলেন, তা অবাক করার মতোই। এইসময় তাঁকে দেখে অনুপ্রাণিত হতেন বলিউডের নায়করাও৷ একবার নয়, বডি বিল্ডার হিসেবে একাধিকবার দেশের মুখ উজ্জ্বল করেছেন মনোহর আইচ৷ তিনবার এশিয়ান গেমসে সোনা জিতেছেন। বয়স কখনওই তাঁর পথের কাঁটা হতে পারেনি৷ ৯০ বছর বয়সে শেষবার বডিবিল্ডিংয়ের মঞ্চে উঠেছিলেন৷ তখনও তাঁর চেহারা ছিল ঈর্ষণীয়। এরপর মঞ্চে দেখা না গেলেও, শরীরচর্চার অভ্যাস ছাড়েননি। হাসিমুখে ১০০ পার করেন। বয়সজনিত রোগ ছাড়া তেমন কোনও সমস্যা ছিল না। অসংখ্য ছাত্র আর অনুরাগীদের রেখে ১০২ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বিশ্বশ্রী। তবে জীবদ্দশায় তিনি যে সুস্থতার পাঠ দিয়ে গিয়েছেন, তা মনে রাখবে আগামী কয়েক প্রজন্ম, তা অনায়াসে বলা যায়।