শীর্ষস্তরে নারীদের পৌঁছনো, সুশাসনের দৃষ্টান্ত স্থাপন করার সাক্ষী আগেও থেকেছে এই দেশ। যদিও জনকল্যাণকামী রাষ্ট্রব্যবস্থায় তাতে বিশেষ হেরফের হওয়ার কথা নয়। তবে তারপরেও অনেক বিষয় থেকে যায়, যা পুরুষদের দ্বারা চালিত প্রশাসনের সমালোচনার পথ খুলে দেয়। কেননা অনেক ক্ষেত্রেই প্রশাসন পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টির পরিচয় দেয়।
ভারতীয় রাজনীতিতে মহিলাদের অন্তর্ভুক্তি এবং সক্রিয় অংশগ্রহণ নিয়ে দীর্ঘকাল নানা আলোচনা চলেছে। নারীদের ভোটাধিকার অর্জন থেকে বর্তমান রাজনীতির চালিকাশক্তির আসনে গিয়ে পৌঁছনোও এক দীর্ঘ যাত্রা। এর পাশাপাশি প্রশাসনিক স্তরে নারীদের অংশগ্রহণ যে দেশের প্রশাসনে অন্য মাত্রা নিয়ে আসে, সে দৃষ্টান্তও ক্রমে ক্রমে দেখা গিয়েছে। অর্থাৎ এই দুই ক্ষেত্রে নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ যেমন নারীশক্তির জন্য জরুরি, তেমনই সামগ্রিক দেশের স্বার্থেই একান্ত প্রয়োজনীয়। এক দিনে অবশ্য তা সম্ভব হয়নি। একক কৃতিত্বের বিচ্ছিন্ন উদাহরণ পেরিয়ে ক্রমশ তা এক ধারাবাহিকতার দিকে এগিয়েছে। সেই যাত্রাপথেই নতুন মাইলফলক হিমাচল প্রদেশের লাহুল-স্পিতি। জেলা প্রশাসনের সব শীর্ষপদের দায়িত্ব এই মুহূর্তে সামলাচ্ছেন নারীরা। নারীচালিত জেলা-প্রশাসনের এই দৃষ্টান্ত যেন দেশের রাজনীতি ও প্রশাসনে লিঙ্গসাম্যের ধারণাকেই আর একটু স্বচ্ছ এবং স্পষ্ট করে তুলল।
প্রশাসনিক পদের শীর্ষস্তরের দায়িত্ব নারীরা এর আগেও পালন করেছেন। প্রধানমন্ত্রী থেকে মুখ্যমন্ত্রীত্বের ইতিহাস তো আছেই। দেশের রাষ্ট্রপতি পদেও আসীন হয়েছেন নারীরা। অর্থাৎ ভারতের রাজনীতি ও প্রশাসনে নারীর অংশগ্রহণ নতুন কিছু নয়। তবে, একটি গোটা জেলা-প্রশাসনের সব শীর্ষপদেই নারীরা আছেন, এমনটা আগে হয়নি। সেই নিরিখে লাহুল-স্পিতি ইতিহাস গড়ল বলা যায়। সম্প্রতি সেখানকার ডেপুটি কমিশনার হয়েছেন আইএএস অফিসার কিরণ বদানা। তাঁর নিয়োগেই এই বৃত্ত সম্পূর্ণ হয়েছে। স্পিতি যেহেতু মান্ডির অন্তর্গত, তাই এখানকার সাংসদ হচ্ছেন কঙ্গনা রানাউত। এদিকে এলাকার বিধায়ক হয়েছেন অনুরাধা রানা। প্রশাসনের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পদেও এই মুহূর্তে আছেন নারীরাই। জেলা পরিষদের চেয়ারপার্সন পদে আছেন বীণা দেবী। ইলমা আফরোজ সদ্য পুলিশ সুপার হিসাবে নিযুক্ত হয়েছেন। এসডিএম পদে আছেন আকাঙ্ক্ষা শর্মা এবং অতিরিক্ত ডেপুটি কমিশনারে দায়িত্ব সামলাচ্ছেন শিখা সিমিতা। অর্থাৎ এই মুহূর্তে জেলা প্রশাসনের পুরোটাই দেখভাল করছেন নারীরাই। দেশের রাজনীতিতে এই পদক্ষেপ পরীক্ষামূলক। গত বছরই সেখানকার মুখ্যমন্ত্রী এই ইচ্ছের কথা জানিয়েছিলেন। বলেছিলেন, এমন একটি জেলা-প্রশাসন তিনি চান, যা নারীদের দ্বারাই পরিচালিত হবে। সময় লাগলেও সে কাজ করা গিয়েছে।
নারীচালিত এই জেলাপ্রশাসনের গুরুত্ব বহুমাত্রিক। লাহুল-স্পিতির নিরিখে এর আলাদা তাৎপর্য আছে। এক কালে এখানে প্রশাসনিক পদে নিয়োগ মানেই তা ‘পানিশমেন্ট পোস্টিং’ হিসাবে ভাবা প্রায় অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল। পরিবেশগত প্রতিকূলতার জন্যই এই ধারণার জন্ম হয়েছিল। সেই ধারণা ভেঙে দেওয়া সম্ভব হয়েছে ক্রমে ক্রমে। এই পদক্ষেপ তো চোখে আঙুল দিয়েই দেখিয়ে দিল যে, লাহুল-স্পিতি ব্রাত্য নয় কোনওভাবেই। পাশাপাশি, এখানকার বাসিন্দাদের মধ্যে নারীদের সংখ্যাই বেশি। কেননা, সকলে না হলেও, বেশিরভাগ পুরুষই কাজের সন্ধানে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হন। সেদিক থেকেও নারীচালিত জেলা-প্রশাসন তৈরি করা খুবই যুক্তিযুক্ত সিদ্ধান্ত। মুখ্যমন্ত্রীর সেই পরিকল্পনা শুধু কাগজে-কলমে হয়েই থেকে যায়নি, হাতে-কলমে তা করে দেখানোও সম্ভব হয়েছে। অর্থাৎ লাহুল-স্পিতির সুষ্ঠু প্রশাসন তো বটেই, পাশাপাশি সেখানকার প্রশাসনিক ব্যবস্থা সম্পর্কে ধারণা পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও এই পদক্ষেপ একান্ত জরুরি হয়েই উঠেছে।
দেশের রাজনীতি ও প্রশাসনের দিক থেকে দেখতে গেলেও এ-এক ঐতিহাসিক মুহূর্তই বলা যায়। শীর্ষস্তরে নারীদের পৌঁছনো, সুশাসনের দৃষ্টান্ত স্থাপন করার সাক্ষী আগেও থেকেছে এই দেশ। তবে, তারপরেও রাজনীতি-প্রশাসনে যে মূলত পুরুষেরই সংখ্যাধিক্য, তা বললে বাড়াবাড়ি কিছু হয় না। যদিও জনকল্যাণকামী রাষ্ট্রব্যবস্থায় তাতে বিশেষ হেরফের হওয়ার কথা নয়। তবে তারপরেও অনেক বিষয় থেকে যায়, যা পুরুষদের দ্বারা চালিত প্রশাসনের সমালোচনার পথ খুলে দেয়। কেননা অনেক ক্ষেত্রেই প্রশাসন পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টির পরিচয় দেয়। যে পরিবর্তন নারীদের জন্য, নারীদের দ্বারাই সম্ভব হয়ে উঠতে পারে। বর্তমানে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ অনেকটাই বেড়েছে। বিধানসভায় ও সংসদে নারী রাজনীতিকদের উপস্থিতি আলাদা মাত্রা সংযোজন করেছে। পাশাপাশি প্রশাসনিক স্তরেও যখন নারীরা দায়িত্ব নিয়েছেন, দেখা গিয়েছে, প্রশাসনের চেনা ব্যবস্থাতেই অন্য এক আদল এসেছে। সেদিক থেকে গোটা একটা জেলা প্রশাসনের সব স্তরে যদি নারীরা থাকেন, তবে তা দেশের রাজনীতিতে নতুন মডেল হয়েই উঠতে পারে। প্রশাসনের পুরুষতান্ত্রিকতা আর রাজনৈতিক ক্ষেত্রের মিসোজিনির মোকাবিলায় তা জরুরি একটি পদক্ষেপ। সেই দৃষ্টান্ত তৈরি করেই মডেল হয়ে উঠল লাহুল-স্পিতি। অর্থাৎ এ শুধু সংখ্যাপূরণের রাজনীতিতে নারীদের জায়গা ছেড়ে রাখার চালু রেওয়াজ নয়। বরং সদর্থেই এক পরিবর্তন আনার চেষ্টা। প্রশাসনের আশা, নারীসুরক্ষা ও নারীর অধিকার সংক্রান্ত বিষয়ে জেলা প্রশাসনের ভূমিকা ঠিক কী হতে পারে, তার রূপরেখা তৈরি হবে নারীদের হাতেই। তা গোটা দেশের কাছেই প্রশাসন ও রাজনীতির নতুন দরজা খুলে দিতে পারে।
পরীক্ষামূলক পদক্ষেপ। তা সফল করে তোলা সম্ভব হয়েছে। এবার নারীচালিত এই জেলা-প্রশাসন কাজ করা শুরু করবে। রাজনীতি ও প্রশাসনের চেনা ছক ভেঙে অন্য এক বাস্তবতা যে নারীদের হাতেই চিহ্নিত হবে, এমনটাই আশা সব স্তরে। যে লাহুল-স্পিতিকে এক সময় সকলে প্রশাসনিক পছন্দের নিরিখে সকলে দূরেই রাখতে পছন্দ করতেন, এবার তাই-ই হয়ে উঠতে পারে রাজনীতি-প্রশাসনের পছন্দের জায়গা। কৃতী নারীরা তাঁদের কৃতিত্বেই তা সম্ভবপর করে তুলবেন- এ-আশা শুধু লাহুল-স্পিতি নয়, গোটা দেশেরই।