পহেলগাঁওয়ের ঘটনায় বিশ্লেষক মহল মনে করেছিল, এবার সিন্ধু জলচুক্তি নিয়ে কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে পারে ভারত। সেই আবহে বিদেশ সচিব বিক্রম মিসরি ঘোষণা করেন, পাকিস্তানের সঙ্গে সিন্ধু চুক্তি বাতিলের কথা। সাফ জানিয়ে দেন, যতদিন না সীমান্ত সন্ত্রাস থামাচ্ছে পাকিস্তান, ততদিন এই চুক্তি কার্যকর থাকবে না। পাকিস্তানে ঠিক কী প্রভাব পড়বে এর? আসুন শুনে নেওয়া যাক।
২২ এপ্রিল ২০২৫। ভারতের ‘কালো দিন’-এর তালিকায় সাম্প্রতিক সংযোজন। নেপথ্যে সেই সন্ত্রাস। ঘটনাস্থল সেই কাশ্মীর। সংবাদমাধ্যম থেকে শুরু করে সোশাল মিডিয়া, সবর্ত্রই চর্চার বিষয়, ‘রক্তাক্ত ভূস্বর্গ!’ অস্থির পরিস্থিতিতে দ্বেষ, ক্ষোভ আর লুকিয়ে রাখার প্রয়োজন মনে করছেন না অনেকেই। বিশেষ করে নেটদুনিয়ায়। মোটের উপর একটাই দাবি, অবিলম্বে কড়া সরকারি পদক্ষেপ।
তা ইতিমধ্যেই কার্যকর হয়েছে। শাসকদলের সমর্থকরা বলছেন, ‘কড়া জবাব’। তবে কতটা কড়া, সময় বলবে। জানা যাচ্ছে, ২২ তারিখের হামলার পর মন্ত্রিসভার জরুরি বৈঠকে বিশেষ কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্র। প্রতিটিই পাকিস্তান সম্পর্কিত। বর্ডার বন্ধ, চুক্তি বাতিল-সহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের প্রভাব প্রতিবেশী দেশে রীতিমতো পড়বে বলেই মনে করছেন অনেকে। বিশ্লেষকদের মত, কূটনৈতিক ভাবে কবজা করতেই এই পদক্ষেপ। তার মধ্যে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ সিন্ধু জলচুক্তি।
ঠিক কেমন এই চুক্তি?
নামেই বোঝা যায় বিষয়টি জলবণ্টন সম্পর্কিত। স্পষ্ট করে বললে, দুই দেশের মধ্যে বয়ে যাওয়া নদীর জল, কোন দেশ কীভাবে ব্যবহার করবে, সেই সংক্রান্ত চুক্তি। একটি নয়, বেশ কয়েকটি নদীর কথা রয়েছে সিন্ধু চুক্তিতে। দীর্ঘ আলোচনার পরে বিশ্ব ব্যাঙ্কের মধ্যস্থতায় ১৯৬০ সালে যাতে সই করে ভারত ও পাকিস্তান। চুক্তি অনুযায়ী, সিন্ধু নদীর দুই উপনদী, তথা বিতস্তা ও চন্দ্রভাগার জলের উপরে পাকিস্তানের কর্তৃত্ব ও অধিকার থাকবে। এদিকে ভারতের নিয়ন্ত্রণে থাকবে বিয়াস, শতদ্রু এবং ইরাবতী। তবে সামগ্রিক ভাবে সিন্ধু ও তার উপনদীগুলির উপর পাকিস্তানের ৮০ শতাংশ, ভারতের ২০ শতাংশ অধিকার থাকবে। তবে শর্ত বলছে ভারত-পাকিস্তান নিজেদের প্রয়োজনে নদীর জল ব্যবহার করলেও, বাঁধ দিয়ে তা আটকাতে পারবে না। এই দোহাই দিয়ে ভারতের বিরুদ্ধে একাধিকবার অভিযোগ এনেছে পাকিস্তান।
প্রথমবার ২০১৬ সালে দাবি ওঠে কিষেণগঙ্গা এবং রাতলে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প গড়ে ভারত চুক্তিলঙ্ঘন করছে। সেই নিয়ে দীর্ঘ জটিলতা তৈরি হয়, বিতর্কের জল গড়ায় আন্তর্জাতিক আদালত অবধি। এরই পলাটা ভারতের তরফেও চুক্তি সংশোধনের দাবি ওঠে। এতদিন তা আলোচনার পর্যায় ছিল। তবে পহেলগাঁওয়ের ঘটনার পর বিশ্লেষক মহল মনে করেছিল, এবার সিন্ধু জলচুক্তি নিয়ে কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে পারে ভারত। সেই আবহে বিদেশসচিব বিক্রম মিসরি ঘোষণা করেন, পাকিস্তানের সঙ্গে সিন্ধু চুক্তি বাতিলের কথা। সাফ জানিয়ে দেন, যতদিন না সীমান্ত সন্ত্রাস থামাচ্ছে পাকিস্তান, ততদিন এই চুক্তি কার্যকর থাকবে না।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই চুক্তি বাতিলের কী প্রভাব পড়বে পাকিস্তানে?
প্রথমেই যে সমস্যার মধ্যে পড়বে প্রতিবেশী দেশটি তা হল, জলের অভাব। বর্তমানে পাকিস্তানের ৮০ শতাংশ জমিতে জল সরবরাহ হয় এই চুক্তির মাধ্যমে। সেচের জন্য প্রয়োজনীয় জলের ৯০ শতাংশেরও বেশি আসে সিন্ধু নদ থেকে। করাচি, মুলতান, লাহোরের মতো বড় শহরগুলিও সিন্ধুর জলই ব্যবহার করে। অথচ পাকিস্তানের কাছে এই বিপুল জল ধরে রাখার মতো প্রযুক্তি নেই। সামগ্রিক ব্যবহারের মাত্র ১০ শতাংশের কিছু বেশি জল ধরে রাখতে পারে সেখানকার বাঁধগুলি। এদিকে গম, চাল, আখ, তুলো চাষ এবং পাকিস্তানের জিডিপির ২৫ শতাংশ নির্ভর করে এই সিন্ধুর জলের উপর। তাই চুক্তি মোতাবেক জল না পেলে পাকিস্তানের কৃষি, বিদ্যুৎ উৎপাদন, জনজীবন-সবই থমকে যাবে। গ্রীষ্মকালে পাকিস্তানের জল সংকট নতুন কিছু নয়। এবার তা আরও মারাত্মক হয়ে উঠতেই পারে ভারতের অসহযোগিতায়। আসলে, প্রযুক্তিগতভাবে ভারতের বাঁধ বা জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলি অনেকটাই বেশি উন্নত পাকিস্তানের তুলনায়। আগামী দিনে যদি এই প্রযুক্তি আরও উন্নত করে ফেলে ভারত, তাহলে সিন্ধুর যেটুকু অংশ এ দেশে রয়েছে তার সামগ্রিক নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হবে। চুক্তি লঙ্ঘন হলে এই সংক্রান্ত পদক্ষেপের কথা পাকিস্তানের সঙ্গে আলোচনা করতেও বাধ্য থাকবে না ভারত। সুতরাং পাকিস্তানের সমস্যা যে উত্তরোত্তর বাড়বে তা বলাই বাহুল্য।
যদিও প্রাকৃতিকভাবে নদীতে যে জল মিলবে তার উপর নিয়ন্ত্রণ সম্ভব না। সেক্ষেত্রে বর্ষাকালে জলে টইটম্বুর সিন্ধু বা তার উপনদী পাকিস্তানের জলচাহিদা মেটাবে অনায়াসে। সমস্যা হবে অন্যান্য সময়, বিশেষ করে গ্রীষ্মকালে। কৃত্রিম উপায়ে জল ধরে রাখা বা সেই জলকে কাজে লাগানোর প্রযুক্তি পাকিস্তানের নেই বললেই চলে। অন্তত ভারতের সঙ্গে তুলনায়। আর সেক্ষেত্রে প্রতিবেশী দেশটিতে প্রবল জলসংকট দেখা দিতে পারে। যার প্রভাব আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রেও পড়বে বইকি।
পহেলগাঁও হামলার পর থেকে, ভারত সরকারের থেকে কড়া পদক্ষেপের প্রত্যাশা করেছিল দেশবাসী। সেইমতো একাধিক পদক্ষেপ করেছে কেন্দ্র। তবে সিন্ধু জলচুক্তি বাতিল মোক্ষম কূটনৈতিক চাল। এই পদক্ষেপ পাকিস্তানকে যে কড়া চ্যালেঞ্জের মুখেই ফেলবে, এমনটাই মনে করছেন কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞরা।