ক্ষত তো ক্ষত-ই। সে-ক্ষত যেভাবে যতবারই ফিরিয়ে আনা যাক তাতে লাঞ্ছিত হবে মানবতাই। লাঞ্ছিত হবে এ-দেশে বৈচিত্রকামী চরিত্র। লাঞ্ছিত হবে এ-দেশের সহিষ্ণু আর গ্রহিষ্ণু আত্মা। অথচ ডিজিটাল প্রগতিশীলতার ভিতর যদি থেকেই যায় ঘৃণার চাষ, তাহলে কি আর আবাদ করলে ফলবে সোনা!
রমজান মাস। সামনেই ইদ। উৎসব আর সম্প্রীতির এই সময় গোটা দেশের উদযাপন-মুহূর্ত। রাজনৈতিক ইন্ধনে ক্রমশ অতিমারী হয়ে ওঠা বিদ্বেষ-অসুখকে অতিক্রম করে যাওয়ার যথার্থ সময়। এ-দেশ তবু যে অন্তরে-অন্দরে অনেখানি বদলে গিয়েছে তা খোলসা করে দিল জিবিলি কায়দার এআই দিয়ে ছবি তৈরি হিড়িক। তা শুধু ব্যক্তিগত ছবি ছাপায় থেমে থাকল না। বাবরি ভাঙার মতো কলঙ্কিত অধ্যায়ও হয়ে উঠল ডিজিটাল-উল্লাস।
এমন নয় যে, রমজান মাস না-চললে এ-কাজের কলঙ্ক কিছু কম হত! দেশের ইতিহাস একরৈখিক ধারায় চলে না। এমন বাঁকের সামনে মাঝেমধ্যে এসে দাঁড়ায় যে, যেখানে মানবতার হানি হয়। দেশের যাত্রা সেখান থেকে শুরু হয় নতুন অভিমুখে। সেই বাঁকবদল ভালো কিংবা মন্দ, দু’দিকেই হতে পারে। কথা হল, দেশের মানুষ সেই ইতিহাসকে কীভাবে মনে রাখবে? যা কিছু ক্ষত, তা যে ভুলে যেতে হবে, এমন কোনও কথা নেই। বরং ক্ষত মনে রাখাই ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়ার প্রথম পাঠ। তা যেমন একটি ভূখণ্ডের ক্ষেত্রে সত্যি, তেমনই গোটা বিশ্বের জন্যও সত্য। নাৎসি ইতিহাস, বা বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাস, সামগ্রিক ভাবেই মানুষ মনে রেখেছে; কেননা, সেই মানবতালাঞ্ছিত ঘটনার পুনরাবৃত্তি যাতে না হয়। তা অতিক্রম করে যাওয়াই মানবতার শর্ত এবং লক্ষ্য। তবে, এমন ঘটনা কি উল্লাসেরও বিষয়বস্তু হয়ে উঠতে পারে? প্রশ্ন ঠিক সেখানেই।
সম্প্রতি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে জিবিলি-শৈলীর ছবি তৈরির রমরমা সোশ্যাল মিডিয়া জুড়ে। বহু মানুষ নিছক শখের বশেই একট বিশেষ শিল্পধারার ডিজিটাল যথেচ্ছাচারে সায় দিয়ে ফেলছেন। যে শিল্পীর সারা জীবনের প্ররিশ্রমে এই শৈলীর হয়ে-ওঠা, তাঁর কথা মনে রাখার খুব একটা প্রয়োজন বোধ করছেন না কেউ-ই। শিল্পীদের আপত্তিতেও স্বভাবত কর্ণপাত নেই। সোশ্যাল মিডিয়ার ট্রেন্ডের দস্তুর এমনটাই। যখন যা চলে, তাই-ই চলতে থাকে। তাতে কার কী লাভ, তথ্য চুরি হচ্ছে কি-না, কিংবা ভবিষ্যতের শিল্প-কল্পনার পথ রুদ্ধ হচ্ছে কি-না, এমন ভাবনাচিন্তার অবকাশ বিশেষ থাকে না। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যে মানুষের কাজ কেড়ে নেবে, এমন চিন্তায় অনেকেই ভাবিত। তা নিয়ে আলোচনাও চলে নানা স্তরে। সেই এআই যখন একটি শিল্পশৈলী আত্মসাৎ করে নিজেকে উন্নত করতে চলেছে, আর সেই আগুনে হাওয়া দিয়ে চলেছে জনগণের শখ, তখন আর একটু তলিয়ে ভাবনাচিন্তা দফারফা। অতএব জিবিলি-শৈলী পুরোপুরিই এখন চলে গেছে এআই-এর দখলে। শিল্পে পারঙ্গম না হয়য়েও যে নিজের শিল্প-শখ পূরণ করা যায়, সেই পথ খুলে দিয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। এখন আর ইনস্ট্যান্ট শিল্পী হয়ে ওঠার উল্লাস রুধিবে কে!
এখন এই ডিজিটাল ছাড়পত্রকে মানুষ কীভাবে ব্যবহার করছে, সেইটেই বড় কথা। দেখা গেল, শুধু ব্যক্তিগত ছবি বা পরিজনদের ছবি বানিয়েই ক্ষান্ত হচ্ছে না মানুষ। বরং বিষয়টি পুরোপুরি রাজনৈতিক মাত্রাও পেয়ে গিয়েছে। ট্যুইন টাওয়ার ধ্বংস থেকে ট্রাম্পের উপর হামলার ঘটনাও রূপান্তরিত হচ্ছে শিল্পে। এই তালিকায় আছে বাবরি-ধ্বংসের মতো ঘটনাও। এইআই ব্যবহার করে ফিরিয়ে আনা হয়েছে ১৯৯২ সালের, ৬ ডিসেম্বর। গেরুয়া পতাকা হাতে মসজিদের উপর উঠেছেন হিন্দুত্ববাদীরা। আরও অনেকে উঠতে চাইছেন। যে-ক্ষত দেশের ইতিহাসে রক্তক্ষরণ ঘটায়, তাকেই মৃদু মনভোলানো শিল্পে রূপান্তরিত করা আদতে নিছক শখ নয়। বরং সোশ্যাল মিডিয়ার এই ট্রেন্ডের পিছনে যে উল্লাস-আনন্দ কাজ করছে, সেই উল্লাসই এ ছবিরও চালিকাশক্তি। কারণ অনেকের কাছে এ-ছবি আদতে উল্লাসেরই।
Hindutva Twitter is celebrating the demolition of Babri Mosque in 1992 using this studio ghibli AI. https://t.co/41PnUSVRhF
— Mehmood (@ChalParranHo) March 27, 2025
কিন্তু এ-উল্লাস কোন ভারতের? যে-দেশ দীর্ঘ বিচার পেরিয়ে নতুন করে এগোতে চাইছে, সে-দেশের? নাকি দেশের ভিতর আর-এক দেশ বয়ে চলেছে, যা চাইছে এই ক্ষতের পুনর্জাগরণ! কলঙ্কের এই শিল্প-রূপান্তর আসলে গণতান্ত্রিক দেশে সংখ্যালঘুদের প্রতি প্রচ্ছন্ন বার্তা-ই। ভাঙনের এই উল্লাস-দেশ তাঁদের কী চোখে দেখবে, তাঁদের প্রতি কী ব্যবহার করবে, তা সহজেই অনুমেয়। আর এসবই হচ্ছে ডিজিটাল ইন্ডিয়ায়। যে ডিজিটাল ভারতের জাত-পাত-ধর্মের বিভাজন পেরিয়ে নতুন দিশায় এগিয়ে যাওয়ার কথা ছিল, সেই ডিজিটাল দেশ যে যাবতীয় সংকীর্ণতা সঙ্গে করে নিয়েই এগোচ্ছে, আরও একবার তা খোলসা হল।
আয়রনি এই যে, এই জিবিলি-শৈলীর জনক মিয়াজাকি যুদ্ধের মতো মানবতাবিরোধী ঘটনার প্রতিস্পর্ধী ভাষা হিসাবে ব্যবহার করেছিলেন তাঁর শিল্পকে। কিন্তু এআই তো শিল্পী নয়। ফলত মানবতা রক্ষার দায় এর নেই। তা যতদূর গণিত বোঝে, ততদূর মানুষ বোঝে না। অতএব, প্রম্পটে যা পেয়েছে তাই-ই শিল্পে রূপান্তরিত করেছে। এই ফাঁকতাল পুরোমাত্রায় ব্যবহার করেছে হিন্দুত্ববাদীদের একাংশ। তাঁরা খুঁচিয়ে জাগিয়ে দিতে চেয়েছেন অতীতের ক্ষত। তাঁদের বিজয়োল্লাসের মুহূর্ত ছড়িয়ে দিয়ে নিতে চেয়েছেন ডিজিটাল-ইন্ডিয়ার দখল। আসলে যে তা দেশকেই ছোট করছে, তা বোধহয় তাঁরা জানেন বা মানেন না। এআই যে স্বাধীনতা দিচ্ছে, তা যথেচ্ছাচারে পরিণত হলে,এইআই সেন্সরের কথাও হয়তো ভাবতে হবে অচিরেই।
তবু ক্ষত তো ক্ষত-ই। সে-ক্ষত যেভাবে যতবারই ফিরিয়ে আনা যাক তাতে লাঞ্ছিত হবে মানবতাই। লাঞ্ছিত হবে এ-দেশে বৈচিত্রকামী চরিত্র। লাঞ্ছিত হবে এ-দেশের সহিষ্ণু আর গ্রহিষ্ণু আত্মা। অথচ ডিজিটাল প্রগতিশীলতার ভিতর যদি থেকেই যায় ঘৃণার চাষ, তাহলে কি আর আবাদ করলে ফলবে সোনা! রমজান মাস চলুক বা না-চলুক, দেশের স্বার্থে এর প্রতিবাদ যদি না হয়, তবে ডিজিটাল-ভারত আসলে এক ঘৃণায় উন্মাদ দেশই হয়ে উঠবে দিনেদিনে।
সেই দেশ-ই কি আমাদের কাম্য!