হিন্দু দেবতার গায়ে উঠবে না মুসলিমের তৈরি পোশাক। বদলাতে হবে মুসলিম কারিগর। এই দাবিতেই সরব হিন্দু সংগঠন। তাতে অবশ্য এতটুকু বিচলিত নয় বাঁকে বিহারী মন্দির কতৃপক্ষ। আগেও খারিজ হয়েছে, পহেলগাঁও হামলার আবহে নতুন করে সেই দাবি উঠলে আবারও খারিজ হল। ঠিক কী বলছেন মন্দিরের পুরোহিতরা?
মুসলিমের তৈরি পোশাক কেন হিন্দু দেবতার পরনে থাকবে? কিছুদিন আগে এই প্রশ্নেই সরব হয়েছিল কয়েকটি হিন্দু সংগঠন। পহেলগাঁও সন্ত্রাস হামলার পর আবারও মাথা চাড়া দিয়েছে সেই বিতর্ক। বাঁকে বিহারী মন্দির কতৃপক্ষের কাছে ফের আরজি জানানো হয়েছে। অবশ্য এবারও সেই আরজি খারিজ হয়েছে। মন্দির কমিটির সাফ দাবি, ‘অযৌক্তিক প্রস্তাব’!
সন্ত্রাস হামলায় দেশজুড়ে দ্বেষের আবহ। মুসলিম বয়কটের দাবিতে সরব অনেকেই। সোশাল মিডিয়ায় ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন কেউ কেউ। প্রশ্ন তুলছেন সরকারের ভূমিকা নিয়ে, কেউ আবার সরাসরি জাতীয় নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা সংস্থা বা গোয়েন্দা বিভাগকে পরামর্শ দিচ্ছেন। সোশাল মিডিয়াই সে পথ খুলে দিয়েছে তাঁদের। মোটের উপর কাশ্মীর হামলার বিষয়টা যেন আরও গুরুতর চর্চার বিষয় হয়ে উঠছে দিনে দিনে। এসবের মধ্যে যে বিষয়টা সবথেকে প্রকট, তা হল মুসলিম বয়কটের দাবি। হিন্দু সংগঠনের পরামর্শ, দোকান-বাজার সবকিছু করা হোক কেবলমাত্র হিন্দুদের থেকেই। মুসলিম দোকানির থেকে কিছু কেনা দূরে থাক, সে দোকানে পা রাখতেও নিষেধ করছেন তাঁরা। পালটা স্বর যে নেই এমন নয়। তবে সোশাল মিডিয়া প্রথম পক্ষই সংখ্যাগুরু। কাজেই বেশি বেশি ছড়িয়ে পড়ছে তাঁদের দাবি। তালিকায় রয়েছে বাঁকে বিহারী মন্দিরের মুসলিম কারিগর বয়কটের ডাক। বলে রাখা ভালো, বিষয়টা নিয়ে কিছুদিন আগেই বিতর্ক দানা বেঁধেছিল। আসলে, মন্দিরের মূল আরাধ্য অর্থাৎ বাঁকে বিহারী কৃষ্ণের বাহারি পোশাক তৈরি করেন মুসলিম কারিগররাই। শুধু সাজপোশাক নয়, মন্দিরের নকশা, বিগ্রহের মুকুট, জরদৌসি পাগড়ি, বেশিরভাগটাই মুসলমানদের তৈরি। দীর্ঘদিন ধরে এই কাজ করে আসছেন তাঁরা। বিষয়টা ধর্মীয় ভেদাভেদের অনেকটা উর্ধ্বে। শিল্পীর পরিচয় যে ধর্ম দেখে হয় না, তা এখানে গেলে ভালোমত টের পাওয়া যায়। এতদিন এই নিয়ে কারও আপত্তি না থাকলেও, কিছু হিন্দু সংগঠন দাবি জানায় বিষয়টা বদলাতে হবে। অর্থাৎ মুসলিম কারিগরের তৈরি পোশাক হিন্দু দেবতার গায়ে থাকবে না।
শ্রীকৃষ্ণজন্মভূমি মুক্তি সংঘর্ষ ন্যাস নামের ওই সংগঠনের দাবি ছিল, মন্দিরের বিগ্রহের পোশাক এমন কারও তৈরি হওয়া উচিত যাঁদের ঈশ্বরে আস্থা আছে। মন্দিরের পবিত্রতা বজায় রাখতে এমন পদক্ষেপ জরুরি, এ কথাই বোঝাতে চান তাঁরা। ওই সংগঠনের আরও দাবি ছিল, মন্দিরে মুসলিমরা অর্ঘ্য দিলে সেটাও গ্রহণ করা যাবে না। কিন্তু মন্দির কর্তৃপক্ষ এবং পুরোহিতরা সমস্বরে হিন্দুত্ববাদীদের সেই দাবি খারিজ করে দেন। বলেন, হিন্দু হোক, মুসলমান হোক বা খ্রিষ্টান, সকলের বিশ্বাস ও ভক্তি প্রাধান্য পাবে সবার আগে। সকলের দেওয়া পুজোর অর্ঘ্য তাঁরা সাদরে গ্রহণ করবেন। কারিগরদের ক্ষেত্রেও কোনও বদল হবে না। সাময়িকভাবে বিষয়টা থিতু হয়। কিন্তু পহেলগাঁও হামলার পর আবারও একই দাবিতে সরব হয়েছেন হিন্দু সংগঠনের সদস্যরা। তবে এবারও কমিটির বয়ান কিছু বদলায়নি। সরাসরি এই দাবিকে ‘অযৌক্তিক’ বলে দাগিয়েছেন তাঁরা। তবে কাশ্মীরের সন্ত্রাস হামলা নিন্দনীয়, এমনটাও বলেছে মন্দির কর্তৃপক্ষ। সন্ত্রাসবাদীদের অবিলম্বে কড়া শাস্তির দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। পাশাপাশি বৃন্দাবনের প্রসঙ্গ ধরে বলেছেন, এখানে হিন্দু-মুসলিমে ভেদ নেই। সবাই মিলেমিশে থাকেন, আগামীতেও থাকবেন।
তবে হিন্দু সংগঠন যে স্রেফ বাঁকে বিহারী মন্দিরের মুসলিম কারিগর বদলে দাবি জানিয়েছে, এমন নয়। স্থানীয় মুসলিম ব্যবসায়ীদেরও বয়কটের কথা বলছে তারা। এই আরজি মন্দির আগত হিন্দুদের প্রতি। কেউ যেন মুসলিম দোকানির থেকে কিছু না কেনেন, এমনটাই চাইছেন হিন্দুত্ববাদীরা। ঠিক যেভাবে কানওয়ার যাত্রার আগে যোগীরাজ্যের মুসলিম ব্যবসায়ীদের দোকানে নিজের নাম লেখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, এখানেও তেমনটাই করতে চাইছে হিন্দু সংগঠন। তাদের দাবি, দোকানের নাম দেখে সাধারণ মানুষ বুঝতে পারবেন সেই দোকানের মালিক কোন ধর্মের। তাতে কেনাকাটা করতে সুবিধা হবে। অর্থাৎ তাঁদের দাবি মেনে শুধুমাত্র হিন্দু দোকানেই জিনিস কিনতে পারবেন সাধারণ মানুষ। এই দাবিও কেউ মেনে নিতে বাধ্য নন বলাই বাহুল্য। তাও যদি স্থানীয় হিন্দু ব্যবসায়ীদের সমর্থন থাকত, একটা কথা ছিল। সেগুড়ে বালি! মুসলিম দোকানিদের একেবারেই আলাদা চোখে দেখেন না বলে সাফ জানিয়েছেন স্থানীয় হিন্দু ব্যবসায়ীরা। দোকানে আলাদা করে নাম লিখে কে হিন্দু, কে মুসলিম, এই ভেদ তাঁরা করতে নারাজ। সুতরাং এক্ষেত্রেও ধোপে টেকেনি হিন্দুত্ববাদীদের যুক্তি বা দাবি।
আসলে, সন্ত্রাস গোটা মানবজাতির শত্রু। একসঙ্গে মিলেমিশে তার বিনাশ করতে হবে। এমনটা বারবার বলা হলেও, অনেকেই বুঝতে নারাজ। তাতে আসল বিষয়টা যে ধর্মীয় ভেদাভেদের আড়ালে চাপা পড়ে যাচ্ছে সেদিকে খেয়াল নেই তাঁদের। আর তাই বারে বারে মুসলিম বয়কটের দাবি উঠছে। গোটা দেশেই মোটামুটি এক পরিস্থিতি। কোথাও কোথাও বিষয়টা সফল হচ্ছে। অর্থাৎ হিদু সংগঠনের আনা দাবিতে সায় দিচ্ছেন স্থানীয়রা। তাতে সংখ্যালঘুরা সমস্যায় পড়ছেন। কোথাও আবার যুক্তি দিয়ে বিষয়টা বিচার করা হচ্ছে। এতদিন যাঁদের সঙ্গে মিলেমিশে থাকা অভ্যাস, হঠাৎ তা বদলে ফেলা অসম্ভব বলেই মনে করছেন কেউ কেউ। ঠিক যেমনটা এই বাঁকে বিহারী মন্দির কতৃপক্ষ বা সেখানকার স্থানীয় হিন্দু ব্যবসায়ীরা করলেন।