এ-দেশে দলিতরা ঠিক কেমন আছেন? খবরে চোখ রাখলেই তা মালুম হয়। উচ্চবর্ণের হাতে হেনস্তা হওয়ার ঘটনা এই ৭৮ বছরেও মুছে ফেলা সম্ভব হয়নি। বর্ণবাদী সমাজকাঠামোয় এখনও দলিতরা অনেকখানি অবহেলা সয়েই থাকেন। শুধু অবহেলা নয়, অবহেলার হাত ধরে চলে আসা বৈষম্যের যন্ত্রণাও সহ্য করতে হয় তাঁদের। সেই প্রেক্ষিতেই রামসেবকের মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া উদযাপনের মতোই ঘটনা।
সাজানো মঞ্চে দাঁড়িয়ে বড়বাঁকি জেলার জেলাশাসক পুরষ্কার তুলে দিলেন পনেরো বছর বয়সী এক কিশোরের হাতে। আশীর্বাদ করলেন ছেলেটির মাথায় হাত রেখে; পাশাপাশি এ কথাও জানিয়ে দিলেন যে, ছেলেটির আগামী দিনের পড়াশোনার খরচের সিংহভাগই মকুব করা হবে। এত আয়োজন যে কিশোরের জন্য, সেই রামসেবক সদ্য মাধ্যমিক পাশ করেছে। তা, মাধ্যমিক পাশ কেন এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল! কেনই বা এত উদযাপন! কারণ, রামসেবক যা সম্ভব করে তুলেছে, তা গত ৭৮ বছরেও সম্ভব হয়নি। হ্যাঁ, মাধ্যমিক পাশ। উত্তরপ্রদেশের দলিতপ্রধান নিজামপুর গ্রামের বাসিন্দা রামসেবকই প্রথম এই কৃতিত্ব অর্জন করেছে। আর তার এই সাফল্যের উদযাপন শুধু তার জন্য নয়, এই দেশের প্রেক্ষিতেও গুরুত্বপূর্ণ এক মাইলফলক।
এ-দেশে দলিতরা ঠিক কেমন আছেন? খবরে চোখ রাখলেই তা মালুম হয়। উচ্চবর্ণের হাতে হেনস্তা হওয়ার ঘটনা এই ৭৮ বছরেও মুছে ফেলা সম্ভব হয়নি। বর্ণবাদী সমাজকাঠামোয় এখনও দলিতরা অনেকখানি অবহেলা সয়েই থাকেন। শুধু অবহেলা নয়, অবহেলার হাত ধরে চলে আসা বৈষম্যের যন্ত্রণাও সহ্য করতে হয় তাঁদের। সেই প্রেক্ষিতেই রামসেবকের মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া উদযাপনের মতোই ঘটনা।
সংবর্ধনা অনুষ্ঠান শেষে রামসেবক যখন মঞ্চ থেকে নামছিল, তখন তার চারিদিকে সাংবাদিকদের ভিড়। মুহুর্মুহু ছবি উঠছে। সেসব ছবিতে স্পষ্ট ধরা পড়েছে তার দীপ্তিময় দুই চোখ আর ঝলকে ওঠা আত্মবিশ্বাস। এই আত্মবিশ্বাস না থাকলে বোধহয় এ লড়াই লড়ে জিতে যাওয়া তার পক্ষেও সম্ভব ছিল না। রামসেবকের নিজামপুর গ্রামে মোটে তিরিশ ঘর মানুষের বাস, সকলেই দলিত সম্প্রদায়ভুক্ত। স্বাধীনতার এতগুলো বছরের পরেও শিক্ষার আলো ছুঁতে পারেনি ছোট্ট গ্রামটিকে। সেখানকার ছেলেমেয়েরা প্রাথমিকভাবে স্কুলে ভর্তি হয় বটে, তবে নানা কারণেই পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারে না। কারণ, যেনতেন প্রকারেণ জীবিকা নির্বাহের দায়। ফলত পড়াশুনো যেন তাদের কাছেই বিলাসিতা।
সেই গ্রামে স্বভাবতই ব্যতিক্রমী হয়ে উঠেছে রামসেবক। অবশ্য এ পথ সহজ ছিল না। গ্রামের অনেকেই ঠাট্টা-ইয়ার্কির ছলে বারে বারে বুঝিয়ে দিত যে রামসেবকের পড়াশুনো চালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা নেহাতই স্বপ্ন। তাতেই বেড়েছিল জেদ। সে পণ করেছিল যেভাবেই হোক মাধ্যমিক পাস করে গ্রামবাসীদের তাক লাগিয়ে দেবে সে। মাথায় ছিল সংসারের দায়ভার। স্কুলের ফিজ-ও দিতে হত নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে। বাড়ির বড়ছেলে রামসেবক কিন্তু দায়িত্ব ছাড়েনি। বিয়েবাড়ির মরশুমে সে আলো-বাহকের কাজ করত। ঘণ্টার পর ঘণ্টা মাথার উপর ভারী আলো ধরে রাখবার বদলে দিনশেষে জুটত মোটে দু-তিনশো টাকা। বাকি বছর নানা জায়গায় শ্রমিক হিসেবে কাজ করে যা টাকা আয় হত, তার সমস্তটাই সংসার খরচে ব্যয় করত বছর পনেরোর এই কিশোর। তবু পড়াশোনা ছাড়েনি। বরং সকলকে বুঝিয়ে দিয়েছে, স্বপ্ন দেখা শুধু নয়, তা বাস্তব করার মতো ক্ষমতাও তার আছে। বলা ভালো, একটু সুযোগ পেলে এই ক্ষমতা আছে আরও অনেক রামসেবকেরই। আর ঠিক এই বিন্দুতে এসেই রামসেবকের মাধ্যমিক পাশ অন্য মাত্রা ছুঁয়ে ফেলছে।
সময় এগোচ্ছে। দেশও এগোচ্ছে। সে অগ্রগতির পরিমাপক হয়ে উঠেছে জিডিপি। কখনও আবার প্রযুক্তি-বিপ্লবই হয়ে উঠছে উন্নতির চিহ্ন। কিন্তু দেশের মানুষ কেমন আছে? এই পরিমাপকে অনেক সময়ই তা অন্ধকারে থেকে যায়। রামসেবকের এই মাধ্যমিক পাশ যেন গত ৭৮ বছরের সেই অন্ধকারকেই আরও একবার নতুন করে মনে করিয়ে দিল। জনকল্যাণের রাষ্ট্রব্যবস্থা সাধারণের উন্নতির কথাই ভাবে বা ভাবতে চায়। কিন্তু সে ব্যবস্থার এত প্রয়োগের পরও কি শ্রেণিগত বা বর্ণগত বৈষম্য বা অসাম্য ঘোচানো সম্ভব হল! ন্যায় ও ন্যায্যতার দিকে কি এগিয়ে দিতে পারল সমাজ! সন্দেহ নেই যে, অনেক কিছুই সম্ভব হয়েছে। আবার ব্যর্থতাও কম কিছু নয়। সেই অন্ধকারেই আলো ফেলেছে রামসেবকের সাফল্য। এ হয়তো তার একক কৃতিত্ব। তবে এই একক কৃতিত্বের নিশান কি ভবিষ্যতে সমাজের মন-ও বদলাবে? যদি বদলায় তবেই হয়তো আসল লড়াই জিতে যাবে রামসেবক।