কুম্ভমেলায় পদপিষ্ট হয়ে মৃত্যু। যোগী সরকারের আশ্বাস ছিল, মৃতের পরিবারকে আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে। কিন্তু বাস্তবের ছবিটা খানিক আলাদা। সরকারি ক্ষতিপূরণ দূর অস্ত, এখনও মৃত পরিজনের ডেথ-সার্টিফিকেটও পাননি নিহতের পরিবারের সদস্যরা। ঠিক কী জানা যাচ্ছে? আসুন শুনে নেওয়া যাক।
পুণ্যের টানে কুম্ভস্নান। সেখানেই পদপিষ্ট হয়ে মৃত্যু। সরকারি হিসাব বলছে মৃতের সংখ্যা ৩০-র বেশি নয়। খোদ যোগী আদিত্যনাথও সে কথাই বলেছেন। কিন্তু এই সংখ্যা সঠিক নয়, তা দাবি করেছেন বিরোধীরা। কুম্ভ চলাকালীন এই নিয়ে বিতর্ক জমেছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা ফিকে হয়েছে। ঠিক কতজন কুম্ভের দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন, কতজন এখনও নিখোঁজ সেই বিতর্কের সমাধান হয়নি। এই আবহে সামনে এল নতুন প্রসঙ্গ। অভিযোগ, কুম্ভের দুর্ঘটনায় একাধিক নিহতের পরিবার এখনও প্রিয় মানুষের ডেথ সার্টিফিকেট হাতে পাননি।
:আরও শুনুন:
কুম্ভে পদপিষ্ট হয়ে মৃত্যু! দেহ নিখোঁজ, তিনদিন পর হেঁটে বাড়ি ফিরলেন ‘মৃত’
১৪৪ বছর পর শুরু হচ্ছে মহাকুম্ভ। গত বছরের শেষ থেকেই এমন প্রচার শুরু হয়েছিল। তা আদৌ সত্যি কি না, সেসব যাচাই করেননি কেউ। তবে দলে দলে কুম্ভে হাজির হওয়ার পরিকল্পনা শুরু করেছিলেন অনেকেই। তার দুটো কারণ, এক ধর্মীয় আবেগ, দুই সোশাল মিডিয়ায় জনপ্রিয় হওয়া। বাস্তবে দুইই হয়েছে। কুম্ভের রিল, ভিডিওতে সোশাল মিডিয়া যেমন ভরেছে, তেমনই ধর্মের দোহাই দিয়ে সাম্প্রদায়িক ইস্যু ভালমত উসকে দেওয়া গিয়েছে। এসব নিয়ে বিতর্ক কম হয়নি। তবে যে বিষয়টা আলোচনার মূলে থেকেছে, তা হল মৃত্যু, মহাকুম্ভে পদপিষ্ট হয়ে মৃত্যু। এমন নয় যে এবারের কুম্ভই প্রথমবার মৃত্যুর সাক্ষী থাকল। দুর্ঘটনা আগেও ঘটেছে। তবে এবার প্রশাসনের তরফে যে ব্যবস্থা বা নিরাপত্তার দাবি করা হয়েছিল, তা সত্ত্বেও কীভাবে এমন ঘটনা, তা প্রশ্ন তুলতে শুরু করে। বারংবার আগুন লাগা, ভিড়ের চাপে পদপিষ্ট হওয়া, কিছুই এড়ানো যায়নি এবারের মহাকুম্ভে। তাও যোগী সরকারকে কুম্ভের ব্যবস্থা নিয়ে দরাজ সার্টিফিকেট দিয়েছেন মোদি। ঢালাও প্রশংসা করেছেন আরও অনেকেই। স্রেফ বিরোধীরা বারবার সরব হয়েছেন। বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায় থেকে শুরু করে যেসব রাজ্যে বিজেপি বিরোধী দল রয়েছে, তারা কুম্ভের দুর্ঘটনা নিয়ে কাঠগড়ায় তুলেছে যোগী আদিত্যনাথের সরকারকে। ঘটনার জল গড়ায় সংসদ অবধি। বিষয়টা নিয়ে মুখ খোলান খোদ মুখ্যমন্ত্রী আদিত্যনাথ। তিনি অবশ্য এতটুকু আমল দেননি বিরোধীদের দাবিকে। বরং জোর গলায় দাবি করেন, কুম্ভ সফল। সরকারি হিসেবে যে কয়েকজন মৃতের কথা বলা হয়েছে, সেই সংখ্যাই সংসদে তুলে ধরেন। ধরে নেওয়া যাক এটাই সত্যি। কিন্তু তাতেও কিছু প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। যা চাইলেও এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। কারণ প্রশ্ন তুলছেন, কুম্ভমেলায় পদপিষ্ট হয়ে মৃতের পরিবারের সদস্যরা!
:আরও শুনুন:
পদপিষ্ট হওয়ার আতঙ্কে কুম্ভ ছাড়লেন ভক্তরা, ফেরার পথে আশ্রয় দিল স্থানীয় মসজিদ
জানা যাচ্ছে, কুম্ভের দুর্ঘটনায় মৃত অনেকের পরিবারই নিহতের ডেথ সার্টিফিকেট হাতে পাননি। বলা হয়েছিল, মেলা শেষ হলে মিলবে। কিন্তু কোথায় কী! ‘রাত গয়ি, বাত গয়ি’-র মতো অবস্থা। বারবার প্রয়াগ সংলগ্ন সরকারি দপ্তরে গিয়েও লাভ হয়নি। মৃত পরিজনের ডেথ-সার্টিফিকেট এখনও পাননি রত্নেশ, অজয় কিংবা মান্তুরা। কেউ মধ্যপ্রদেশ, কেউ বিহার কেউ আবার উত্তরপ্রদেশেরই বাসিন্দা। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কুম্ভে গিয়েছিলেন। ফিরেছেন মৃত মা কিংবা বাবার মৃতদেহ নিয়ে। সাধারণ মৃত্যু নয়, পদপিষ্টের ঘটনাতেই গিয়েছে প্রাণ। চোখের সামনে সেই দৃশ্য দেখেওছেন কেউ কেউ। তবু প্রশাসন মানতে নারাজ এই মৃত্যু অস্বাভাবিক। অন্তত ডেথ-সার্টিফিকেট দেওয়ায় গাফিলতি, সেই প্রশ্নই তুলছে। কেউ কেউ স্পষ্ট এমনটা শুনেওছেন যে, মৃত্যুর জন্য পদপিষ্টের ঘটনা দায়ী নয়। তাই যদি হয়, তবে ময়না-তদন্ত করা হোক! এমন দাবিও তুলেছেন মৃতের পরিবারের সদস্যরা। তাও সম্ভব নয়, জানিয়েছে যোগী রাজ্যের প্রশাসন। এই নিয়ে মেলা আয়োজক কমিটিরও তেমন কোনও বক্তব্য নেই। এ প্রসঙ্গে কোনও অভিযোগ শুনতেই রাজি নন তাঁরা। সবকিছু সুষ্ঠভাবে হয়েছে, এমনটাই বলা হচ্ছে বারবার। মৃত প্রিয়জনকে আর ফিরে পাবেন না একথা জানেন অজয়রা। কিন্তু মৃত্যুর শংসাপত্র না পেলে সব কাজ যে আটকে থাকছে! অনেকেরই ব্যক্তিগত ইনসিওরেন্স পলিসি করা ছিল। ডেথ-সার্টিফিকেট ছাড়া যা ক্লেইম করা অসম্ভব। সরকারি ক্ষতিপূরণের আশা এঁরা অনেকেই ছেড়ে দিয়েছেন। কিন্তু মৃত প্রিয়জনের ডেথ-সার্টিফিকেট পাওয়ার অধিকারও কি নেই? সেই প্রশ্ন না তুলে পারছেন না কেউ। যদিও যোগী সরকারের তরফে কিছু কিছু মৃতের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। ডেথ-সার্টিফিকেট নেই, তবু। এবং আশ্চর্যের বিষয় সবটা দেওয়া হয়েছে নগদে। বাড়ি এসে তা হাতে তুলে দিয়েছেন প্রতিনিধিরা। সঙ্গে কোনও কাগজপত্র দেওয়া হয়নি। টাকা হস্তান্তরের প্রমাণ হিসেবে কেউ কেউ ছবি তুলে নিয়ে গিয়েছেন, কেউ সই করিয়েছেন। তবে যা প্রয়োজন, সেই ডেথ-সার্টিফিকেট মেলেনি। কেন এমনটা করা হচ্ছে, তা বারে বারে জানতে চাইছেন মৃতের পরিবারের সদস্যরা। তবে কোনও সদুত্তর দেওয়া হচ্ছে না কাউকে।