একজন সাধারণ ভারতীয় কর্মী প্রতি সপ্তাহে গড়ে প্রায় ৫০ ঘণ্টা কাজ করেন, যা মার্কিন মুলুক, ইউনাইটেড কিংডম কিংবা চিনের কর্মীদের কাজের তুলনায় অনেক, অনেক বেশি। অথচ সমীক্ষায় কর্পোরেট সংস্থাগুলি জানিয়েছে যে, মোট খরচের মাত্র ১৭% তাঁরা ব্যয় করে থাকেন কর্মীদের ভালোমন্দের জন্য। অর্থাৎ কোম্পানির লাভ-লোকসান যাঁদের উপর নির্ভর করছে, তাঁদের জীবনের উন্নতিতে সংস্থার ব্যয় বিশেষ কিছু নয়!
সপ্তাহে ৭০ ঘণ্টা কাজের নিদান দিয়ে বিতর্কে জড়িয়েছিলেন ইনফোসিস কর্তা নারায়ণ মূর্তি। এল অ্যান্ড টি কর্তা আবার ফরমান দিয়েছিলেন রবিবারেও কাজ করার। প্রশ্ন উঠেছিল যে, বেশি ঘণ্টা কাজ করলেই কি কর্মীদের সৃজনক্ষমতা বাড়বে? নাকি, আদতে তাতে সংস্থার লাভ হবে, কর্মীদের অবস্থা বা অবস্থানে তেমন প্রভাব পড়বে না! তারপর গঙ্গা দিয়ে বয়ে গেল অনেক জল। কিন্তু অবস্থার কিছুমাত্র পরিবর্তন হল কী? কর্পোরেট সংস্থাগুলির জন্য জান লড়িয়ে খেটেও কি ব্যক্তিগত অবস্থানের উন্নতি ঘটল ভারতীয় কর্মীদের? বিতর্কের রেশ ধরেই ভারতীয় শ্রমিকদের কাজের সময়ের হিসাব আর তাঁদের জীবনশৈলীর খতিয়ান একবার খতিয়ে দেখা যেতে পারে।
গত বছরের হিসেব অনুযায়ী, বহুজাতিক সংস্থা ‘এল অ্যান্ড টি’-এর বাজারদর আনুমানিক ১.০৮৪ ট্রিলিয়ন। আর ইনফোসিসের বাজারদর বর্তমানে ৬৮.৯১ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ কর্মীদের সৃজনশীলতায় সংস্থা দুটি যে বেশ ভালো জায়গাতেই আছে, তা বলা যায়। তাহলে কর্মীরা কেমন আছেন? সমীক্ষা বলছে, যদি সত্যিই দীর্ঘ সময় কাজের সঙ্গে আর্থিক লাভের সমানুপাতিক সম্পর্ক থাকত, তাহলে ভারতীয় কর্মীদের চাইতে ‘বড়লোক’ বোধহয় আর দুটি থাকত না! কারণ একজন সাধারণ ভারতীয় কর্মী প্রতি সপ্তাহে গড়ে প্রায় ৫০ ঘণ্টা কাজ করেন, যা মার্কিন মুলুক, ইউনাইটেড কিংডম কিংবা চিনের কর্মীদের কাজের তুলনায় অনেক অনেক বেশি। অথচ শুনলে অবাক হতে হয়, যেখানে ইউকে ও জার্মানির শ্রম উৎপাদনশীলতার মূল্য দাঁড়ায় ঘণ্টায় যথাক্রমে ৫৬.৯ ও ৭৩.০৫ ডলার, সেখানে ভারতের ‘লেবার প্রোডাক্টিভিটি’ ঘণ্টায় কেবলমাত্র ৮ ডলার!
অন্যদিকে রমরম করে বেড়ে চলেছে কোম্পানিগুলির লাভের পরিমাণ। ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষের অর্থনৈতিক সমীক্ষা বলছে, আগের বছরটির চাইতে কর্পোরেট লাভ বেড়েছে ২২.৩ শতাংশ, আর এদিকে কর্মসংস্থান বেড়েছে মোটে ১.৫ শতাংশ। সমীক্ষায় কর্পোরেট সংস্থাগুলি জানিয়েছে যে, মোট খরচের মাত্র ১৭% তাঁরা ব্যয় করে থাকেন কর্মীদের ভালোমন্দের জন্য। অর্থাৎ কোম্পানির লাভ-লোকসান যাঁদের উপর নির্ভর করছে, তাঁদের জীবনের উন্নতিতে সংস্থার ব্যয় বিশেষ কিছু নয়।
তা ছাড়া উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর সীমা-ই বা কী! সে প্রশ্নও থাকে বটে। দীর্ঘ সময় কাজ করে সংস্থার হিসেবনিকেশ হয়তো ঠিক রাখেন কর্মীরা, কিন্তু তাতে তাঁদের উন্নতি বা কতটুকু হয়? কর্মীর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটলেই নির্বিচারে ছাঁটাইয়ের পথ অবলম্বন করছে সংস্থা, এমন নজির বিরল নয়। আর সেখানে দাঁড়িয়ে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে চিন্তাভাবনা তো অনেক দূরের সম্ভাবনা। ফলত কাজের সময় বাড়লেই যে কর্মীদের সৃজনশীলতা বাড়বে, এমনটা জোর দিয়ে বলা যায় না।
২০২২ সালের একটি ঘটনার উদাহরণ এ প্রসঙ্গে টানা যায়। অস্ট্রেলিয়ার একটি বিশেষ সংস্থায় হঠাৎ করেই বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল ওয়ার্কিং আওয়ার-এর মেয়াদ। আর আচমকাই দেখা গেল, সেখানকার শ্রম উৎপাদনশীলতার মান একেবারে মুখ থুবড়ে পড়েছে। উইনাইটেড কিংডম-এর বিপুল সংখ্যক কোম্পানি মনে করেন, সপ্তাহে মাত্র চারটি কর্মদিবস যথেষ্ট। দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করে গেলে তা কেবল ক্লান্তই করে দেয় মানুষকে, কাজের মানের উন্নতি ঘটায় না। ভারতীয় সংস্থাগুলি অন্যান্য অনেক বিষয়ে বিদেশী আদপকায়দা রপ্ত করায় মন দিলেও এই একটি ক্ষেত্রে কিছুতেই প্রচলিত ধারণার বাইরে বেরোতে নারাজ।
বারংবার সমীক্ষাগুলিতে সামনে আসছে যে, একই পরিমাণ কিংবা বেশি কাজ করেও একজন জার্মান বা ফ্রেঞ্চ ব্যক্তি যা উপার্জন করেন, তার অর্ধেকও করছেন না একজন ভারতীয়। তাহলে তো সমস্যা এক্ষেত্রে আলস্য বা দক্ষতার অভাব নয়। অসাম্য, দুর্বল পরিকাঠামো, প্রশিক্ষণের অভাবের চাইতেও বড় সমস্যা হল, ভারতীয় সংস্থাগুলির আধিকারিকেরা বিশ্বাস করেন, কাজ থাকুক বা না থাকুক, কর্মচারীদের শ্রম ব্যয় করে যেতে হবে! ধনী ব্যক্তি সমৃদ্ধির শিখরে উঠবেন, ওদিকে মধ্যবিত্ত কর্মজীবী মানুষ সংসারের ব্যয়ভার আর উপার্জিত অর্থের মধ্যে সামঞ্জস্য রক্ষা করতে গিয়ে হিমশিম খাবে- এই-ই যেন দস্তুর। সময়ের সঙ্গেও যদি এ অবস্থার ন্যূনতম পরিবর্তন না আসে, তাহলে প্রশ্ন থেকেই যাবে, যোগ্য বেতনের অধিকার থেকে বঞ্চিত, মানসিক ক্লান্তিতে জর্জরিত কর্মীদের কাঁধে ভর দিয়ে কি আদৌ ঝাঁ-চকচকে নতুন ভারতবর্ষের স্বপ্ন বাস্তবায়ন কি আদৌ সম্ভব?