লকডাউনের সময়ে যখন সমস্ত ‘ফিজিক্যাল স্টোর’ বাধ্যতামূলকভাবে বন্ধ হয়ে যায়, তখন অনেকেই নতুন করে অনলাইন মাধ্যমে ব্যবসার সূচনা করেন। সোশ্যাল মিডিয়ার রমরমাও তখন দেখা যায়। আর দিবারাত্র সোশ্যাল মিডিয়ায় পড়ে থাকা ভারতীয়ের ব্যবসা-ভাবনাতেও তাই প্রভাব ফেলে বিশ্বায়ন।
অনেকেই স্বপ্ন দেখেন, ছোট্ট হলেও, নিজের একটি ব্যবসা থাকবে তার। সেখানে বিনিয়োগ আর খাটুনিও যেমন নিজের, তেমন লাভ-লোকসান সবটাই নিজের। বাঁধাধরা চাকরির মতো সেখানে কাউকে উঠতে-বসতে জবাব দেওয়ার প্রয়োজন হবে না। বিশেষত দীর্ঘদিন চাকরি করবার পর এমন স্বপ্ন বহু বাঙালিই দেখে থাকেন। এই ব্যবসার পোশাকি নাম ‘স্টার্ট-আপ’, যা বলতে শুনতে দুইই বেশ ওজনদার লাগে। একসময় লোকমুখে প্রচলিত ছিল, বাঙালি নাকি ব্যবসা করতে পারে না! বর্তমানে সেই ধারণা অনেকখানি বদলেছে। অলিতে গলিতে ব্যাঙের ছাতার মতন গজিয়ে ওঠা ছোট্ট সমস্ত স্টার্ট-আপই তার প্রমাণ। তা তার ভিত্তি শিক্ষা হোক, ফাইন্যান্স হোক, স্বাস্থ্য বা স্রেফ খাবার। কিন্তু শুরু হচ্ছে যতগুলো, ততগুলো স্টার্ট-আপই সফল হচ্ছে কি?
হচ্ছে না। ইদানিংকালে দেখা যাচ্ছে, বিপুল সংখ্যক স্টার্ট-আপ একেবারে মুখ থুবড়ে পড়ছে। মাঝখান থেকে তিলে তিলে জমানো টাকার সমস্তটা বিনিয়োগে ঢেলে সর্বস্বান্ত হয়ে যাচ্ছে তার মালিক। আর এ গল্প শুধু বাংলার নয়। গোটা ভারতেই এতে সাক্ষী। সমীক্ষা বলছে, গত দুই বছরে প্রায় ২৮,০০০-এরও বেশি নতুন ব্যবসায় অল্প কিছুদিনের মধ্যেই তালা পড়ে গিয়েছে। আগামী দিনে আরও বিপুল সংখ্যক ক্ষুদ্র ব্যবসা বন্ধ হবেই হবে, আশঙ্কা করছেন এক্সপার্টরা। কিন্তু এমনটা হওয়ার পিছনে আসল কারণ কী?
ভারতে স্টার্ট-আপ-এর উত্থানকে যদি চিহ্নিত করতে হয়, তবে নিঃসন্দেহে বলা যায় ২০২০ সালের কথা। লকডাউনের সময়ে যখন সমস্ত ‘ফিজিক্যাল স্টোর’ বাধ্যতামূলকভাবে বন্ধ হয়ে যায়, তখন অনেকেই নতুন করে অনলাইন মাধ্যমে ব্যবসার সূচনা করেন। সোশ্যাল মিডিয়ার রমরমাও তখন দেখা যায়। আর দিবারাত্র সোশ্যাল মিডিয়ায় পড়ে থাকা ভারতীয়ের তাই ব্যবসা-ভাবনাতেও প্রভাব ফেলে বিশ্বায়ন। যতদিনে লকডাউন ওঠে, ততদিনে বেশ কিছু অনলাইন স্টোর মালিকেরা রীতিমত ফুলেফেঁপে উঠেছেন। আর তাই চট করে সব বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনা নেই বুঝে, তাঁদের অনেকেই আবারও ‘ফিজিক্যাল স্টোর’ বা দোকান খুলবার সিদ্ধান্ত নেন। খানিক বিশ্বায়নের কারণেই বর্তমান সময়ের দোকানের সজ্জা থেকে পরিষেবা, সবটাতেই জোরজবরদস্তি বিশমানের ছোঁয়াচ দেওয়ার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু প্রথম কয়েক মাস বেশ ভালোভাবে চললেও অল্পদিন পরেই লোকসানের ধাক্কা সামলাতে না পেরে বন্ধ করতে বাধ্য হয় বেশিরভাগ দোকানমালিক।
সাম্প্রতিক সময়ে জনপ্রিয় হয়েছে ‘শার্ক ট্যাঙ্ক’-এর মতন রিয়ালিটি শো। নাচ, গান কিংবা কমেডিভিত্তিক রিয়ালিটি শো দেখা ভারতীয়দের কাছে এই কনসেপ্ট যথেষ্ট নতুন। আর ভারতীয়দের ‘অন্ত্রেপ্রেনিউর’ হয়ে ওঠার স্বপ্নের অন্যতম কাণ্ডারিও বটে। তবে ‘রিয়েল লাইফ’ যে কখনওই দৌড়ে ‘রিল লাইফ’-কে হারাতে পারে না, তা তো প্রমাণ হয়েছে বারেবারেই। খোঁজ নিলেই জানা যায় যে, শার্ক ট্যাঙ্ক-এ পেশ করা বহু ব্যবসা-ভাবনাই পরবর্তীকালে আর খুব বেশিদূর এগোতে পারেনি। আসলে নতুন কোনও ‘আইডিয়া’ মাত্রেই যে তা উদ্ভাবনী ক্ষমতাধর বা ‘ইনোভেটিভ’ হবে, তা বলা যায় না। আপনার ব্যবসা-ভাবনাটা যদি ক্রেতাদের একেবারে নতুন কিছু পরিবেশন না করতে পারে, তবে এই দ্রুততার যুগে তার গতি হারিয়ে ফেলার কারণটি রীতিমত সঙ্গত।
তবে এই ফর্মুলাও ক্ষেত্রবিশেষে বিফল হয় বৈকি! যেমন ধরা যাক, কোনও একটি সংস্থা হয়তো এমন কোনও একটি ঘর-সাজানোর জিনিস বিক্রি করছে, যা এতদিন সচরাচর কেউ ভাবতে পারেনি। সেই জিনিস বাজারে আসতেই প্রথম কয়েক মাস উন্মাদের মতো কিনতে লাগলো মানুষ। দেখা গেল, প্রায় সবার ঘরেই কমবেশি সেই জিনিস দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু যেহেতু দৈনন্দিন জীবনে সে জিনিসটি অবিচ্ছেদ্য হয়ে উঠছে না, বা নিজের থেকে ফুরিয়েও যাচ্ছে না, ফলে নতুন করে আর কিনবার প্রয়োজনীয়তা হচ্ছে না কারুর। আবার অন্যদিকে, সোশ্যাল মিডিয়ায় বারংবার সেই জিনিস দেখতে পাওয়ার ফলে বাকিরাও সেটি দেখতে এতটাই অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে যে নতুন ক্রেতা তৈরি হওয়ার কোনও সম্ভাবনাই থাকছে না।
এছাড়াও, অন্যতম যে বিষয়টি বর্তমানে ব্যর্থ হওয়া বেশিরভাগ স্টার্ট-আপের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে তা হল মাত্রাতিরিক্ত অযথা বিনিয়োগ। বর্তমান ‘অন্ত্রপ্রেনিউর’-রা অনেকেই ঝোঁকের বশে বিপুল পরিমাণে টাকা কেবলমাত্র ব্যবসাটিকে সুসজ্জিত করতে ব্যয় করে দিচ্ছেন। তা সে অনলাইন ওয়েবসাইট হোক, বা অফলাইন স্টোর। ফলে ব্যবসায়িক পরিকল্পনাটি সফল না হলে, আরও বেশি ক্ষতির মুখ দেখতে হচ্ছে তাঁকে। পরিসংখ্যান মতে, শুধুমাত্র ২০২৪ সালেই ৫০০০-এর উপর স্টার্ট-আপ বন্ধ হয়ে গিয়েছে ভারতে। অর্থাৎ, এ থেকে এই সিদ্ধান্তে আসতে পারি আমরা যে, সফলতার সহজ উপায় জানা না থাকলেও যদি বিফলতার কারণগুলো যদি একটুখানি হিসেব করে চলতে পারি, তবে ভাগ্য খুললেও খুলে যেতেই পারে!