প্রতি বছরই এমন নানান খবর ছড়িয়ে পড়ে নেটজগতে, যেখানে দেখা যায়, কীভাবে সামান্য কোনও অজুহাতে উচ্চবিত্ত মানুষেরা নিম্নবিত্ত মানুষদের হেনস্থা করে চলেছেন। বর্তমান সমাজের ছবিটা একটু খতিয়ে দেখলেই বোঝা যায় যে ‘আনটাচাবলিটি’ বা অস্পৃশ্যতা কেবল জাত-ধর্ম-বর্ণের লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ করে না। কোনও মানুষ সমাজে কতখানি সম্মান পাওয়ার যোগ্য, তার অনেকটাই বরং নির্ধারিত হয় তাঁর পেশা দেখে।
নেটওয়ার্কিং সংস্থার ক্রিয়েটিভ হেড। কন্টেন্ট ক্রিয়েটর হিসেবেও বেশ পরিচিত। নেহাত মজার ছলেই সিদ্ধান্ত নেন, একটা গোটা দিন ডেলিভারি কর্মী হিসেবে কাটাবেন। সেইমতো অনলাইন ডেলিভারি সংস্থায় নাম লেখান, নির্দিষ্ট দিনে কাজ শুরুও করেন। সংস্থা প্রদত্ত উজ্জ্বল পোশাক গায়ে, ব্যাগ কাঁধে বেরিয়ে পড়েন। অর্ডার এলে, তালিকা অনুযায়ী জিনিস মিলিয়ে, বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দেন। উপর থেকে দেখে আলাদা কিছু বোঝার উপায় নেই। তবে ভেতর থেকে দেখলে বিষয়টা একেবারেই আলাদা।
ঠিক কেমন?
মুল্ক রাজ আনন্দ তাঁর ‘আনটাচাবল্’ উপন্যাসে লিখছেন, “কীকরে কোনও মানুষ, অন্য আরেকজন মানুষের চাইতে উন্নততর হতে পারে? এমন ভেদাভেদ মেনে নিলে, তা কি আমাদের সকলকেই পাপের ভাগী করে না?” উপন্যাসটির কেন্দ্রীয় চরিত্রেরা দলিত, বর্ণবিদ্বেষের কারণে কেমনভাবে পদে পদে হেনস্থা হতে হয় তাঁদের, তা নিয়েই এই কাহিনি। তবে বর্তমান সমাজের ছবিটা একটু খতিয়ে দেখলেই বোঝা যায় যে ‘আনটাচাবলিটি’ বা অস্পৃশ্যতা কেবল জাত-ধর্ম-বর্ণের লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ করে না। কোনও মানুষ সমাজে কতখানি সম্মান পাওয়ার যোগ্য, তার অনেকটাই বরং নির্ধারিত হয় তাঁর পেশা দেখে। সম্প্রতি সে কথায় প্রমাণ করেছেন সলমন। যার কথা দিয়ে শুরু হল, সেই শখের ডেলিভারি কর্মী তথা জনপ্রিয় কনটেন্ট ক্রিয়েটর, সলমন ।
গাড়ির জ্যামে আটকালে নিয়মরক্ষকেরা রীতিমতো হম্বিতম্বি করেন, অথচ পাশে দাঁড়ানো চারচাকা গাড়ির মালিককে তেমন কিছুই বলা হয় না। গাড়ির মালিকেরাও যেন নিচু চোখেই দেখেন পাশ কাটিয়ে যাওয়া ডেলিভারি বয়-দের। বাইকে চেপে রাস্তার ধুলো-ধোঁয়া এড়িয়ে ঠা-ঠা রোদের মধ্যে এক জায়গা থেকে আর এক জায়গা দৌড়ে চলেন সালমান। তারপর যখন জিনিস নিয়ে হাজির হন কোনও সুউচ্চ হাউজিং সোসাইটিতে, তাঁকে জানানো হয়, তিনি যেন সেখানকার বাসিন্দাদের ব্যবহৃত লিফট-টিতে না ওঠেন। দরকারে ‘সার্ভিস লিফট’ ব্যবহার করতে পারেন, যা সাধারণত গৃহ-সহায়িকা কিংবা অন্যান্য নিম্নবর্গীয় কর্মচারীরা ব্যবহার করে থাকেন। নতুবা সিঁড়ির পথে উঠতে পারেন, তা সে চার-পাঁচতলা কিংবা আরও উঁচু কোনও ফ্লোর! এই হাউজিং কমপ্লেক্সগুলিতে উচ্চবিত্তদের বাস, যাঁরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মোবাইলের ওপারে বসে নেটমাধ্যমে নৈতিক-অনৈতিকতার পাঠ পড়িয়ে থাকেন।
নিজের দুর্ভাগ্যজনক অভিজ্ঞতাটির কথা নিজের প্রোফাইলেই জানিয়েছেন সলমন। রাস্তায় যারা তাঁর পাশ কাটিয়ে গিয়েছেন, তাঁরা তো কেউ ওঁর নাম-পরিচয় জানতেন না। কেবল পরিধানটুকু দেখেই কত সহজে অস্পৃশ্যদের তালিকায় ঠেলে দিয়েছেন তাঁকে। কেবল ডেলিভারি বয় নয়, গৃহ-সহায়িকা, ইলেকট্রিশিয়ান, প্লাম্বার বা অন্য যে সকল মানুষদের জন্য ‘সার্ভিস লিফট’ নামক বস্তুটির অবতারণা, ভাবতে গেলে বোঝা যায় যে তাঁদের একজনকে ছাড়াও আমাদের রোজকার জীবন কতখানি কঠিন হয়ে উঠতে পারে। আর ডেলিভারি বয়-রা তো অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে সেইসব জিনিসই বাড়িতে এসে পৌঁছে দেন, যা আমাদের তৎক্ষণাৎ দরকার পড়ে।
এই খবরে নতুন কিছু নেই। প্রতি বছরই এমন নানান খবর ছড়িয়ে পড়ে নেটজগতে, যেখানে দেখা যায়, কীভাবে সামান্য কোনও অজুহাতে উচ্চবিত্ত মানুষেরা নিম্নবিত্ত মানুষদের হেনস্থা করে চলেছেন। কখনও বা সমাজের নিচু স্তরের কোনও মানুষকে উচ্চবিত্ত কারুর করা অতি ক্ষুদ্র সাহায্যের ঘটনাকেই রীতিমতো ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। আমরাও এমনভাবে তাতে প্রশংসা করি, যেন এই সামান্য সহমর্মিতাটুকু স্বাভাবিক নয়, মহান কোনও কাজ। প্রতিদিনকার নানান প্রযুক্তিগত উন্নতি উত্তোরত্তর আধুনিক বানিয়ে চলেছে মানুষকে, কেবল মানবিকতা শেখানোর যন্ত্রই বুঝি আবিষ্কারের চেষ্টা করে না কেউ!